স্বর্ণালী হাজরা: পত্রিকার বাজার কেমন চলছে? বাজার কথাটা শুনেই নাক সিঁটকোলেন তো? আরে মশাই পণ্য কি কেবল শাক সবজি, চাল ডাল, মসলাপাতি হয় নাকি? আজকাল রাস্তায় বেরিয়ে পেপার স্টল বা বইয়ের দোকানের সামনে যেতে প্রায়শই শুনতে হয় "বাজার একদম ভালো না।" কীসের বাজার আর কেমন করে তা ভালো না, তা জানা নেই। আমি একজন সাধারণ শ্রোতা মাত্র। শুনে যাই ভিন্ন ভিন্ন মানুষের জীবনের ভিন্ন ভিন্ন গল্পকথা। এত সহজে এটাকে গল্প বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় কিনা, তা যদিও আমার জানা নেই। আসলে পথে ঘাটে বেরিয়ে ট্রেন, ট্রাম, বাস, অটো সবেতেই মানুষের জীবনের কাহিনি শোনাটা বহুদিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আগে সেই অভ্যাস পাড়ার মুদি দোকান, সবজির দোকান এবং চলার পথে ট্রাম, বাস, ট্রেন, অটোতে সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে একটি পত্রিকা প্রকাশনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় গত তিন - সাড়ে তিন বছরে গল্প শোনার পরিধি খানিক বৃদ্ধি পেয়েছে। এবং সেখানেই জানতে পারছি যা বিক্রি হয় তাই পণ্য এবং প্রতিটা পণ্যের একটা বাজারদর আছে।

 আমি একটি বাংলা মাসিক পত্রিকা প্রকাশনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পত্রিকাটি মাসিক পত্রিকা হওয়ায় প্রতিমাসেই ছুটে যেতে হয় সেই সকল মানুষগুলোর কাছে, যারা তাদের বিছানো সংসারে আমাদের পত্রিকাকেও স্থান দিয়েছে। অর্থাৎ বিভিন্ন পেপার ও ম্যাগাজিন স্টল গুলোতে। স্বভাব মতোই তাদের সাথে দেখা হলে প্রথম প্রশ্ন করি, 'কেমন আছেন? কাজ-বাজ কেমন চলছে?' প্রথমেই যা শুনতে পাই তা হল, 'আজকাল মানুষ ছাপার অক্ষর পড়া ছেড়ে দিয়েছে।' তারপরই বলে, 'বিক্রি বাট্টা একদম মন্দা'। এরপর বলে, 'মানুষ পত্রিকা হাতে নিয়ে রেখে দেয়, দামের জন্য কিনতে চায় না।' এরই মাঝে বলে রাখি লকডাউনের পর সব স্টেশন থেকে রেলওয়ে বুকস্টল গুলো তুলে দেওয়া হয়েছে, ফলে যেটুকু ভাঙাচোরা জায়গায় তারা অল্পবিস্তর জিনিস নিয়ে বসছে তাতে পেপার ও পত্রিকার বিক্রি কম বলে সেখানে রুমাল, ছাতা, পেন, মোজা, লজেন্স এসব সাজিয়ে রেখেছে। বক্তব্য, 'খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে হবে তো, রোজগার না হলে তা হবে কীভাবে? পত্রিকা আর পেপার আজকাল কেউ পড়ে না সব মানুষ মোবাইলে ব্যস্ত।'

 তাদের এই কথাগুলো শোনার পরে আরেকটি ভয় মনের গভীরে ধাক্কা দেয়। যখন এই ভাঙাচোরা ছোট্ট জায়গাতেও তাদের স্থান থাকবে না, তখন পত্রিকাগুলো কোথায় স্থান পাবে?

 বাজার তো শুনলাম, এবার একটু পত্রিকা দপ্তরের অন্দরমহলে উঁকি দেওয়া যাক। পত্রিকার বাজারে (ওই যে শুরুতেই বললাম, পত্রিকা একটি পণ্য যা বিক্রি হয় এবং তা নিজস্ব বাজারে পাওয়া যায়) পত্রিকার রকমফের আছে। মানুষের যেমন উচ্চ, মধ্য ও নিম্নবিত্ত আছে, পত্রিকারও তেমন শ্রেণিবিভাগ আছে। লিটিল ম্যাগাজিন, শুনতে ছোট হলেও মোটেও ছোট নয়। সাহিত্যের বেশিরভাগ রসদ এখানেই থাকে। তবে তাদের বাজারদর কেমন? এটা একদম ভুলভাল প্রশ্ন। বাজারদর আবার কী মশাই? লোকে জানে লিটিল ম্যাগাজিন পয়সা দিয়ে কিনে পড়তে নেই। সাধারণ মানুষ তো নয়ই এমনকী যারা তাতে লেখা দেয়, মনোবাসনা রাখে তাদের নামটি ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হোক, (এই ধরনের পত্রিকায় যে মূলত কোনও লাভ নেই বরং সাহিত্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসায় বিজ্ঞাপন না পেয়েও মানুষ গাঁটের কড়ি খরচা করে নেশাগ্রস্থের মতো বছরের পর বছর নিজেকে নিঃস্ব করে সাহিত্য সাধনা করে চলে, এটা জানার পরেও) তাদের প্রথম প্রশ্ন সৌজন্য কপি পাওয়া যাবে তো? তাদের একটাই উদ্দেশ্য, তাদের লেখা অংশটি ছবি তুলে facebook, instagram এ পোস্ট করা। মূলত মানুষকে দেখানো।

 এবার প্রশ্ন আসতে পারে, বাণিজ্যিক পত্রিকার জগতে যারা এখন খুব প্রতিষ্ঠিত নাম, তারা কি তবে খুব স্টেবল জায়গায় আছে? যদি পেপার ও ম্যাগাজিন স্টলের কথা আপনাদের মাঝে তুলে ধরি তবে বলব, না। খুব ব্যস্ততম এক প্ল্যাটফর্মের পেপারের দাদাকে জিজ্ঞাসা করায় সে বলল, যে পত্রিকা মাসে ১০০ টি বিক্রি হত, এখন সেটি দশটি বিক্রি করতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রশ্ন আসতেই পারে, 'তবে সেই পত্রিকাগুলো চলছে কীভাবে?' এক সময় তৈরি হওয়া নামের ভিত্তিতে এই পত্রিকাগুলো বর্তমানে যে বিজ্ঞাপন গুলো নিয়মিত পেয়ে চলেছে তাতে লাভের অংক আকাশ ছোঁয়া না হলেও ক্ষতির সম্ভাবনা তেমন থাকছে না। তাই হয়তো তারা এখনও টিকে রয়েছে। 

 এবার আসা যাক আমাদের মতো পত্রিকার কথায় অর্থাৎ যে পত্রিকা গুলো না লিটল ম্যাগাজিন না পুরোপুরি বাণিজ্যিক পত্রিকার আকার ধারণ করতে পেরেছে। সেই মধ্যবিত্ত মানুষজন, যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, তবুও মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্ট তাদের ছেড়ে যায় না। তাদের মনে হয় পত্রিকাটি তাদের কাছে সন্তান এবং মা বাবা যতই গরিব হোক সন্তানকে তারা বিসর্জন দিতে পারে না।

 এবার প্রশ্ন হল পয়সা না থাকলে বাচ্চাকে খাওয়াবে কী করে? অর্থাৎ পয়সা না থাকলে প্রতিমাসের পত্রিকা ছাপা হবে কীভাবে? শুধু তো ছাপার দিক নয়, লেখা না থাকলে ছাপবে কী? এই ধরনের পত্রিকার মূল সমস্যা হল, মানুষ জানে এই পত্রিকা খুব নাম না করলেও যেহেতু বাণিজ্যিক ঘেঁষা পত্রিকা তাই সাম্মানিক ও সৌজন্য কপি দেওয়া বাধ্যতামূলক। এদিকে পত্রিকা ছাপতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া পত্রিকা দপ্তর হাত তুলে দিল বিশেষ সংখ্যায় সামান্য সাম্মানিক ও সৌজন্য কপি এবং বাকি সংখ্যাগুলোতে কেবল সৌজন্য কপি দিতে পারবে। কিছু লেখক সেই শর্তে রাজি হয়ে লেখা পাঠান, কিছু পাঠাতে অস্বীকার করেন। দোষ কারোরই নয়। এমন বহু লেখক আছেন যাদের লেখাই একমাত্র রুটি রুজি। তাদের মূলত কিছু করার থাকে না, অগত্যা এভাবেই চলতে থাকে পত্রিকা, মূলত গাঁটের কড়ি খরচ করে চলতে থাকে সাহিত্য সাধনা। যদিও এটা কোনও সমস্যার সমাধান হল না। 

 প্রকাশকের ভূমিকা ভালো লেখা পাঠককে উপহার দেওয়া। এই ধরনের আধা বাণিজ্যিক পত্রিকার ব্যাপ্তি বেশি না থাকায় বিজ্ঞাপন জোটার সম্ভাবনা কম থাকে। তাই মূলত পত্রিকা বিক্রির উপর নির্ভর করে সম্পূর্ণ টিকে থাকা। অপরদিকে পত্রিকার ডিস্ট্রিবিউটর পত্রিকা বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দিতে নির্দিষ্ট ছাড় বাদে চেয়ে বসে একটা মোটা টাকার অংক। শুধু তাই নয় পত্রিকা তাদের কাছে পৌঁছানোর পর বহুবার ঘুরেও হিসেব মেলে না পত্রিকা ও টাকার অংকের। ফলে মাঝারি মাপের পত্রিকার ডিস্ট্রিবিউশনের জায়গাতেও রয়েছে এক বিশাল গ্যাপ। এই গ্যাপ মেটাতে যদিও ইতমধ্যে বেশকিছু পত্রিকা ওয়েট পোর্টালে মানুষকে খুব কম খরচে সাহিত্য সাধনায় উৎসাহিত ও সাহায্য করছে। কিন্তু প্রশ্ন হল দিনরাত কম্পিউটারে বা মোবাইলে চোখ রেখে সেই গল্প, উপন্যাস, কবিতা বা অন্যান্য লেখা সত্যিই কি মানুষ অত সহজে পাতা উলটান, যত সহজে ছাপার কাগজের পাতা উলটে দেখেন?

 তবে কি পত্রিকার বাজার (আবার সেই বাজার) বন্ধ হতে চলেছে? এর উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে। তবে এটুকু বলতে পারি পত্রিকা কেবল প্রকাশকের একার দায়িত্বে চলবে না। এগিয়ে আসতে হবে গোটা লেখক ও পাঠক মহলকেও। প্রশ্ন আসতে পারে, কীভাবে? 

 প্রকাশক যেমন বেছে বেছে ভালো লেখাগুলো পাঠকের দরবারে উপস্থিত করতে চাইছে, লেখক যদি নিজের সৌজন্য কপি পেয়ে তার লেখা অংশটি সাথে সাথে ফেসবুক বা instagram এ পোস্ট না করে, নিজের পাঠক মহলকে সেই লেখা সম্পর্কে একটু অবগত করান, তবে উৎসাহিত পাঠককূল পত্রিকাটির কিছু সংখ্যা সংগ্রহ করতে পারে। ফলে পত্রিকাটির বিক্রির সংখ্যা খানিক বাড়বে। যার উপর মূলত এই ধরনের পত্রিকাগুলোর অস্তিত্ব নির্ভর করছে।

 ফলত প্রকাশক, লেখক ও পাঠকের সহাবস্থানে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব আমাদের প্রিয় বাংলা পত্রিকার জগত। নতুবা একটা সময় পর অচিরেই তা কালের গহ্বরে বিলীন হবে এবং মানুষের মধ্যে সেই লেখার কোনও ছাপ থাকবে না। ফেসবুক ও ইন্সটার স্ক্রল বাটানে স্থান পাবে কবি, সাহিত্যিক ও অন্যান্য লেখকের লেখাগুলো।