গৌতম রায়: বাংলা গানের মরমীয়া শিল্পী হিসেবে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের আসন, বাংলা গানের দুনিয়া যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন অম্লান থাকবে। প্রেম, কিছুটা বিষন্নতা মাখা প্রেম- এমন বাংলা গানের আইকন হয়ে রয়েছেন তিনি। গত শতাব্দীর পাঁচ-ছয়ের দশকে বাংলা গানে যে সোনার কাঁকন পড়া যুগ, সেই যুগে জগন্ময় মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, গৌরীকেদার ভট্টাচার্য, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, গায়ত্রী বসু, উৎপলা সেন, সুপ্রীতি ঘোষ - কাকে ছেড়ে কাকে বাদ দিই? 

 

কানন দেবী, শৈল দেবী, পঙ্কজ কুমার মল্লিক, কৃষ্ণচন্দ্র দে, সুপ্রভা সরকার-- তাঁদের যুগ তখনও কিন্তু শেষ হয়নি।অকালে চলে যাওয়া কুন্দনলাল সায়গল, আজকের মতই সেদিনও বাঙালির বিনোদনের দুনিয়ায়, প্রবাল দ্বীপে, সাতমহলা বাড়ি তোলার স্মৃতিতেই জাগরুক। নিউ থিয়েটার্সের ব্র্যান্ডের ছবির যুগ অতিক্রম করে, নিজের প্রযোজনা, 'শ্রীমতী পিকচার্সে'র ছবিতে কাননের গান তখনও লোকের মুখে মুখে ফেরে। 'রাইকমল', 'মহাপ্রস্থানের পথে'তে সুর করে, নতুন করে, একটা ভিন্ন ধারায় বাংলা ফিল্মি গান প্রতিষ্ঠিত করেছেন তখন পঙ্কজ মল্লিক। 

 

শিল্পীদের মধ্যে তখন ছিল একটা সত্যিকারের বন্ধুত্ব।পরস্পরের মধ্যে পেশাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। কে কার থেকে ভালও গাইতে পারেন, ভালও লিখতে পারেন, সুর করতে পারেন, মিউজিক অ্যারেঞ্জ করতে পারেন- এসব নিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা ছিল। মতান্তর হতো। কিন্তু কখনওই মনান্তর হতো না। এই পারস্পরিক সম্পর্কটা ছিল অনেকটাই আত্মীয়তার পর্যায়ে। আত্মীয়তার মধ্যেও যেমন একটু মিঠেকড়া সম্পর্ক কোনও কোনও সময়ে তৈরি হয়ে যায়, গান নিয়ে, সুরকার নিয়ে, গীতিকার নিয়ে তেমনটাও হতো।

 

রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে, সুচিত্রা সেনের লিপে, গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান সুপার ডুপার হিট। এই পর্ব জোরদার ভাবে শুরু হওয়ার আগে, রবীন চট্টোপাধ্যায়েরই সুরে, 'বাবলা' ছবিতে উৎপলা সেনের গাওয়া, 'দুখের কাছে হার মেনে তোর হৃদয় কভু হারবে না', খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে ফিল্মে উৎপলা আর তেমন একটা গান গাইবার সুযোগ পাননি। এটা নিয়ে উৎপলার মনে একটা চাপা ক্ষোভ ছিল। কিন্তু বিষয়টা উৎপলা - সন্ধ্যার মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্কে সেই ক্ষোভের আঁচ কখনও পড়েনি।

 

সন্ধ্যার একটু গলার সমস্যা হয়েছে। সন্ধ্যা এমনিতেই খুব খুঁতখুঁতে মানুষ ছিলেন। গলার জন্যে চট করে অ্যালোপ্যাথি ওসুধ খেতে চাইছন না। উনি জানতেন, প্রখ্যাত হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক ডাঃ ভোলানাথ চক্রবর্তী, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের বাল্য বন্ধু। সন্ধ্যা অনুরোধ করলেন উৎপলাকে, সতীনাথবাবুর ( সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় চিরদিন, সতীনাথবাবু বলতেন) মাধ্যমে ভোলাবাবুর একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দিতে। উৎপলা সেটা তক্ষুনি করে দিলেন। 

 

সতীনাথের হঠাৎ চলে যাওয়ার সময়ে সন্ধ্যা পা ভেঙে শয্যাশায়ী। ফোন করলেন তাঁর উৎপলাদিকে। আবার উৎপলার প্রয়াণের পর তাঁর শ্রাদ্ধবাসরে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন সন্ধ্যা, উৎপলার কড়েয়া রোডের সরকারী আবাসনে। আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এসেছিলেন। 

এইচএমভির প্রথম সারির অফিসার পবিত্র মিত্র।গীতিকারও তিনি। নানা কায়দা কানুন করিয়ে তিনি তাঁর গান ছাড়া শিল্পীরা অন্য কারও গান এইচএমভিতে রেকর্ড করতে পারবেন না বলে ফর্মান জারি করালেন কোম্পানির বড় কর্তাদের দিয়ে। বেঁকে বসলেন অনেক প্রথম সারির শিল্পীই। 

 

গীতশ্রী সন্ধ্যা তো সেই বছর শারদে এইচএমভি থেকে রেকর্ডই করলেন না। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা সন্ধ্যা, পুজোতে এইচএমভি থেকে রেকর্ড না করা মানে কোম্পানি বেশ বড় রকমের আর্থিক ক্ষতি। প্রমাদ গুণলেন এইচএমভির বড় কর্তারা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যদের যেমন শিল্পীমহলে একটা অভিভাবক সুলভ গ্রহণযোগ্যতা ছিল, সেটা সতীনাথেরও ছিল। মান্না দে সাধারণত গানের বাইরে কোনও কিছুর সঙ্গেই নিজেকে জড়াতেন না। পবিত্র মিত্রকে ঘিরে সঙ্কট।একঝাঁক শিল্পীর এইচএমভিতে বেসিক রেকর্ড না করার যখন এমন সিদ্ধান্ত, তখন এইচএমভিই অনুরোধ করল সতীনাথবাবুকে মধ্যস্থতার। 

 

পবিত্র মিত্রের সঙ্গে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়েরও যথেষ্ট বন্ধুত্ব ছিল। রবীন মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যার বড়দা, শিল্পীর বিবাহের আগে পর্যন্ত যিনি সন্ধ্যার গানজনিত সিদ্ধান্তের শেষ কথা ছিলেন। তাঁর সঙ্গেও সতীনাথবাবুর খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। ফলে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের মধ্যস্থতায় সমস্যা মিটে গেল।