অয়ন মুখোপাধ্যায়
আধুনিক ফুটবল আজ আর কোনো স্বতঃস্ফূর্ত খেলা নয়; আজকের ফুটবল চরম বস্তুবাদী, সংখ্যা-তাড়িত জ্যামিতি। মাঠের প্রতিটি ইঞ্চি মাপা হয় ডেটায়, স্ট্রাইকারের দৌড় ভাঙা হয় অ্যালগরিদমে, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিভা বন্দি হয় ‘এক্সপেক্টেড গোল’-এর শীতল দশমিকে। একজন ফুটবলার এখন আর শুধু মানুষ নন; তিনি স্প্রিন্ট-ডেটা, হিটম্যাপ, পাস-শতাংশ, ক্লান্তির সূচক এবং বাজারমূল্যের এক চলমান হিসাবখাতা। তাই ফুটবল থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে তার সবচেয়ে মানবিক সম্পদটাই—অনিশ্চয়তা।
এই যান্ত্রিক উপত্যকায়, রোম্যান্টিসিজমের শেষ চিতাভস্মের ভেতর থেকে উঠে এলেন কেপ ভার্দের চল্লিশ বছর বয়সি গোলরক্ষক ভোজিনহা—জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস। পেশাদার ফুটবলে প্রতিষ্ঠার আগে জীবিকার তাগিদে যাঁকে করতে হয়েছিল ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ, বাসের ড্রাইভারিও করতে হয়েছিল। সেই অন্যের ঘরে আলো জ্বালানো মানুষটি যে একদিন বিশ্বকাপের আলোয় দাঁড়াবেন, নিজেও কোনো দিন ভেবেছিলেন কি না, কে জানে—কিন্তু জীবন মাঝেমাঝে সাহিত্যের চেয়েও নির্লজ্জ রোম্যান্টিক হয়ে যায়। এখানেও ঠিক সেই ঘটনাটাই ঘটেছে ভোজিনহার জীবনে।
ফুটবলে গোলরক্ষকের জীবন এমনিতেই এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গ। কারণ অন্য দশজনের ভুল শেষপর্যন্ত এসে জমা হয় তার সামনে, অথচ তার একটি ভুলই খেলার সময় হয়ে ওঠে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, দর্শকের কাছে ক্ষমাহীন অপরাধ। সামনে খেলা, পেছনে শূন্যতা; তাঁর কাজ মূলত এমন একটি বিপর্যয়ের জন্য অপেক্ষা করা, যা এখনও ঘটেনি। আলবেয়ার কামু নিজেও একসময় গোলরক্ষক ছিলেন। ফুটবল ও নৈতিকতা সম্পর্কে তাঁর নামে বহুল প্রচলিত উক্তিটির নির্ভুল উৎস নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু কথাগুলো অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। তিনি বলেছিলেন, “নৈতিকতা আর দায়িত্ব সম্পর্কে আমি যা কিছু নিশ্চিতভাবে জানি, তা আমি শিখেছি ফুটবল থেকে।” বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে ভোজিনহা যেন কামুর সেই আপ্তবাক্যকেই এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেলেন।
২০২৬-এর বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে, এখনকার ফুটবল যেনো বড্ড বেশি যান্ত্রিক হয়ে গেছে। আজকের এই আধুনিক যান্ত্রিক ফুটবল আসলে অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’র যক্ষপুরী। সেখানে ফুটবলারদের নাম, মুখ, ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে ‘৪৫ক’ বা ‘৬৯ঙ’-এর মতো সংখ্যায় নামিয়ে আনা হচ্ছে; এখানেও ফুটবলারকে ভেঙে ফেলা হয় ডেটার অসংখ্য ঘরে। যক্ষপুরীর রাজা নন্দিনীকে বলেছিল, “আমি যা-কিছু পাই সমস্তকেই এক-একটা টুকরো করে তার রহস্য দেখতে চাই।” আধুনিক পারফরম্যান্স ল্যাবরেটরিও মানুষের পেশি, ক্লান্তি, প্রতিভা, এমনকি সাহসকেও টুকরো টুকরো করে তার রহস্য মাপতে চায়।
কিন্তু মানুষের রহস্য কি সত্যিই টুকরো করে মাপা যায়?
ভোজিনহা সেই প্রশ্নেরই এক চল্লিশ বছর বয়সি প্রতিস্পর্ধী উত্তর। তিনি সংখ্যা হতে অস্বীকার করেন। মকররাজের জালের সামনে তিনি যেন নন্দিনীর মতোই প্রাণের অবাধ্যতা। তাঁর শরীরের বয়স আছে, বাজারমূল্য আছে, সীমাবদ্ধতা আছে; কিন্তু ডেটার কোনো ঘরেই তাঁর নাম লেখা নেই, এখানেই সেই প্রশ্নটা এসে দাঁড়ায়, একজন মানুষ ঠিক কতক্ষণ অসম্ভবের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
একদিকে বিশ্বফুটবলের সাম্রাজ্য, অন্যদিকে আটলান্টিকের বুকে পাঁচ লক্ষ মানুষের ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। তাঁদের দল গড়ে ওঠে দেশীয় প্রতিভা ও পৃথিবীময় ছড়িয়ে থাকা কেপ ভার্দের বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের নিয়ে। এমনকি ডিফেন্ডার রবার্তো ‘পিকো’ লোপেসের জাতীয় দলে আসার গল্পে ঢুকে পড়ে LinkedIn। যে কর্পোরেট প্ল্যাটফর্মে মানুষ চাকরি খোঁজে, তাঁর ইনবক্সও কখনও কখনও ইতিহাসের দরজা খুলে দেয়—আর এখানেই আমাদের মনে হয়, সভ্যতার রসবোধ বোধ হয় এখনও মরে যায়নি।
কেপ ভার্দে গ্রুপপর্বে একটি ম্যাচও জেতেনি: স্পেনের সঙ্গে ০-০, উরুগুয়ের সঙ্গে ২-২, সৌদি আরবের সঙ্গে ০-০; তবু তিন ড্র নিয়ে রাউন্ড অফ ৩২। এইখানেই তাঁদের গল্পটি ফুটবলের বাইরে চলে যায়। আধুনিক পৃথিবী আমাদের শিখিয়েছে সাফল্য মানেই জয়, প্রথম হওয়া, দৃশ্যমানতা। অথচ কখনও কখনও ইতিহাসে প্রবেশ করা যায় জয় ছাড়াও। শুধু টিকে থেকে। শুধু প্রতিপক্ষ কে জানিয়ে দিয়ে—তুমি আমাকে এখনও শেষ করতে পারোনি।
তারপর আর্জেন্টিনা। একদিকে লিওনেল মেসি—যিনি তাঁর প্রতিভা দিয়ে সময়কে নিয়ন্ত্রণ করেন; অন্যদিকে ভোজিনহা—যিনি সময়কে শরীর দিয়ে আটকান। ম্যাচ গড়ায় ১২০ মিনিটে। কেপ ভার্দে দু’বার ফিরে আসে, শেষপর্যন্ত ৩-২ হার। স্কোরবোর্ড ফলাফল জানে; মহত্ত্ব মাপতে পারে না।
ম্যাচের পরে মেসি ভোজিনহাকে আলিঙ্গন করেন। সেই মুহূর্তটি ছোট, প্রায় নিঃশব্দ। সেখানে বিজয়ী ও পরাজিতের পরিচয় কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঝাপসা হয়ে যায়। একজন শিল্পী আরেক জনের দিকে তাকিয়ে শুধু বুঝতে পারেন—আজ তুমি আমাকে সহজে ছাড়োনি।
ভোজিনহা তাই শুধু গোলরক্ষক নন; তিনি যন্ত্রসভ্যতার বিরুদ্ধে মানুষের প্রাচীন স্বাক্ষর। চল্লিশ বছরের একটি শরীর পৃথিবীর সেরা আক্রমণকারীদের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারে—আরও একবার চেষ্টা করো। এই ‘আরও একবার’ই সম্ভবত মানুষের সভ্যতার সবচেয়ে পুরোনো চ্যালেঞ্জ অথবা পুরোনো প্রার্থনা।
সিসিফাস পাথর তোলে, পাথর গড়িয়ে পড়ে, সে আবার তোলে। কামুর কাছে এই পুনরাবৃত্তিই আসলে বিদ্রোহ—পরাজয় নিশ্চিত জেনেও এখানে গোলরক্ষক ভোজিনহা যেন আমাদের সেই সিসিফাস'এর বোঝাটা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন। আর্জেন্টিনার মুহুর্মুহু আক্রমণের কাছে হেরে যাওয়াটা খুব স্বাভাবিক; তবু সে পোস্ট ছেড়ে যাবে না। ভোজিনহা সেই অর্থে ফুটবলের সিসিফাস, শুধু তাঁর পাথরটা গোলাকার চামড়ার।
আর এই আবহের ভেতর তিনি আমাদের সামনে কয়েকটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। বয়স কি সত্যিই নিয়তি? পরাজয় কি সত্যিই ব্যর্থতা? মানুষ কি কেবল তার সামাজিক অবস্থান, পেশা ও বাজারমূল্যের সমষ্টি? তাঁর উত্তর কোনো দর্শন বই এ নেই। আছে একটি ডাইভে, একটি চল্লিশ বছর বয়সি শরীরের অসম্ভব জেদের ভেতর।
তাহলে আমরা কি বুঝব, মানুষের সমস্ত মহত্ত্বই শেষপর্যন্ত কয়েকটি অতিরিক্ত সেকেন্ডের ইতিহাস—মৃত্যুর আগে জীবন, পরাজয়ের আগে প্রতিরোধ, শেষ বাঁশির আগে আরও একটি ডাইভ?
আধুনিক ফুটবল তাঁকে সংখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করবে। কবিতার জগৎ কিন্তু অন্য কথা বলে।
ভোজিনহার খেলা দেখতে দেখতে মনে পড়ে, পল রবসন ১৯৫৮ সালে লিখেছিলেন Here I Stand, যা একাধারে আত্মজৈবনিক রচনা, অন্যদিকে রাজনৈতিক ইশতেহার। কিন্তু না, গোলরক্ষক ভোজিনহা আমাদের জন্য কোনো ইশতেহার লিখে রাখেননি। তিনি শুধু গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আর যন্ত্রসভ্যতার সমস্ত অ্যালগরিদম, বাজারমূল্য, বয়সের হিসাব এবং নিশ্চিত পরাজয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নিজের চল্লিশ বছরের শরীরকে বাজি রেখে তিনি যেন বলে গেলেন—Here I stand. আমি এখানেই দাঁড়িয়ে আছি।















