অংশুমান কর: একজন লেখক কি কখনও তাঁর নিকৃষ্ট গল্পগুলির কোন সংকলন ঘোষণা করে প্রকাশ করতে পারেন? সাধারণ লেখক হলে পারেন না, ব্যক্তিটি যদি হন অসাধারণ এবং তার রসবোধ যদি হয় তীক্ষ্ণ, তাহলে অবশ্যই পারেন। এমনই একটি কাজ করেছিলেন প্রমথনাথ বিশী। প্রকাশ করেছিলেন তাঁর গল্পের একটি সংকলন যে-বইটির শিরোনাম ছিল প্র.ণা.বি-র নিকৃষ্ট গল্প। এখানেই শেষ নয়। গ্রন্থটি তিনি আবার উৎসর্গ করেছিলেন “উৎকৃষ্ট গল্পের লেখক স্বর্গীয় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে”। এমনই একজন মানুষ ছিলেন প্রমথনাথ বিশী। সরস পণ্ডিত, সব্যসাচী লেখক। বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হতো একশো পঁচিশ।
প্রমথনাথ বিশীর জন্ম ১৯০১ সালের ১১ জুন অবিভক্ত বাংলার রাজশাহির জোয়াড়ি গ্রামে। তাঁর বাবা ছিলেন নলিনীনাথ বিশী আর মা সরোজবাসিনী দেবী। বিশী পরিবারের ছিল জমিদারি ঐতিহ্য, কিন্তু নলিনীনাথ বিশী জমিদারির চেয়ে বেশি যুক্ত থাকতেন স্বদেশি আন্দোলনে। নলিনীনাথ ছিলেন স্বাধীনচেতা ও জাতীয়তাবাদী। এই স্বভাবের প্রভাব প্রমথনাথের জীবনেও পড়েছিল গভীরভাবে। আজীবন তিনি ছিলেন গান্ধির অন্ধভক্ত। শান্তিনিকেতনে মহাত্মা গান্ধিকে অভ্যর্থনা জানানোর দায়িত্ব পড়েছিল ছাত্র প্রমথনাথের ওপর। গান্ধীর প্রভাব তাঁর জীবন থেকে আর অন্তর্হিত হয়নি। সত্যি বলতে কি, প্রমথনাথের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় শান্তিনিকেতনে আগমনের মধ্য দিয়ে। পিতা নলিনীনাথের ইংরেজি শিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্বাস ছিল না। ফলে মাত্র ন-বছর বয়সে প্রমথনাথের ঠাঁই হয় শান্তিনিকেতনে। এখানেই তাঁর জীবনের পরবর্তী প্রায় সতেরো বছর কেটেছিল। শান্তিনিকেতন কেবল তাঁর ইশকুল ছিল না; তাঁর মনন এবং সৃজনকে পুষ্ট করেছিল রবীন্দ্রনাথের এই আশ্রম। শান্তিনিকেতনের উন্মুক্ত, উদার পরিবেশ প্রমথনাথের স্বাধীনচেতা সত্তাকে আরও প্রসারিত করেছিল।
যে-রসিকতার কথা বলে এই লেখা শুরু, শৈশবের শান্তিনিকেতনে পড়াকালীন প্রমথনাথের সেই রসবোধের পরিচয় বারবার পাওয়া গেছে। শান্তিনিকেতনের নিয়ম-কানুনকে কেয়ার না করে মাঝে মাঝেই তিনি অভাবনীয় ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতেন। তাঁর আশ্রম-অনুজ সৈয়দ মুজতবা আলী তাই তাঁকে ‘বিদ্রোহী’ বলে অভিহিত করেছিলেন। আশ্রমের নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বন্ধুদের নিয়ে প্রমথনাথ বিশী ডিমের ওমলেট বানিয়ে খেতেন। গৃহশিক্ষক সুরেন করকে ফাঁকি দিয়ে মাঝরাতে দলবল নিয়ে গোয়ালাপাড়ায় গিয়ে গাছের থেকে খেজুর রসের হাঁড়ি নামিয়ে এনে খেজুর রস খেতেন। ভয়ডর একটু কমই ছিল তাঁর। এমনকি রবীন্দ্রনাথকেও ভয় না-পাওয়া প্রমথনাথ কিন্তু ভয় পেতেন অঙ্ককে। ‘গণিত-ভীতি’ তাঁকে দিয়ে কী কী দু:সাহিসিক কাজ করিয়ে নিয়েছিল সে কথা পরে নিজের বয়ানেই লিখে গিয়েছেন প্র. ণা. বি.। একবার অঙ্ক পরীক্ষার থেকে রেহাই পেতে তিনি ভরতি হয়ে যান হাসপাতালে। এবং তারপর অভিনয় করতে থাকেন এমন যে, সকলে মনে করে তাঁকে সাপে কামড়েছে। ব্যস্ত হয়ে তাঁকে দেখতে এসে পৌঁছন নন্দলাল বসু, ক্ষিতিমোহন সেন সহ আরও অনেকে। অনেকেই যখন ভাবতে বসেছেন প্রমথনাথের বুঝি আর প্রাণ রক্ষা হলো না তখনই হাসপাতালে উপস্থিত হন অঙ্কের শিক্ষক জগদানন্দ রায়। এরপর কী হয়েছিল তা প্র.ণা.বি-র বয়ানেই পড়ে নেওয়া যেতে পারে, “এমন সময় অদূরে জগদানন্দবাবুর কণ্ঠস্বর শ্রুত হল, ওরে কে আছিস, শক্ত দেখে একখানা কাঁঠাল গাছের ডাল ভেঙে আন্ তো।
আমি আর্তকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম, কাঁঠাল গাছের ডালে কি হবে?
–বিষ ঝাড়বো, অব্যর্থ মুষ্টিযোগ, আগে একবার হাতে হাতে ফল পেয়েছি।
এই বলে তিনি শক্ত কাঁঠাল গাছের ডালে শপ শপ শব্দ করতে করতে এগিয়ে এলেন । তখন আমার পলায়ন ছাড়া গত্যস্তর ছিল না”।
সেই অঙ্ক পরীক্ষায় কিন্তু পাস করেছিলেন প্রমথনাথ।
অঙ্ক নিয়ে প্রমথনাথের ছেলেবেলায় ঘটে যাওয়া বহু ঘটনাই কিন্তু ভীষণ মজার। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে এইসব ঘটনার কথা নথিবদ্ধ করে গিয়েছেন প্র.ণা.বি. নিজেই। যেমন একদিন গাছতলায় হচ্ছে জগদানন্দ বাবুর অঙ্কের ক্লাস। প্রমথনাথের ক্লাসে মন নেই। অমনোযোগী প্রমথনাথেরকাঁধে পড়ল দু-একটি আলতো থাপ্পড়। আর তা দেখেই এল চিরকুট, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের, “গাধারে পিটিলে হয় না অশ্ব/ অশ্ব পিটিলে হয় সে গাধা।” জগদানন্দবাবু চিরকুট দেখিয়ে জানতে চাইলেন, প্রমথনাথ এই দুইয়ের মধ্যে কোন শ্রেণির? প্রখর বুদ্ধিমান আর রসিক খুদে ছাত্রটি তৎক্ষণাৎ জবাব দিল, “আমি অশ্ব।” শুনতে আশ্চর্য মনে হলেও এই জগদানন্দবাবুই ছিলেন প্রমথনাথ বিশীর প্রথম মুদ্রিত কাব্যগ্রন্থ দেয়ালির প্রকাশক। অঙ্ক নিয়ে গল্প আরও আছে। অঙ্কের পরীক্ষায় একবার প্রমথনাথ লিখে এলেন কবিতা, “হে হরি, হে দয়াময়/ কিছু মার্ক দিয়ো আমায়”। পরীক্ষক নগেন্দ্রনাথ আইচ সেই খাতা নিয়ে সোজা চলে গেলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিয়ে নিলেন প্রমথনাথের পক্ষ। নগেন আইচকে বললেন, “ওকে অঙ্ক কষাতে চেষ্টা করো, কিন্তু কবিতা লিখতে বাধা দিও না। পরীক্ষার উদ্যত খাঁড়ার সামনে দাঁড়িয়ে ক-জনই বা এমন সরল স্বীকারোক্তি আর আত্মনিবেদন করতে পারে!”
প্রমথনাথ বিশীর ব্যক্তি জীবন এবং সাহিত্য জীবনে রবীন্দ্রনাথের প্রবল প্রভাব পড়েছিল। আজীবন তিনি পেয়েছিলেন কবির অফুরান সান্নিধ্য ও স্নেহ। প্র.ণা.বি. লিখেছেন, “এক বিষয়ে শাস্তিনিকিতনের আধুনিক ছেলেদের উপরে আমাদের জিত ছিল। আমরা রবীন্দ্রনাথের যে সঙ্গলাভের সৌভাগ্য পাইয়াছিলাম পরবর্তী কালের ছেলেরা তাহা পায় নাই। ছেলেদের কাছে থাকিবার জন্য কবি তখন নূতন বাড়ির দোতালায় থাকিতেন– এখন যার নাম দেহলিভবন। কিন্তু ইহাতেও সন্তষ্ট নাহইয়া তিনি ছেলেদের একটি ঘরেই বসিবার জায়গা করিয়া লইয়াছিলেন। এখানে বসিয়া সারাদিন তিনি লেখাপড়া করিতেন। কিন্তু এ সময়ে আমরা ছোটো। আর একটু বেশি বয়স হইলে দেখিয়াছি, এক-একদিন সন্ধ্যাবেলা তিনি ছেলেদের এক-একটি ঘরে ঢুকিয়া পড়িতেন। নানা রকম নূতন খেলা তিনি উদ্ভাবন করিতেন। দু-একটা খেলা আমার মনে আছে। ইহাকে মিলের খেলা বলা যাইতে পারে। একটা শব্দ তিনি মনে ভাবিতেন। তাহার অনুরূপ মিল বলিয়া প্রশ্ন করিয়া করিয়া, মূল শব্দটিকে বাহির করিতে হইত। হয়তো তিনি মনে করিলেন “ঘর”। তিনি বলিলেন, শব্দটার সঙ্গে “খর” শব্দের মিল। এখন আমাদের অনুরূপ মিল বলিয়া আসল শব্দটিকে আবিষ্কার করিতে হইত। অনেক সময়ে আমরাও এরূপ একটি শব্দ ভাবিতাম। তিনি প্রশ্ন করিয়া অনায়াসে মিলটা বাহির করিয়া ফেলিতেন”। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এই সহজ সুন্দর সম্পর্ক থাকলেও, রবীন্দ্রনাথকে ভয় পেত, শ্রদ্ধা করত আশ্রমের শিশুরা। প্রমথনাথের কিন্তু এই ভয় ছিল না। একবার অচলায়তন নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে শান্তিনিকেতনে। তাতে একটি দৃশ্যে ছাত্ররা দড়ি দিয়ে বাঁধবে আচার্য, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথকে। কিন্তু সমীহর ভারে তাঁকে বাঁধতে কিছুতেই রাজি হচ্ছে না কেউ। এগিয়ে এলেন সেই প্রমথনাথ। বললেন, “দূর ছাই, এ তো অভিনয় বৈ কিছু নয়।” বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী প্রমথনাথের সঙ্গে নাটকের যোগও ছিল কিন্তু নিবিড়। একাধিক নাটকে তিনি অভিনয়ও করেছিলেন যার মধ্যে কয়েকটি হলো বিসর্জন, বৈকুণ্ঠের খাতা, বেণীসংহার, চণ্ড কৌশিক, দ্য কিং অ্যান্ড দ্য রেবেল। শুধু এই নয় রবীন্দ্রনাথের রথের রশি নাটকটির জন্মের পেছনেও প্রমথনাথের একটি বড়ো ভূমিকা ছিল। প্রমথনাথ সহ বিশ্বভারতীর কয়েক জন ছাত্র রথের সময়ে গিয়েছিলেন সুপুর গ্রামে বেড়াতে। কিন্তু কোনো একটা কারণে ভারী রথটিকে কিছুতেই নড়ানো যাচ্ছিল না। তখন প্রমথনাথের পরিকল্পনা অনুযায়ী ধানকলের কাজ সেরে ফেরা সাঁওতালেরা হাত দিলেন রথের দড়িতে। গড়াল রথের চাকা। এই ঘটনাটি নিয়ে প্রমথানাথই প্রথম লিখলেন রথযাত্রা নাটক। এই নাটককে কাটাকুটি করে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন প্রকাশের জন্য প্রবাসী পত্রিকায় পাঠিয়ে দিতে। কিন্তু সম্মত হননি প্রমথনাথ; বলেছিলেন, “ওর মধ্যে আমার নিজস্ব কিছু নেই”। রবীন্দ্রনাথ নিজের নামেই ছেপেছিলেন এই নাটক। অবশ্য যথাযথভাবে ঋণ স্বীকার করেছিলেন প্রমথনাথের।
প্রমথনাথের কর্মজীবনও ছিল বর্ণময়। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সুযোগ পান। পরে কলকাতায় গবেষণার কাজে যুক্ত হন। তাঁর গবেষণার ফসল রবীন্দ্রকাব্যপ্রবাহ বাংলা সাহিত্যসমালোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। যদিও তাঁর থিসিসটিকে শেষ পর্যন্ত পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়নি। কিন্তু গ্রন্থাকারে প্রকাশ পাওয়ার পর তাঁর কাজটি আদৃত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আরও একাধিক বই লিখেছিলেন প্রমথনাথ। রবীন্দ্র সমালোচনার ধারায় প্র. ণা. বি.-র অবদানকে অস্বীকার করা যায় না কোনোমতেই। কলকাতায় থাকতে থাকতেই এক সময় তিনি স্বল্পকালের জন্য যোগ দিয়েছিলেন রিপন কলেজে (আজকের সুরেন্দ্রনাথ) অধ্যাপনার কাজে। পরে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দেন। আনন্দবাজার তাঁকে পরিচিতি দিয়েছিল। তাঁর লেখা “কমলাকান্তের আসর” বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম রবীন্দ্র-অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। যে-বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে পিএইচডি দেয়নি সেই বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপনার কাজে যুক্ত হওয়া কম গৌরবের ছিল না। শিক্ষক প্রমথনাথও প্রবল জনপ্রিয় ছিলেন এবং ছাত্রদের সঙ্গেও রসিকতা করতে ভুলতেন না। একটি সত্য ঘটনার কথা বলা যেতে পারে। প্রমথনাথ তখন রাষ্ট্রপতি মনোনীত রাজ্যসভার সাংসদ। সাংসদের দায়িত্ব পালন করতে নানা কাজে এদিকে ওদিকে ছুটতে হয় প্রায়ই। নিয়মিত ক্লাস নিতে পারেন না। এমন সময় একদিন হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয় উপস্থিত হন প্রমথনাথ। তাঁর সুযোগ্য ছাত্র পবিত্র সরকারের জবানবন্দি থেকে জানা যায় যে, প্রমথনাথকে দেখেই ওঁরা চেপে ধরেছিলেন এই দাবি জানিয়ে যে, সেদিন ক্লাস তাঁকে নিতেই হবে। রাজি হলেন প্রমথনাথ। স্পেশ্যাল পেপার ছোটোগল্প আর উপন্যাসের ক্লাস। ক্লাসে এসেই তিনি জানতে চাইলেন, ছাত্ররা ওয়াল্টার স্কট, ডিকেন্স, টলস্টয়, বালজাক, উগো, রিচার্ডসন প্রমুখের লেখা পড়েছে কি না। উত্তর এল, “না”। সঙ্গে সঙ্গেই প্রমথনাথ বললেন, “কিছুই তো পড়নি তোমরা, তবে আর তোমাদের কী ক্লাস নেব?” বলেই ক্লাস না নিয়েই চলে গেলেন প্র.ণা.বি। আরও একদিন ওই একই স্পেশাল পেপারের ক্লাসে মাস্টারমশাইকে ধরেবেঁধে নিয়ে এসেছে ছাত্ররা। এবারও প্রমথনাথ জিজ্ঞেস করলেন সেই একই প্রশ্ন। ততদিনে ছাত্ররা বিশ্ববন্দিত লেখকদের বেশ কিছু লেখা পড়ে নিয়েছে। সে কথা শুনেই প্রমথনাথ বললেন, “তোমরা তো সবই পড়েছ দেখছি, তবে আর কী ক্লাস নেব তোমাদের?” বলেই বেরিয়ে গেলেন রেজিস্টার খাতা হাতে!
সম্পাদক ও সাহিত্যিক হিসেবেও প্র.ণা.বি. ছিলেন অত্যন্ত সফল। এই ক্ষেত্রেও শান্তিনিকেতনই ধীরে ধীরে গড়ে তুলছিল প্রমথনাথকে। ছেলেবেলাতেই শিশু পত্রিকাটি প্রকাশে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরে বুধবার, শান্তিনিকেতন প্রভৃতি পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন প্রমথনাথ। তবে সম্পাদক হিসেবে একবার মহা বিপদে পড়েছিলেন তিনি। সেই বিপদে পড়ার গল্পটি লিখে গিয়েছেন শঙ্খ ঘোষ। ১৯৫৬ সালে তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাব্যবিতান নামে কবিতার একটি সংকলন প্রকাশ করেছিলেন প্রমথনাথ। কিছুদিন পরেই ছাত্র শঙ্খ ঘোষকে তিনি ডেকে পাঠালেন ওই সংকলন সংক্রান্ত একটি বিপদ থেকে তাঁকে উদ্ধার করবার জন্য। কী বিপদ? সংকলনটি প্রকাশের পরে তিন পাতার একটি চিঠি পেয়েছেন প্রমথনাথ। এক তরুণ কবি তাতে জানিয়েছেন যে, তাঁর অনুমতি না নিয়েই সংকলনটিতে তাঁর একটি কবিতা প্রকাশ করেছেন সংকলকরা। তাঁর কবিতা অনুমতি ছাড়া সংকলনে কেন ছাপা হয়েছে, তার কৈফিয়ত তলব করে সেই তরুণ কবি লিখেছেন যে, সদুত্তর না মিললে সংকলকেরা উকিলের চিঠি পাবেন। এই তরুণ কবিটি ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। নেহাতই মজা করবার জন্যই ওই হুমকি-চিঠিটি তিনি পাঠিয়েছিলেন। শঙ্খ ঘোষের মাধ্যমে এই কথা জেনে শেষমেশ দুশ্চিন্তা মুক্ত হয়েছিলেন প্রমথনাথ।
সাহিত্যিক হিসেবে প্রমথনাথ বিশীর অবদান বহুমাত্রিক। কবিতা, নাটক, উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, সমালোচনা— সাহিত্যের প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে হংসমিথুন, যুক্তবেণী, বসন্তসেনা ও অন্যান্য কবিতা উল্লেখযোগ্য। নাটকের ক্ষেত্রে ঘৃতং পিবেৎ, ঋণং কৃত্বা বিশেষ পরিচিত। উপন্যাসের মধ্যে কেরী সাহেবের মুন্সী, কোপবতী, পনেরোই আগস্ট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লিখেছিলেন একাধিক ছোটোগল্প ও সমালোচনা-পুস্তক।
তাঁর কথাসাহিত্যর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ইতিহাস ও সমাজ-সংলগ্নতা আর মানবমনের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ। তাঁর কথাসাহিত্যের বাস্তবতা নিছক সমাজের উপরিতলের বর্ণনাতেই থেমে থাকেনি; বরং মানবচরিত্রের জটিলতা ও সমাজের গভীর সংকটকে গভীরে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছে। একটি কথা এখানে বলা দরকার। উত্তরাধিকার সূত্রেই জমিদারির অনুষঙ্গ হিসেবে শরিকি বিবাদ, মামলা-মোকদ্দমা, পুলিশ-আদালত, এসবের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন প্রমথনাথ। পরে জো়ড়া দীঘির চৌধুরী পরিবার, চলনবিল, অশ্বত্থের অভিশাপ প্রভৃতি উপন্যাসে এসব অভিজ্ঞতার ছায়া পড়েছিল। তবে সব ছাপিয়ে সামগ্রিকভাবে তাঁর সাহিত্যকর্মে যে-রসটি প্রধান হয়ে উঠেছিল সেটি হাস্যরস। জীবনের শেষপর্বে প্র.ণা.বি নানা সম্মানে ভূষিত হন। এগুলির মধ্যে ছিল রবীন্দ্র পুরস্কার, বিদ্যাসাগর পুরস্কার, পদ্মশ্রী, জগত্তারিণী স্বর্ণপদক, আনন্দ পুরস্কার।
১৯৮৫ সালের ১০ মে প্রমথনাথ বিশী প্রয়াত হন।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর কৌতুকপ্রিয়তা অটুট ছিল। শেষ জীবনে তিনি গুরুতর অসুস্থ। তাঁকে দেখতে এসেছে এক চিকিৎসক। সেই চিকিৎসকের প্রস্থানের পর প্রমথনাথের সরস মন্তব্য, “বুকের ওপর হারমোনিয়াম বাজিয়ে চারশো টাকা নিয়ে চলে গেলেন”। এমনই ছিল তাঁর রসবোধ, স্বাভাবিক ও তীক্ষ্ণ। অবশ্য ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের হাত থেকে তিনি নিজেকেও রেহাই দিতেন না। না হলে কোনো লেখক নিজের নিকৃষ্ট গল্পের একটি সংকলন প্রকাশ করতে পারেন? নিজেকে নিকৃষ্ট গল্পের লেখক বলে চিহ্নিত করেছিলেন প্র.ণা.বি.। তাঁর প্রয়াণের চল্লিশ বছর পরে আজ প্রমাণ হয়ে গিয়েছে যে, তিনি আসলে ছিলেন উৎকৃষ্ট সাহিত্যের উৎকৃষ্ট লেখক।















