আজকাল ওয়েবডেস্ক: মহারাষ্ট্রের নাসিকে অবস্থিত টিসিএস (TCS) অফিসে তথাকথিত ‘কর্পোরেট জিহাদ’ বা সুসংগঠিত ধর্মান্তরকরণ চক্রের যে অভিযোগ ঘিরে তোলপাড় চলছে, তার নেপথ্যে উঠে আসছে এক জটিল এবং বিতর্কিত চিত্র। গত ২৫ মার্চ গভীর রাতে দেওলালি ক্যাম্প থানার সামনে যখন শত শত যুবকের ভিড় জমতে শুরু করে, তখন থেকেই এই ঘটনার সূত্রপাত। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, জমায়েত হওয়া অধিকাংশ যুবকের কপালে ছিল তিলক এবং মধ্যরাত নাগাদ সেই ভিড় অন্তত ২০০ ছাড়িয়ে যায়। ঠিক এর পরপরই, ২৬ মার্চ রাত ১টা ০১ মিনিটে দায়ের হয় প্রথম এফআইআর (FIR), যা এই গোটা বিতর্কের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

প্রথম অভিযোগটি করেছিলেন টিসিএসের এক ২৩ বছর বয়সী তরুণী কর্মী। তার অভিযোগ ছিল, সহকর্মী দানিশ শেখ বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন এবং পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন যে দানিশ বিবাহিত ও দুই সন্তানের জনক। এছাড়া দানিশ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে হিন্দু দেবদেবী নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য এবং ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচারের অভিযোগও আনেন ওই তরুণী। স্থানীয় শিবসেনা নেতা নীতিন গায়কওয়াড  অকপটে স্বীকার করেছেন যে, এই এফআইআর দায়ের করার পেছনে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। গায়কওয়াড  জানান, তারা ওই তরুণীকে বেশ কয়েক দিন ধরে ‘কাউন্সেলিং’ বা পরামর্শ দিয়ে পরিস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করেন এবং পরবর্তীতে সকলে মিলে থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করান।

ঘটনাটি কেবল একটি এফআইআর-এই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে নাসিকের মুম্বাই নাকা থানায় আরও আটটি এফআইআর দায়ের করা হয়। মজার বিষয় হল, এই নয়টি অভিযোগের একটিতেও মহারাষ্ট্রের ধর্মান্তর বিরোধী আইন (ধর্ম স্বতন্ত্র অধিনিয়ম, ২০২৬) প্রয়োগ করা হয়নি। তবে পুলিশ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) ধারা ৩(৫) যুক্ত করেছে, যা নির্দেশ করে যে অভিযুক্তরা পরিকল্পিতভাবে বা দলগতভাবে এই কাজগুলো করেছেন। পুলিশ কমিশনার সন্দীপ কার্নিক জানিয়েছেন, অভিযুক্তরা অফিসে একটি ‘গ্যাং’ তৈরি করে নিজেদের পদের অপব্যবহার করে সহকর্মীদের ওপর যৌন ও ধর্মীয় নিপীড়ন চালাতেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে এই ঘটনাকে ‘কর্পোরেট জিহাদ’ বা ‘লাভ জিহাদ’ হিসেবে প্রচার করা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন মোড় নিচ্ছে। বিশেষ করে নিদা খান নামের এক তরুণীকে নিয়ে তৈরি হওয়া সংবাদগুলো এখন প্রশ্নের মুখে। গণমাধ্যমে তাকে ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা এই চক্রের মূল হোতা এবং এইচআর (HR) ম্যানেজার হিসেবে বর্ণনা করা হলেও, টিসিএস জানিয়েছে নিদা কেবল একজন সাধারণ প্রসেস অ্যাসোসিয়েট। তার পরিবারের দাবি, নিদা বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা এবং মুম্বাইয়ে নিজের বাড়িতেই রয়েছেন। অথচ মিডিয়াতে তাকে পলাতক এবং দিল্লির লাল কেল্লা বিস্ফোরণকাণ্ডের আসামির সঙ্গে যুক্ত বলে প্রচার করা হয়েছে, যা তার পরিবার দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে।

এই গোটা ঘটনায় মোট আটজন সহকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, যাদের মধ্যে সাতজন মুসলিম এবং একজন হিন্দু মহিলা। টিসিএস-এর সিইও কে. কৃতিবাসন জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যালোচনায় কোম্পানির এথিক্স বা অভ্যন্তরীণ পশ (POSH) চ্যানেলে আগে এমন কোনও  অভিযোগ জমা পড়েনি। যদিও অভিযোগকারী মহিলাদের দাবি, তারা আগে ম্যানেজমেন্টকে জানালেও কোনও  ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রথম অভিযোগের পর সাদা পোশাকের মহিলা পুলিশ কর্মীরা অফিসে গিয়ে কর্মীদের নির্ভয়ে এগিয়ে আসতে বলেন, যার ফলে পরবর্তী অভিযোগগুলো জমা পড়ে।

অভিযুক্তদের পরিবারগুলোর দাবি, এটি নিছকই মুসলিম কর্মীদের লক্ষ্য করে চালানো একটি সাজানো অভিযান। তাদের প্রশ্ন, যদি বছরের পর বছর ধরে এমন নিপীড়ন চলে থাকে, তবে অফিস ম্যানেজমেন্ট বা অভ্যন্তরীণ কমিটি কেন তা জানতে পারল না? অভিযুক্ত রাজা মেমন বা শাহরুখ কুরেশির স্ত্রীদের দাবি, পুলিশ তাদের স্বামীদের জিজ্ঞাসাবাদের নাম করে ডেকে নিয়ে গ্রেপ্তার করেছে এবং মিডিয়ায় মুখরোচক গল্প তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) এবং টিসিএস-এর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কমিটি এই স্পর্শকাতর মামলার তদন্ত করছে। মিডিয়া ট্রায়াল আর আইনি প্রক্রিয়ার এই টানাপড়েনে নাসিকের এই কর্পোরেট জগত এখন উত্তাল।