রিয়া পাত্র
২৯৪ আসনের লড়াই। লড়াই গঙ্গা পাড়ের নবান্ন দখলের। দেড় দশক ক্ষমতার মসনদে বসে থাকার পর, এই ভোট তৃণমূলের কাছে কেবল ফিরে আসার ভোট নয়। ভোট ১৫ বছরের সরকারের হয়ে রাজ্যের সামনে দাঁড়িয়ে, নিজেদের পুনরায় প্রমাণ করার ভোট। কারণ, এই সময়কালে তৃণমূলের বিরুদ্ধে কম অভিযোগ ওঠেনি। কিন্তু যতবার রাজ্যের ভিতরে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে, ততবার বিরোধীদের স্তিমিত সুরের পাশ দিয়ে গিয়ে, পথে নেমেছেন মমতা নিজেই। বাংলার খেটে খাওয়া মানুষ বলে থাকেন, মমতা ব্যানার্জি ঘরের মেয়ের মতোই। ঠিক যে কারণে, ২১-এর ভোটের আগে তুমুল জনপ্রিয় হয় 'বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়' স্লোগান। বাংলার রাজনীতি সচেতন মানুষ বলে থাকেন, মমতা জমানায়, তিনিই সরকারে, তিনিই পথে। বলে থাকেন, রাজনীতিতে তাঁর মতো আনপ্রেডিক্টেবল মানুষ খুব কম হয়।
তার উদাহরণ সাম্প্রতিককালে নেহাত কম নয়। আরজিকর আন্দোলনে, বৃষ্টির মধ্যে তাঁর পৌঁছে যাওয়া, একাধিক দাবিতে দলকে পথে নামিয়ে, নিজেও পথে নামা, ধর্নায় বসা। যা কিছু অন্য রাজনৈতিক দলগুলি বিরোধী অবস্থানে থেকেও ভাবে না, সরকারে থেকে মমতা ভেবে ফেলেন তা। এসবের মাঝে আবার চমক দিয়েছেন রাজ্য সভার প্রার্থী তালিকাতেও। তবে, এই মুহূর্তে, তৃণমূলের বিধানসভার প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর, এই বিষয় নিয়ে আলোচনার কারণ? কারণ প্রার্থী তালিকাই।
মঙ্গলবার তৃণমূল কংগ্রেস প্রকাশ করেছে ২৯১ আসনের প্রার্থী তালিকা। তালিকা প্রকাশের অন্তত মাসখানেক আগে থেকে, মিনিট খানেক আগে পর্যন্ত, বাংলার আনাচে কানাচে কী বিপুল জল্পনা ছড়িয়েছিল প্রার্থী নাম নিয়ে, তা কমবেশি সকলেই জানেন। তার মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া। ক্ষণে ক্ষণে তৃণমূলের হয়ে ভোটে দাঁড় করাচ্ছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলিকে, ইমন চক্রবর্তীকে, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তকে, পার্ণো মিত্রকে। যেহেতু মমতা জমানাতেই আবার বাংলায় 'সেলিব্রিটি ক্যান্ডিডেট' বিষয়টি খানিকটা প্রাধান্য পেয়েছে, মিটিং মিছিলে টলিপাড়ার চেনা মুখেদের চিনে নেওয়া সহজ হয়েছে, তাই জল্পনা বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। তাতে জল্পনাকারীদের খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। ধর্মতলার ধর্না মঞ্চের কথা বাদ দিলেও, সাম্প্রতিক সময়ে মমতার মিছিলে, বক্তব্যে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই পিছনে অমুক চ্যানেলের তমুক নায়িকা, অমুক নায়ককে হামেশাই দেখা গিয়েছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় যায়, জল্পনার ঠেলায় একটা সময় দলের নেতারাই বুঝিবা খেই হারিয়ে ফেলছিলেন। রোজ সকালে উঠে দেখতেন, বহু 'স্টার' প্রার্থী হয়ে গিয়েছেন। প্রার্থী তালিকা ঘোষণার আগেও জল্পনা তুঙ্গে ছিল সেসব নাম নিয়েই।
কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস কী করল? ২৯১ আসনের প্রার্থী তালিকায় এবার একেবারে ছেঁটে ফেলা হয়েছে 'স্টার গ্লো'। বদলে যে কথা অভিষেক এর আগেও বারবার বলেছেন, দলে গুরুত্ব দেওয়া হবে পারফম্যান্সকে। দেওয়া হলও তাই। এক ধাক্কায় তৃণমূল প্রার্থী তালিকা থেকে সরিয়ে দিল ৭৪ জন সিটিং বিধায়ককে। মমতা কি জানতেন না, এক ধাক্কায় ভোটের মুখে এতজন বিধায়ককে টিকিট না দিলে তাঁরা ক্ষোভ দেখাতে পারেন? তাঁদের অনুরাগী, অনুগামীরা বিক্ষুব্ধ হলে সমস্যা হতে পারে? জানতেন বিলক্ষণ। এই প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে একটি প্রসঙ্গ। দলের সুপ্রিমো, জনগণের কাছে ভোট চাইতে গিয়ে, বলেন, বিধায়ক প্রার্থী আসনে আসনে পৃথক, দলের মুখ কিন্তু তিনি। তিনিই। অর্থাৎ মমতা জানেন, দলের যে 'খেলা'র কথা বলেন নেতা কর্মীরা, তা ঘোরান তিনি নিজেই। সেক্ষেত্রে এক যোগে ৭৪ বিধায়ককে টিকিট না দিতে, বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি তিনি। কেন্দ্র বদল করে দিয়েছেন ১৫ বিধায়কের।
কিন্তু মূল প্রসঙ্গ অন্য। ২৩৯ পুরুষ প্রার্থী এবং ৫২ মহিলা প্রার্থীদের যে তালিকা ঘোষণা করল তৃণমূল কংগ্রেস, তাঁদের মধ্যে ১৩ জন মঙ্গলবার সকালে তৃণমূলের পতাকা হাতে নিয়েছেন। ভাবা যায়! যেখানে তাবড় তাবড় নামেদের নিয়ে জল্পনায় ছেয়ে গিয়েছিল চতুর্দিক, সেখানে ঠিক সকাল ১১টা থেকে, জেলায় জেলায় তৃণমূল কংগ্রেস আচমকা যোগদান কর্মসূচি শুরু করে। বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, মুর্শিদাবাদ, কলকাতা। জায়গায় জায়গায় শুরু হয় যোগদান। তখনও কেউ আঁচ করতে পারেননি, তাঁরাই তৃণমূলের প্রার্থী। ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেও তাঁরা তৃণমূলের কেউ ছিলেন না।
তালিকা এক নজরে-
অভিনব ভট্টাচার্য- কৃষ্ণনগর উত্তর।
ডাঃ অতীন্দ্রনাথ মণ্ডল- কল্যাণী।
মঙ্গল সোরেন-ঝাড়গ্রাম
তনুশ্রী হাঁসদা- রানীবাঁধ
সৌগত বর্মন- রানাঘাট দক্ষিণ
অনুপ মণ্ডল-বাঁকুড়া
গৌতম মিশ্র- বড়জোড়া
শিবশঙ্কর পাল-তুফানগঞ্জ
নুর আলম-সামশেরগঞ্জ
আব্দুল আজিজ- লালগোলা
বাবর আলি- জলঙ্গি
মুফতি আব্দুল মতিন- হাড়োয়া
পবিত্র কর-নন্দীগ্রাম।
এই ১৩জনকে ঠিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশের আগে, পরপর যোগ দেওয়ানো হয় তৃণমূল কংগ্রেসে। তারপরে, ঠান্ডা মাথায় প্রার্থী তালিকা বানিয়ে ফেলল রাজ্যের শাসক দল, ১০ মিনিটে। সমীকরণ এমন নয় নিশ্চয়? অর্থাৎ, যখন জল্পনা তুঙ্গে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে, তখন শেষ বেলার চমক দেওয়ার অপেক্ষা করছিলেন মমতা, স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে। বোঝাতে, বাংলার রাজনীতিতে তাঁকে বুঝে ফেলা আদতে এতটা সহজ নয়। সহজ নয় তাঁর দলের স্ট্র্যাটেজি বোঝা।
&t=1s
