অয়ন হালদার: সেলিম মন্ডল তাঁর আত্মকথা ‘নীল কুয়াশার জোছনা’ শীর্ষক গ্রন্থে সহজিয়া গেরস্থালির আটপৌরে কাহিনী পাঠকের সামনে বেআব্রু করেছেন। তাঁর এই গ্রন্থ আখেরে নিজের জীবন খুঁড়ে তুলে আনা পারিবারিক এবং সামাজিক পরিসরে হরেক সম্পর্কের পারস্পরিক সংলগ্নতার এক মফসসলি চালচিত্র।
‘মায়াবাড়ি, মায়াঘর’ এবং ‘হইদেখা পরদেখা’ অংশে গ্রন্থটিকে দুটি ভাগে তিনি বিভক্ত করেছেন। প্রথম অংশটি তাঁর ঘরোয়া জীবনের মরমী বয়ান এবং দ্বিতীয়টি বাইরের সাথে তাঁর নিবিড় যোগাযোগের আলেখ্য। ঘর এবং বাইরের সঙ্গে কাঠামোগত ভেদ রাখলেও তাঁর ব্যক্তিগত আখ্যানে ঘর এবং বাইরের মধ্যে এক গভীর অন্তরঙ্গতা রয়েছে।
লেখকের একাধিকবার ঠাঁইবদল, ঘর সম্পর্কে একমাত্রিক ধারণায় একটি বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে। আদতে ঘর যে এক মানসিক অবস্থান, পরিসরের সঙ্গে দেহ-মনের এক অচ্ছেদ্য বন্ধন -- তা তাঁর এই স্মৃতিলেখর প্রথম অংশের মূল উপজীব্য।
তাই যাপিত জীবনের অঢেল টুকরো স্মৃতি-কোলাজে ঘর ও বাইরের মাঝে জলচল লক্ষ্য করা যায়। ‘ঠিকানা বদল হয় না’ অংশে লেখেন “…আমার একটাই ঠিকানা। জলঙ্গীপাড়। মানুষের ঠিকানা বদল হয় না। বদলায় শুধু প্রকৃতি।” দ্বিতীয় পর্বের দরজা শেষক অংশের সেলিম মন্ডল লেখেন– “বাড়ি এক মায়াবীজ। মনের নানা শিকড় বাকর এতটা ছড়িয়ে থাকে সহজেই তা ছেঁড়া যায় না। … আমাদের সমস্ত বাড়ি আসলে এক দরজা। বেরোলেও তার আগে প্রবেশ করতে হয়।”
বাসাবদল’-এ লেখেন, “আমি নিজেই কতবার যে এই বাসাবদলের অংশ। এক বাসা থেকে আরেক বাসার মায়া বয়ে নিয়ে যেতে হয়। সেই বাসার দেওয়াল, ছাদ, জনপদ সব মনের ভিতর জাপটে থাকে। মনখারাপ হয়। এই মনখারাপ জীবনের আরেক সৌন্দর্য।” প্রতিবার বাসা বদলের মুহুর্তে সেলিমের পাখিদের কথা মনে পড়ে। তাঁর চোখে মানুষ পরিযায়ী পাখি। তবে তাঁর বাসা বদলে গেলেও জলঙ্গীপাড়ের আস্তানার কোনও বদল হয় না। নদীর কিনার তাঁর নিজস্ব মোকাম। বহতা নদী আর পাখির উড়ালের কথা সেলিম মণ্ডলের গ্রন্থে ফিরে ফিরে আসে।
সেলিমের নির্ভার, সুখপাঠ্য গদ্যের গড়নে এক সজল প্রবহমানতা রয়েছে। তবে লেখকের বসতজীবনের মতনই কেন্দ্র-হীন লৈখিক ভাষ্যে ভাবনার রসদ রয়েছে ভরপুর। ফলে তাঁর গদ্য যেমন পাঠককে আচ্ছন্ন করে, তেমন প্রায়শঃ অস্বস্তিতেও ফেলে।
সেলিম মন্ডলের অসামান্য গদ্যে স্থানিক ভাবনার সঙ্গে জুড়ে আছে কালের চেতনা। অতীত এবং বর্তমান ,একে অন্যের মধ্যে অনায়াসে প্রবেশ করে। তিনি তাঁর ভাবনাপ্রবাহকে কালপর্বে ভাগ করতে আগ্রহী নন। তাই স্মৃতির ভেতরে, তাঁর বর্তমান বেমালুম সেঁধিয়ে যায়। আর সাম্প্রতিকের ভাঁজে স্মৃতির আর্তিকে তিনি সযত্নে আগলে রাখেন। তাঁর আত্মগত ভাবনায় সমাজ-নিষ্ঠ অন্তর্দৃষ্টি রয়েছে।
আবার এক গভীর নির্লিপ্তির মাধ্যমে প্রাত্যহিকতার বর্ণনা, নিরন্তর বিমূর্ততার ভাবনায় পর্যবসিত হয়েছে। লেখক-মন, যেমন সমাজ-লগ্নতাকে অস্বীকার করতে পারেনি।তেমনই বাস্তবতার ঘেরাটোপ, গদ্যকারকে কেবল আখ্যানের নির্দিষ্ট কোনও রৈখিকতায় বিশ্বাসী রাখেনি। সামগ্রিকভাবে ‘নীল কুয়াশার জোছনা’ বিশ শতকের শেষ ও এ শতকের গোড়ায় যথাক্রমে শৈশব-কৈশোর অতিক্রম করা এক ভাঙাচোরা আমির ক্যালাইডোস্কপিক স্বগতকথন।
মধ্যবিত্ত জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেবনিকেশ নয়, বরং অন্তর্মুখিনতায় ঋদ্ধ এক তদ্গত, জৈবনিক অন্বেষণ। লেখক সেলিম তাঁর গ্রন্থের ঘর-পর্বে দিনগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে উদ্ভিদের ওতপ্রোত সম্পর্কের কথা বারবার উল্লেখ করেছেন। তাঁর গদ্যে পাঠক আপাতভাবে বিষণ্ণতার খোঁজ পেলেও, উদ্ভিদের সঙ্গে এই মিথোজৈবিক সহাবস্থান, এক সপ্রাণ অস্তিত্বের প্রতি তাঁর উন্মুখতার কথা জানান দেয়।
এক ক্ষয়িষ্ণু সময়ে তাঁর আস্তিত্বিক আকাঙ্খার সঙ্গে তিনি উদ্ভিদের শরীরকে এক অসামান্য তরিকায় যুক্ত করেছেন। তাঁর এই অসামান্য গ্রন্থের ‘অর্ধজীবন’ শীর্ষক অংশে প্রকৃতি-চৈতন্যের সন্ধান পাওয়া যায়—“আজ আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম—গাছ হলে আমি কী করতাম? উত্তর দিতে পারিনি। কারণ, আমার কোনো লতা নেই, শিকড় নেই। পাতার মতো অর্ধজীবন আমার। কখন চকচক করবে, কখন ক্ষয় ধরবে জানি না। তবুও এই বৃষ্টির দিনে গাছের দিকে তাকালে মনে হয়, গাছ হতে পারিনি তো কী, তার ছায়ার ভিতর দাঁড়িয়ে যদি পোকার সমস্ত ক্ষয় আলতো করে বুকে বুলিয়ে নিতে পারি, একদিন শিকড়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব হবে।“
‘গাছ-সংসার’ শীর্ষক অংশে তিনি লেখেন—“সংসার ছায়া ভালোবাসে। সংসারে গাছ না জন্মালে, সংসারে ফল আসে না।“ ‘গাছেদের বিবাহ’ শীর্ষক অংশে সেলিম লেখেন—“গাছ আমার ছেলেবেলার বন্ধু। যেমন নদী। গাছেদের যত নিকটে এসেছি বুঝেছি তার আত্মার রং হৃদয়ে লাগলে মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়। একটা বসন্ত আসে। এই বসন্তে একজন বাউল দোতারা বাজায়।“ এই তিনটি অংশ ছাড়া তাঁর ‘নীল কুয়াশার জোছনা’-র প্রথম পর্ব ‘মায়াবাড়ি, মায়াঘর’-এর মোট উনিশটি অংশের মধ্যে গাছের উল্লেখ পাওয়া যায় যে যে ক্ষেত্রে, সে’গুলি হল—'বাগান কথা’, ‘নিঃসঙ্গ টব’, ‘জাগের পাট, সাধের পাট’, ‘ভালোবাসলে গাছে নাম লেখা লাগে!’ এবং ‘অপেক্ষা’। যে জীবন তিনি অতিবাহিত করেছেন, তার সামান্যটুকুকেও তিনি, তাঁর গদ্যে স্থান দিয়েছেন। তাঁর ব্যক্তিগত গ্রন্থ কখনও ব্যাধির কথা বলে। কখনও প্রতিবেশের অসহায়তা, ব্যর্থতার চিহ্নগুলিকে নির্মোহ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে। আবার কখনও ক্ষয়ের পাশে রেখে দেয় নিরাময়ের অযুত সম্ভাবনাকে।
এই কারণে তাঁর আখ্যান বহুমুখী। ঘরের কথা বলতে গিয়ে সেলিম প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রসঙ্গ আনেন। ধার্মিকতার সঙ্গে নিজের মানসিক বিযুক্তিকে মেনে নিয়ে উৎসবের আনন্দের সঙ্গে লেখক নিজের সম্পৃক্তিকে স্বীকার করেন। অনাড়ম্বর উদযাপনে যে সারল্য লেগে থাকে, শৈশবের সেলিম সেই আনন্দের মুখাপেক্ষী। সময়ের স্রোতে সেই উচ্ছ্বাসে ভাঁটা পড়েছে বলে জানা যায়। তাঁর নাস্তিক অনুভবে তিনি লেখেন– “ধর্ম আসলে মানুষের ভিতরের কোন সৌখিন প্রয়োজনীয়তা।” ‘
'ইদ’ শীর্ষক অংশে সেলিম লেখেন– “ভাবি ইদ কি পুজোকে বলে-কয়ে আসে? একই আকার! একই গড়ন!” হিংস-দীর্ণ এই অসময়ে এমন এক সমন্বয়ী ভাবনা আমাদের পারস্পরিক প্রীতির আবহমান ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবার পাঠ শেখায়।
‘নীল কুয়াশার জোছনা’-এর দ্বিতীয় অংশে লেখক ঘরের বাইরে পা রেখে তাঁর রসদ সন্ধান করেছেন। ‘হইদেখা পরদেখা’ অংশটি মোট কুড়িটি ভাগে বিভক্ত। বিভিন্ন সময়ে নানান ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা, আলাপের বর্ণময় কাহিনী তাঁর স্বকীয় লিখন-শৈলীতে ব্যক্ত করেছেন। এই অংশে পুঁজি-নিয়ন্ত্রিত সমাজে প্রান্তিকতার প্রতিনিধিত্ব চোখে পড়ে।
লেখকের সমমর্মী আখ্যানে দরিদ্র ক্ষৌরকার, সবজি বিক্রেতা, নির্মাণকর্মী প্রমুখের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁদের সাহচর্য তাঁর সমাজবীক্ষাকে শাণিত করে। ‘বোধ’ শীর্ষক অংশে সেলিম মন্ডল লেখেন—“জীবনের কোনো কিছুই ফেলে দিতে নেই। যেটুকু পাওয়া যায় তাই-ই সঞ্চয়। জীবনসায়াহ্নে এই সঞ্চয়টুকুই থাকে।“
পেশায় নির্মাণকর্মী এক ব্যক্তির সঙ্গে আলাপের প্রসঙ্গে ‘অঙ্ক-স্যার’ শীর্ষক অংশে লেখেন—“ওই রাজমিস্ত্রীর কথাগুলো বড্ড বুকে বাজে। অর্থনীতির বাইরে মানুষের যে সফলতার গল্প থাকে, সেদিন যেন তার পাঠ পেয়েছিলাম।“ ধনতান্ত্রিক সমাজকাঠামোয় লেখক বিকল্পের কথা বলেন। শ্রেণী সংক্রান্ত ভিন্ন ভাবনার দিকে পাঠকের নজর ঘোরান। ‘পুরুষ-মা’ অংশটি পিতৃতন্ত্রের নিগড়ে বাঁধা সমাজে লেখকের লিঙ্গ-ভাবনার পরিচয় বহন করে।
পুরুষের হৃদয়ে মাতৃত্বের খোঁজ শুধুমাত্র স্নেহের লক্ষণকে চিহ্নিত করা নয়, প্রকৃতপ্রস্তাবে সমাজ-নির্দিষ্ট ঘেরাটোপের বাইরে পথ হাঁটা, কর্তৃত্ববাদের মোকাবিলা করা। প্রতিস্পর্ধা-নির্ভর আখ্যান লেখকের এক রাজনৈতিক বয়ান হয়ে ওঠে, যখন তিনি লেখেন—“প্রতিটা পুরুষের মধ্যে একজন মা থাকে। যে মা সন্তানের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে চুলের পাক ধরায়। আর জীবনের কাশফুলের পথ চলার সৌন্দর্যকে বিকশিত করে।“
সেলিম মন্ডলের ভাবনায় পৌরুষ সমাজ-নির্দিষ্ট থাকবন্দীতে আবদ্ধ নয়। বরং অনেকটা খোলামেলা, যে পরিসরে পেলবতার বাতাস খেলে নিরন্তর। ‘ভালোবাসার মেরু’ অংশে লেখা অটিজমে আক্রান্ত এক কিশোরীর সঙ্গে তার সখ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন কন্যাটির প্রতি সংবেদনশীল লেখকের গভীর মমত্ব তাঁর অনুভূতিপ্রবণতার কথা জানান দেয়। কিশোরীর মানসিক প্রতিবন্ধকতা একটি লেন্স , যার মধ্য দিয়ে লেখক সেলিম মন্ডল অপার স্নেহে মানবিক সম্পর্কের হরেক রঙের বিচ্ছুরণকে দেখেছেন।
নীল কুয়াশার জোছনা
সেলিম মন্ডল
হ্যালো বুকস
২৫০ টাকা















