রাজেশ ভট্টাচার্য
আমাদের দেশের আর্থিক অবস্থা সংকটজনক—এই অপ্রিয় সত্য স্বীকার করে নেওয়া দরকার, এখনই। ব্যাবসা-বাণিজ্য জগতের প্রতিদিনের আলোচনায় সেটা বোঝা যাচ্ছে, যতই সতর্কতার সঙ্গে তা উচ্চারিত হোক, ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ২০১৭ সাল থেকেই কমেছে। অন্যতম কারণ, দেশের জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে না। উপরন্তু, পরিকাঠামোয় সরকারি ব্যয় বাড়িয়েও স্তিমিত বেসরকারি বিনিয়োগকে চাঙ্গা করা যাচ্ছে না—এটাও অনেক দিন ধরেই। ওদিকে, বিদেশের বাজারে ভারতীয় পণ্যের চাহিদা বিশেষ নেই বা বাড়ছে না। গত বছরের বাজেটে মধ্যবিত্তের ওপর কর ছাড়ের মধ্যে দিয়ে ভোগব্যায় বাড়ানোর একটা চেষ্টা দেখা গেল। আদতে এই কর ছাড়ের সুবিধা পাওয়া মানুষেরা মোট জনসংখ্যার একটা ক্ষুদ্রাংশ। স্বাভাবিকভাবেই, এতে দেশের বিনিয়োগকারীরা বিশেষ উৎসাহিত হননি, সেটা বাজেটের পরের স্টক মার্কেট দেখেই বোঝা গেল। বিদেশী বিনিয়োগ তো কয়েক বছর ধরেই কমে আসছে। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতন দ্বিতীয় ট্রাম্প সরকারের শুল্ক (রাজ)নীতি। বিশ্বায়ন সেই ২০০৮ সালের বিশ্বজোড়া আর্থিক মন্দার সময় থেকেই নিম্নগামী–এবারে তার আনুষ্ঠানিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এরই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগের ফলে চাকরির বাজার অস্থির। ভারতবর্ষের তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে তার প্রভাব যে পড়বেই, এবং পড়ছেও, তা নিশ্চিত। তবে, কতটা সেটাই দেখার।
ঈশান কোণে মেঘ পুঞ্জিভূত হইতেছে, স্থলদেশে বিভিন্ন স্থানে ধুম্র উদ্গিরন হইতেছে—যুদ্ধ এসে গেছে। ইরানে যে যুদ্ধ চলছে, তার অর্থনৈতিক প্রভাব কত দূর এবং কত দিন অবধি থাকবে, সেটা এখনও পরিষ্কার নয়। প্রত্যেক দেশ নিজের জাতীয় সুরক্ষাকে প্রাধান্য দিছে। বোঝা যাচ্ছে, বিদেশের বাজারের ওপর নির্ভর করে আর্থিক নীতি প্রণয়ন করার দিন ফুরিয়েছে। অতএব, সেই অভ্যন্তরীণ বাজারের কাছেই ফিরতে হবে দেশীয় উৎপাদকদের।
দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোর প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির সম্পর্কের কথা সাধারণত ওঠে না। কিন্তু, ওঠা উচিত। যেমন, জনসংখ্যা এবং অর্থনীতির আয়তনের দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্যতম বৃহৎ রাজ্য, তাই পশ্চিমবঙ্গকে বাদ দিয়ে যে ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অসম্ভব, বিশেষ করে যখন অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভর করেই তা করতে হবে-- সেটা সাধারণ বুদ্ধিতে বোঝা যায়। একই কথা বিহার, উত্তরপ্রদেশ বা যেকোনো বড় রাজ্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সামাজিক ন্যায়, বা আঞ্চলিক সমতার যুক্তির দিকে থেকে নয়—পাটিগণিতের সরল হিসাবেই এটা বোঝা যায়। কোনও রাজ্যের জনসংখ্যা বেশী হলে, সেই রাজ্যের জাতীয় অর্থনীতির ওপর প্রভাব তো বেশি হবেই।
যেমন ধরুন, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উত্তর প্রদেশ—এই রাজ্যগুলির অর্থনীতি ধুঁকলে থাকলে, এবং ফলত, এই তিনটি রাজ্যের সম্মিলিত ৪৫ কোটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত থেকে গেলে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ বাজারের আয়তনও ছোট থেকে যাবে। সেটা দেশীয় উৎপাদকদের পক্ষে খারাপ—কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার না বাড়লে, দেশীয় পুঁজির এক নিরাপদ, স্থায়ী বাসা তৈরি হয় না। দেশীয় উৎপাদকদের বিদেশের বাজারের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাতে ঝুঁকি আছে। অন্য দেশের বাজারে প্রবেশাধিকার আদতে সেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর নির্ভর করে। চিরকালই তাই। আজ মাল বেচলেও, কাল দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় শাসনের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির ধাক্কায় এই তেতো সত্য হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে আমেরিকায় পণ্য রপ্তানি করা অন্য দেশের উৎপাদকরা। স্বাধীনতার প্রাককালে ভারতের নেতৃত্বস্থানীয় শিল্পপতিরা তাদের নিরাপত্তার যুক্তিতেই দেশীয় বাজার বিকাশের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছিলেন। যাক, সেই নিশ্চিন্দিপুরও নেই, সেই মানিকও নেই।
অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর যদি জাতীয় আর্থিক বৃদ্ধি নির্ভর করে, তাহলে কি প্রয়োজন--প্রতিযোগিতামূলক না সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রবাদ? এটা সত্যি যে, ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে ভারতবর্ষের আর্থিক বৃদ্ধির হার বেড়েছে। কিন্তু, তার সঙ্গেই বেড়েছে আঞ্চলিক বৈষম্য। কয়েকটা রাজ্য এগিয়ে গিয়েছে অনেকটাই, আর পিছিয়ে থাকা রাজ্যগুলো তুলনায় হতশ্রী দেখাচ্ছে। মুশকিল হচ্ছে, জাতীয় উন্নয়ন ঘোড়ার রেস নয়, ঘোড়ার গাড়ির রেস। সবকটা ঘোড়া একসঙ্গে এক গতিতে না দৌড়লে, গাড়ি বসে যাবে। এই প্রসঙ্গে, কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তরাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়টা উঠে আসছে না। নীতি আয়োগের প্রাক্তন সিইও আমিতাভ কান্তযখন বলেন, যে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির হারকে ১০ শতাংশে তুলে আনতে দরকার ১০টা “চ্যাম্পিয়ন রাজ্য”, তখন মনে হয় যেন বাকি রাজ্যগুলোর সেরকম বিশেষ কোনও ভূমিকা না থাকলেও চলবে।
এটা কোনও বিচ্ছিন্ন মন্তব্য নয়। উন্নয়ন যেন রেসের দৌড়, রাজ্যগুলো যেন একেকটি রেসের ঘোড়া—যুক্তরাষ্ট্রবাদের এই বিশেষ ধারণা ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে । ঠিক যেভাবে বাজারে পণ্যের উৎপাদকদের মধ্যে আগ্রাসী প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়েইআর্থিক বৃদ্ধি হয় বলে অনেকে মনে করেন,যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে রাজ্যগুলোর মধ্যে সেই একই উন্নয়নের প্রতিযোগিতা উৎসাহিত করা হলে, দেশেরও এবং রাজ্যেরও মঙ্গল—এই ধারনাটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।কেন্দ্রীয় সরকার যেন এরকম বিভিন্ন টুর্নামেন্টের সংঘটক এবং আম্পায়ার। একের পর এক সূচক ব্যাবহার করে রাঙ্কিং চালু হয়েছে— ইজ অফ ডুইং বিজনেস, স্টার্ট আপ ইকোসিস্টেম, ইনোভেশন ইনডেক্সইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে, ভৌগলিক অবস্থান, জনঘনত্ব, আঞ্চলিক ইতিহাস এবং আরও অনেক কিছুর ফলে, বিভিন্ন রাজ্যের বুনিয়াদী অর্থনৈতিক সম্পদ এক নয়। অসম অবস্থান থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজ্য মুক্ত বাজারী অর্থনীতিতে একই ভাবেসাফল্য পাবে, অর্থনীতির তত্ত্ব এই কথা বলে না।
কিন্তু, ভারতের মত একটি যুক্তরাষ্ট্রে আঞ্চলিক নয়, জাতীয় অগ্রগতিই প্রথম এবং শেষ বিচার্য বিষয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের জাতীয় অর্থনৈতিক ক্ষমতারই একমাত্র ভার আছে, কয়েকটি রাজ্যের উন্নয়ন দেখিয়ে সেখানে কল্কে পাওয়া যায় না। কেন্দ্র-রাজ্য রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে এটা মাথায় রাখা ভাল। একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক। বেশ কয়েক বছর ধরেই পশ্চিমবঙ্গের সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সংঘাত চলছে, কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে রাজ্যের গ্রামোন্নয়নের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পে প্রাপ্য টাকা না পাওয়া নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফ থেকে বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধের অভিযোগ উঠেছে, গত কয়েক বছরে বার বার। এর মধ্যে অধুনাবিলুপ্ত ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প অন্যতম। একটা বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে সংঘাত। কেন্দ্রীয় সরকারের অভিযোগযে রাজ্য সরকার নিয়ম মানছে না, সহযোগিতা করছে না, দুর্নীতি আটকাতে পদক্ষেপ করছে না, ইত্যাদি। রাজ্য সরকার এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করছে। এর ফলে, ২০২২ সালথেকে পশ্চিমবঙ্গ এই ১০০ দিনের প্রকল্পে আর কোনও টাকা পায় নি।
কার দোষ সেই তর্কে না ঢুকে, অন্য দিক থেকে ব্যাপারটা দেখি—টাকা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া অন্য উপায় কি ছিল না? প্রথমত, টাকাটা রাজ্য সরকার নয়, রাজ্যের গরীব মানুষের প্রাপ্য। রাজ্য সরকারের যদি দুর্নীতি থাকেও, তার জন্য গরীব মানুষকে শাস্তি দিতে হবে কেন? কোভিডের ধাক্কায় বেসামাল অর্থনীতিতে, গ্রামে গ্রামে ফিরে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের, যাদের অনেকেরই শেষ সহায় ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প, তাদের ওপর এই নৃশংস আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অভূতপূর্ব। শত্রু দেশের সঙ্গে এরকম আচরণ দেখতে পাওয়া যায়, দেশের একটি রাজ্যের মানুষের ওপর এই নির্মম রাজনৈতিক আক্রমণের দ্বিতীয়উদাহরণ পাওয়া মুশকিল।
দ্বিতীয়ত, এই প্রকল্পগুলোর জন্য যে টাকাটা খরচা হয়, সেটা সরাসরি নিচের স্তরে, সাধারণ গরীব মানুষের হাতে পৌঁছোয়। অভাবের সংসারে যা টাকা আসে, তা খরচা হয়ে যায়, এটা আমরা জানি। বরং আয়ের বিচারে জনসংখ্যার উপরের দিকে থাকা, একটা ক্ষুদ্র মধ্যবিত্ত অংশকে আয়কর ছাড় দিলে সে কতটা খরচা করবে, আর কতটাই বা সঞ্চয় করবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। অর্থাৎ, ঝিমিয়ে পড়া দেশীয় বাজারকে চাঙ্গা করতে, দেশের মধ্যবিত্তের উপর আয়কর ছাড়ের চেয়ে ১০ কোটি জনসংখ্যার রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের গরীব মানুষদের ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে টাকা দেওয়া বাজার তৈরিতে অনেক বেশী কার্যকরী । অর্থনীতির সহজ যুক্তিতে তাই মনে হয়।
তৃতীয়ত, দুর্নীতি একটা জটিল সমস্যা। রাজ্যের প্রাপ্য টাকা বন্ধ রেখে সেটার সমাধান হবে, এই ভাবনার সমর্থনে অন্তত অর্থনৈতিক যুক্তি নেই। বরং এতে পশ্চিমবঙ্গের শুধু নয়, দেশের উন্নয়নের প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। রাজ্য সরকারের ভুল থাকলে, জাতীয় স্বার্থেই, অন্য পথে তার মোকাবিলা করা যেত। সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রবাদেও সংঘাত হয়, কিন্তু তার সমাধানের জন্য একটা পারস্পরিক দায়বদ্ধতা থাকে, সহনশীলতা থাকে এবং সবচেয়ে বেশী যেটা জরুরী, রাজনৈতিক বিরোধীতামূল যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতিকে সম্মান করেই হয়। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা কিন্তু স্কুলের স্কেল হাতে মাস্টারমশাইয়ের মতন হওয়া কাম্য নয়। শুধু রাজ্যের না, জাতীয় স্বার্থেই।
বিশ্বায়নের সূর্য তো ডুবল, মিনার্ভার প্যাঁচা কি উড়ল?
(লেখক: অধ্যাপক, পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ, আই আই এম ক্যালকাটা
লেখাটি লেখকের ব্যক্তিগত মতামত।)













