উদ্দালক


এসআইআর আসলে ধর্ম দেখে না, বর্ণ দেখে না, জাত দেখে না, দেখে ভোট, দেখে ভোটার! ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর সেই কথাটা যেন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। স্পষ্ট হচ্ছে, ফাঁদ পেতেছিল রাষ্ট্র। যে রাষ্ট্র একদিন বলত যৌথতার কথা, একসঙ্গে বাঁচার কথা, সেই রাষ্ট্রের স্বশাসিত সংস্থা নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা তৈরি করতে গিয়ে সেই ফাঁদ ক্রমে গুটিয়ে আনছে। আর দেখা যাচ্ছে, যাঁরা বাদ পড়ছেন, তাঁদের ধর্ম, জাত, কিছুই নির্দিষ্ট নয়। বিজেপি যে ন্যারেটিভ তৈরি করার চেষ্টা করছে, যে মেরুকরণ করার চেষ্টা করছে, সেটা নয়, বরং ‘হিসাব মিলাতে গিয়ে দেখি’ মুসলিম নামের থেকে বেশি বাদ পড়েছে হিন্দু নাম। অর্থাৎ, কেবল মুসলিমরা নয়, কমিশনের রক্তচক্ষুর মুখে পড়েছেন হিন্দুরাও। 

পরিসংখ্যানের দিকে একবার তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, এখনও পর্যন্ত ৯০ লক্ষ ৬২ হাজারের কিছু বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দেখা গিয়েছে, মোট ৫৭ লক্ষ ৪৭ হাজার ৩১৪ জন হিন্দুর নাম বাদ পড়েছে। আর মোট ৩১ লক্ষ ১০ হাজার ১৬৩ জন মুসলিমের নাম বাদ পড়েছে। শতাংশের বিচারে যা মোট বাদ পড়া ভোটারের ৩৪ শতাংশ। আর মোট বাদ পড়া ভোটারের মধ্যে সিংহভাগ, অর্থাৎ ৬৩.৪২ শতাংশ হিন্দু। যে তিনটি ক্ষেত্রের বাদ পড়া ভোটারের হিসাব এটি, সেগুলির প্রথমে রয়েছে, যাঁরা রাজ্য ছেড়ে চলে গিয়েছেন, মারা গিয়েছেন, বা যাঁদের ঠিকানা পরিবর্তন হয়েছে তাঁদের নাম। তারপর রয়েছে প্রথমবার প্রকাশিত হওয়া ভোটার তালিকায় বাদ পড়া নাম এবং শেষে বিচারাধীন তালিকায় থাকা নাম। এর মধ্যে প্রথম দু’টি ক্ষেত্রেই বিপুল সংখ্যায় হিন্দুর নাম বাদ পড়েছে। একমাত্র বিচারাধীন অবস্থায় নাম বাদের সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছে মুসলিমদের নাম। আর কেবলমাত্র বিচারাধীন তালিকা ধরেই তাই রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে চাইছে গেরুয়া শিবির। কিন্তু সেটাই আসল তথ্য নয়, আসল তথ্য বা সামগ্রিক চিত্র দেখলে বোঝা যাচ্ছে, কেবল মুসলিমরা নন, বিপুল সংখ্যায় হিন্দুরাও এই নাম বাদের খেলায় ভোটাধিকার খোয়াতে বসেছেন। ভবানীপুর কেন্দ্রের দিকে তাকালেও এই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বাদ পড়া ভোটারের পরিমাণ ৫০ হাজার ৯৮৭। এর মধ্যে হিন্দুর সংখ্যা ৩৭ হাজার ২২৭ আর মুসলিমের সংখ্যা ১২ হাজার ৮৪। আর এই কথাটাই এখনও কেউ তেমন করে বলছে না। বলছে না যে আসলে নির্বাচন কমিশনের এই সামগ্রিক পরিকল্পনায় হয় কোনও বাহ্যিক ইন্ধন আছে নয়ত এমন কোনও গলদ আছে, যেটা শেষ পর্যন্ত কমিশন সামলাতে পারছে না। সামলাতে না পেরে, এখন কোনওমতে ভোটের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। এ যেন সেলস টার্গেট বেঁধে দেওয়া। সেই টার্গেট পূরণ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে কমিশন। 

আর সবচেয়ে হাস্যকর যুক্তি কমিশন এখন দিচ্ছে, যেটি হল, ভোটের পরেও ভোটার লিস্টে নাম তোলা যাবে। এখন প্রশ্ন হল, ভোটের পরে নাম তুলে ভোটারের লাভ কী! ধরা যাক, কোনও কেন্দ্রে কোনও প্রার্থী পরাজিত বা জয়ী হলেন এক-দেড় হাজার ভোটে। আর সেই কেন্দ্রে ট্রাইবুন্যালে আবেদন করেছেন আড়াই হাজার ভোটার। ভোটের পর বিচার শেষে দেখা গেল তার মধ্যে দু’হাজার লোকের নাম উঠে গেল। এবার সেই ভোটাররা হয়ত সকলেই পরাজিত প্রার্থীর দিকে ভোট দিতেন, তাহলে কী হবে! একবার ভোট দিতে না দিতে পারার জন্য সম্পূর্ণ অন্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার দায় কমিশন নেবে? নেবে না। তাই ভোটের পর নাম তুলতে পারার যুক্তিটা খেলো এবং হাস্যকর। 


আসলে এই ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ (এসআইআর) বৃহত্তর পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও কোনও আকার-ইঙ্গিতের প্রয়োজন নেই, বিহারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী তো স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, ভোটার তালিকায় যাদের নাম বাদ পড়েছে তাঁদের আধারকার্ড বাতিল করা হয়েছে, এবার রেশন কার্ড, লাইসেন্স বাতিল করা হবে। ফলে ছবিটা ক্রমে যেন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। বিজেপি বিরোধীরা বলছে, এখানে ধর্মটা বিষয়ই নয়, বরং যাঁরাই বিরোধী, তাঁদেরই বাদ দেওয়ার একটা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। বাংলায় মতুয়া গড়ে বিপুল সংখ্যায় মানুষের নাম বাদ পড়েছে বা এখনও বিচারাধীনের আওতায় ঝুলছে। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে একাধিক সরকারি প্রকল্পের সুবিধা ও সরকারের জনপ্রিয়তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষমতা এখনও এ রাজ্যে বিজেপির নেই। কারণ, দিনে-দিনে ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে গেরুয়া শিবিরের তৃণমূল স্তরের সংগঠন। কোনওভাবেই বুথ স্তরে লড়াই করে ভোটে বিজেপি জিততে পারবে না বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। আর সেই কারণেই গোড়া থেকে ভোটের ডেমোগ্রাফি বা বৈচিত্র পাল্টে দিয়ে ভোট বৈতরণী পার করতে চাইছেন মোদি-শাহরা। কিন্তু একেবারে তৃণমূল স্তরে মানুষের মনের মধ্যে থাকা অসন্তোষের আঁচ কী তাঁরা পাচ্ছেন না? বুঝতে পারছেন না, আসলে মানুষই গণতন্ত্রের শেষ কথা বলে। এভাবে ভোটের বৈতরণী জোর করে পার করতে গেলে শেষে নৌকাডুবির সম্ভাবনাই বেড়ে যায়। আর সেই ডুবন্ত নৌকা যদি একবার তলিয়ে যায়, তাকে ফের পাড়ে ফেরানো অসম্ভব হয়ে যাবে।