উদ্দালক
সমস্ত আলো কেড়ে নিতে জানেন তিনি। জানেন, কীভাবে রাজনীতি করতে হয়। কীভাবে মানুষের মনের গভীরে পৌঁছে যেতে হয়। কীভাবে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হয়। সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করে বেরিয়ে আসার পর তোলা এই ছবিতেই সে কথা স্পষ্ট। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, আরও যেন নিশ্চিত হচ্ছে তাঁর জয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি আদালতে দাঁড়িয়ে আজ যেভাবে কথা বললেন, যেভাবে তাঁকে মান্যতা দিল আদালত এবং তাঁর যুক্তি, প্রশ্ন ও দৃঢ়তার সামনে যেমন নুব্জ্য হয়ে রইল কমিশন ও কেন্দ্রের আইনজীবীর দল, তা দেখে মনে হতে পারে এ যেন কোনও সুপারহিট কোর্টরুম ড্রামার দৃশ্য। সেখানে সমস্ত আলো একজনের উপরেই। যিনি এই মামলার পিটিশনার মাত্র। বাংলার আর কোনও রাজনীতির মুখ যে তাঁর আলোকবর্ষ কাছাকাছি নেই, সেটাও আজ আবারও প্রমাণ করে দিলেন মমতা ব্যানার্জি। তিনি ধারে-ভারে সকলের থেকেই কয়েক হাজারগুণ এগিয়ে।
সকালে আদালতে প্রবেশের সময় তিনি কথা বলেননি। বেরনোর পরেও কোনও কথা বলেননি সাংবাদিকদের সঙ্গে। শুধু তাঁর মুখে লেগেছিল হাসি। কোর্টরুম বসার পর নিজের মামলার জন্য বসে অপেক্ষা করেছেন আদালতের শেষ বেঞ্চে বসে। তারপর নিজের আইনজীবীর দল নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। সওয়াল করতে শুরু করেছিলেন মমতার আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান। কপিল সিব্বল অসুস্থ, তিনি ছিলেন অনলাইনে। শ্যাম দিওয়ান অত্যন্ত যুক্তি পরম্পরায় কথা বলছিলেন, তার মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী হঠাৎ কিছু বলতে চান। তিনি দু’লাইন বলার পরে প্রধান বিচারপতি তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, তিনি তাঁকে বলার সময় দেবেন। পাঁচ মিনিট সময় চান মুখ্যমন্ত্রী, বিচারপতি বলেন, পাঁচ কেন, পনেরো মিনিট তিনি সময় দিতে পারেন। এরপর মুখ্যমন্ত্রী একের পর এক প্রশ্ন তুলতে থাকেন, যার স্পষ্ট কোনও উত্তর কমিশনের আইনজীবীদের কাছে ছিল না। মুখ্যমন্ত্রীর একেরপর এক প্রশ্নের সামনে কার্যত দিশাহারা কমিশনের আইনজীবীরা তখন বলেন, যে প্রশ্ন মুখ্যমন্ত্রী করছেন, তেমন বিষয় কমিশনের কাছে কোনও অভিযোগ আসেনি, তাই সমাধানের চেষ্টাও হয়নি। এখন এলো, আগামী সোমবার পর্যন্ত সময় দিলে এসবের সদুত্তর নিয়ে কমিশন আদালতে আসবে। অর্থাৎ, কিছুটা সময় চাওয়া ছাড়া আজকে আদালতে আর কিছুই করতে পারেনি কমিশন।
রাজনীতির ছাত্র হিসাবে এই শুনানি শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, কড়া হেডস্যারের সামনে পড়লে ফাঁকিবাজ পড়ুয়ার যেমন অবস্থা হয়, কমিশনের অবস্থা হয়েছে তেমন। কোনও মতে আজকের দিনটা কাটিয়ে দিতে পারলে যেন কমিশন ও কেন্দ্রের আইনজীবীরা বেঁচে যান। কোনও মতে মমতার প্রশ্নের হাত থেকে বেরিয়ে এসে, রোজকার শুনানির খাঁচায় ঢুকে পড়তে পারলে যেন মুক্তি। যেন কমফোর্ট জোনের বাইরে গিয়ে আইনজীবীরা বুঝতেই পারছেন না কী করবেন। দেখে মনে হল, সেই কারণেই একেবারে শুরু থেকে পরের শুনানির তারিখ চাইছিলেন তাঁরা, যাতে আজ আদালতে দাঁড়িয়ে মমতা তেমন কিছু বলতে না পারেন, যাতে দেশের কাছে লড়াইয়ের বার্তাটা কোনওমতে না পৌঁছয়। কিন্তু সে গুড়ে বালি। মমতা যেখানে, সেখানে পিলপিল করবে লোক, সব ক্যামেরা থাকে একদিকে, সব আলো থাকবে একদিকে, এটা এখন ভারতীয় রাজনীতির ব্যকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, আইনজীবীরা হয়ত তা ঠাওর করতে পারেননি। সেই কারণে, জনসভার মমতা, পথের মমতা, লড়াইয়ের মমতাকে কীভাবে সামাল দেবেন তা বুঝে ওঠার আগেই জালে বল জড়িয়ে দিয়ে চলে গিয়েছেন তিনি।
দিল্লির সাংবাদিক মহলের খবর, সুপ্রিম কোর্টে আঞ্চলিক বিষয়ের মামলার এজলাসে এমন ভিড় সচরাচর দেখা যায় না। বাংলার সংবাদমাধ্যম তো বটেই, জাতীয় ও দেশের অন্য আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমও আজ তাকিয়ে ছিল কোর্টরুম ওয়ানের দিকে। সেখানে এমন ভিড় হয় যে শেষ পর্যন্ত বহু সংবাদমাধ্যমের কর্মী প্রবেশই করতে পারেননি। শুধু তো তাই নয়, মামলা শেষ মমতা যখন বেরিয়ে আসেন, বাইরে তখন সুপ্রিম কোর্টের আইজীবীদের থিকথিকে ভিড়। একবার দেখার জন্য। তার মধ্যেই এক আইপিএস একটি বই উপহার দিলেন মুখ্যমন্ত্রীকে। সেই বই হাতে নিয়ে চওড়া হাসি মুখে কোর্ট চত্ত্বর ছাড়লেন তিনি।
নির্বাচনমুখী বাংলায় সভা-সমিতি, অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, কেন্দ্রীয় এজেন্সি, সব নিয়ে আগামী কয়েকমাস পারদ আরও চড়বে। বাক্যবানে বিদ্ধ করতে একে-অপরকে ছাড়বে না শাসক-বিরোধী কেউই। কিন্তু তার মধ্যেই দেশের রাজনীতির ব্যতিক্রমী চরিত্র মমতার এমন ভূমিকা থেকে যাবে সূর্যগ্রহণের হিরের আংটির মতো দূর্লভ হয়ে।
এর আগেও সাধারণ গরিব মানুষ বিশ্বাস করেছে, চারিদিক দেখে মনে হয়, এখনও বিশ্বাস করে তাঁদের দিদিকে। কারণ, বুধবার সকাল থেকে ট্রেনে, বাসে, কোথাও কোনও আলোচনা নেই, কোনও কথা নেই, বাঙালির নজর মোবাইলে, কোথায় দেখা যায়, মমতা কী বলছেন আদালতে। কারণ, তাঁরা তো দেখেনি এমন কোনও মুখ্যমন্ত্রীকে যিনি নিজের মামলায় নিজেই সওয়াল করতে চান। যিনি আদালতে ঢুকে বসে থাকেন শেষ বেঞ্চে। যিনি ভরা সভায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের সঙ্গে এক সারিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন, অপেক্ষা করেন। হাতজোড় করে আদালতের সামনে বলেন, আমি সাধারণ মানুষের হয়ে কথা বলতে এসেছি, কোনও দলের হয়ে নয়। বিজেপি বা অন্য বিরোধী দলকে আরও কয়েক মহাকুম্ভ পার করতে হবে এহেন মানুষকে ভোটে হারাতে গেলে। আদালত, এজেন্সি তো দূরহস্ত, আন্দোলন করেও মমতার বিরুদ্ধে একটা গোটা রাজ্যের মতকে নিয়ে যাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে গেল আজকের পরে। কারণ, রাজনীতির লড়াই হয় মানুষের মাঝে, মিডিয়ার মাঝে নয়।
