ময়ূখ বিশ্বাস
ফুটবল বিশ্বকাপের মাঠে কোনও দল যখন নামে, তখন শুধু এগারোজন খেলোয়াড় নামেন না। সেই গোটা দেশের ইতিহাস, লড়াই, তার ক্ষত, তার আশা-আকাঙ্ক্ষাও নামে। যে ইতিহাস লেখা থাকে না রেকর্ড বুক স্কোরবোর্ডে। কিন্তু তাঁরা স্থান পান মহাকাব্যে। যেমনটা পাচ্ছে আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত মহামারীতে ক্লিষ্ট কঙ্গো। আটলান্টিকের ছোট্ট কেপ ভার্দে বা ক্যারিবিয়ান সাগরের বুকে কুরাসাও। বিশ্বকাপের অধ্যায়ে অমর হয়ে আছেন স্বাধীনচেতা অস্ট্রিয়ান অধিনায়ক মাথিয়াস সিন্ডেলার, যিনি হিটলারের নাৎসি জার্মানির অধীনে খেলতে বা জার্মানির প্রতিনিধিত্ব করতে সরাসরি অস্বীকার করেছিলেন। শাস্তি হয়েছিল মৃত্যু। তাই খেলা শুধু খেলা নয়, স্বৈরাচার-সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া টানটান রাখা ডাঃ সক্রেটিস, ক্রুয়েফ, বঞ্চিতের পাশে থাকা দ্রোগবা বা চির বিদ্রোহী মারাদোনারা।
ঠিক সে ইতিহাসের পথে চলা কঙ্গো শুধু একটি দেশের নাম নয়, এটি শোষণের এক জীবন্ত ইতিহাস। বেলজিয়ামের সম্রাট লিওপোল্ডের শাসনে কঙ্গো ছিল ওনার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। হাতির দাঁত, রবার, হীরে, কোবাল্ট, তামা - সব লুট হয়েছে, লাখো মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছে, কালো মানুষদের কব্জি কেটেছে উপনিবেশবাদীরা, চিড়িয়াখানায় রেখেছিলো কঙ্গোলিজদের। সে দেশে ১৯৬০ সালে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন প্যাট্রিক লুমুম্বা, কঙ্গোর প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি চেয়েছিলেন কঙ্গোর খনিজ সম্পদের ওপর স্থানীয় জনগণের অধিকার। কঙ্গো একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তাই তাঁকে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে খুন করেছিল সিআইএ, প্রাক্তন উপনিবেশকারী বেলজিয়ান শাসকরা।
লুমুম্বার সেই হাত-তোলা ভঙ্গি, সেই প্রতিরোধের প্রতীক আজও বেঁচে আছে। কঙ্গোর ফুটবল খেলার ম্যাচগুলোতে মিশেল এনকুকা এমবোলাদিঙ্গা, যিনি 'লুমুম্বা ভিয়া' নামে পরিচিত, তিনি পুরো ৯০ মিনিট মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকেন, হাত তুলে। ২০২৫ সালের আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস এর মঞ্চে কঙ্গো অসাধারণ পারফর্ম করেছিল। শক্তিশালী সেনেগালের বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে তারা বীরত্বের সঙ্গে ড্র করে এবং শেষ ষোলোর লড়াইয়ে আলজেরিয়ার কাছে মাত্র ১-০ গোলে হেরে বিদায় নেয়। আর সেই টুর্নামেন্ট থেকেই পুরো ম্যাচ জুড়ে কঙ্গোর পতাকার রঙে সাজানো পোশাক, চশমা, কোট পরিহিত মিশেল দলের দ্বাদশ খেলোয়াড় হয়ে উঠেছিলেন। একদম ঠিক লুমুম্বার মতো। তাঁর কাজ শুধু সমর্থন দেওয়া নয়। এটি প্রতিবাদ, এটি স্মরণ, এটি বলা যে লুমুম্বা এখনও বেঁচে আছেন- এই বলে গোটা দলকে ৯০ মিনিট ধরে কঠোর ভাবে 'জীবন্ত মূর্তি' হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। তবে এই বিশ্বকাপে বার বার বাধা পেয়েছেন তিনি। কঙ্গোতে ইবোলা মহামারির কারণে প্রথমে কোয়ারেন্টিন, তারপর মার্কিন ভিসা বাতিল। ট্রাম্প প্রশাসন তাঁকে প্রবেশ করতে দেয়নি। কঙ্গোর রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপে মেক্সিকোতে তিনি দলের পাশে থাকলেও, আমেরিকার মাটিতে পা রাখতে পারেননি। কঙ্গো দলের অফিসিয়াল প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়েও তাঁকে অপমানিত হতে হয়েছে।
একটু পিছিয়ে চলে যাইটিনটিনের দ্বিতীয় অভিযান ‘টিনটিন ইন দ্য কঙ্গো’। কঙ্গোর অধিবাসীদের দেখানো হয়েছিলো সহজ সরল-বোকা কিন্তু অলস। মানে ইউরোপের ভাষায় তৃতীয় বিশ্বের 'lazy native।' এদের 'সুসভ্য' করার 'মিশন' একমাত্র ইউরোপীয় প্রভুদের। কঙ্গো তখন বেলজিয়ামের উপনিবেশ। তাই বেলজিয়ান লেখকের কলমে আফ্রিকার ওই দেশ সম্পর্কে রীতিমতো বর্ণবিদ্বেষী, সাম্রাজ্যবাদী ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের ছাপ ছিলো প্রতি পাতায়। শতাব্দী পেরোলেও মানসিকতার বদল হয়নি। এইবার ফুটবল বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকেই আমরা দেখছি ট্রাম্প রাজে ভিসা ও অভিবাসন ব্যবস্থায় আফ্রিকান দেশগুলোর বিরুদ্ধে স্পষ্ট পক্ষপাতিত্ব করা হচ্ছে। যা আসলে বর্ণবিদ্বেষ। তবু....
সেই রাতের লড়াই
আটলান্টার রাতে কঙ্গো নেমেছিলো ইতিহাসের বিরুদ্ধে। তাদের সামনে ইংল্যান্ড। যার দলের বাজারমূল্য ১.২ বিলিয়ন পাউন্ড, প্রায় ১০,৮৬৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে কঙ্গো, যেখানে ৭৫% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে, যার জিডিপি বিহারের থেকেও কম। কিন্তু আফ্রিকার 'চিতাবাঘ' (কঙ্গো ফুটবল টিমকে এই নামেই ডাকা হয়)রা দেখাল জেদ, দৃঢ়তা। মাত্র ৭ মিনিটের মাথাতেই ব্রায়ান সিপেঙ্গা গোল করে কঙ্গোকে এগিয়ে দিতেই স্তব্ধ হয়ে যায় লন্ডন থেকে লিডসের পাবগুলো। তারপর শুরু হয় অবরোধ। বেলিংহ্যাম, মার্কাস র্যাশফোর্ড, হ্যারি কেনের একের পর এক আক্রমণ আটকে যেতে থাকল কঙ্গোর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি নামক দুর্গ প্রাচীর। ৪২তম মিনিটে ইয়োয়ানে উইসার শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। হয়তো সেটিই ছিল ম্যাচের অদৃশ্য মোড়। ইংল্যান্ডের আক্রমণের তরঙ্গ আরো বাড়লো। ৭৫তম মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের ক্রস থেকে হ্যারি কেনের হেডে সমতা। ৮৬তম মিনিটে আবার কেন। একটা কঠিন কোনাকুনি শটে বল জালে। কঙ্গোর প্রতিরোধ ভাঙ্গলেও, ভাঙ্গেনি তাদের লড়াই।
ফুটবলের চেয়েও বড় কিছু
এই ম্যাচ শুধু ৯০ মিনিটের খেলা ছিল না। ইংল্যান্ডের রক্ষণে ছিলেন কঙ্গোর বংশোদ্ভূত এজরি কনসা। কঙ্গোর জার্সিতে ছিলেন ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা অ্যারন ওয়ান-বিসাকা ও অ্যাক্সেল তুয়ানজেবে। বিশ্বকাপে এর ঠিক পরের ম্যাচেই নায়ক হয়ে ওঠেন আর এক কঙ্গোর বংশদ্ভূত খেলোয়াড় রোমেলু লুকাকু। এ যেন ঔপনিবেশিকতা, অভিবাসন আর বিশ্বায়নের ইতিহাস এক সন্ধ্যার জন্য ফুটবল মাঠে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল।
কঙ্গো ৫২ বছর পর বিশ্বকাপ খেলেছে। ওরা যে ফ্লুকে খেলেনি তা প্রমাণিত, গ্রুপ পর্বে তারা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পর্তুগালের সঙ্গে ড্র করে, উজবেকিস্তানকে হারিয়ে নকআউটে উঠেছে। তামা, কোবাল্ট, সোনা, টিন, ইউরেনিয়াম, হিরের খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এম২৩ বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষ, জাতিগত উত্তেজনা এবং সীমান্ত অস্থিরতা এখনও হাজার হাজার মানুষকে ঘরছাড়া করছে। গোটা দেশ জুড়ে এখনো ঔপনিবেশ শাসকদের মদতে চলছে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, মহামারী। তবু সব প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা দেখিয়েছে, ফুটবল একটি জাতির আশা, প্রতিবাদ এবং পুনর্জন্মের ভাষা। মার্কিন দেশের আটলান্টার স্টেডিয়ামের স্কোরবোর্ডে লেখা ইংল্যান্ড ২, কঙ্গো ১- সেই ভাষার কাছে তুচ্ছ মাত্র। আমাদের দেড়শ কোটির দেশের কাছেও এ এক শিক্ষা, অনুপ্রেরণা।
প্যাট্রিক লুমুম্বারা বেঁচে থাকলে বোধহয় খুব আনন্দ পেতেন আজ। কারণ কঙ্গো শুধু মাঠে খেলেনি, তারা ইতিহাসের বিরুদ্ধে খেলেছে। আর সেই লড়াইয়ে তারা জিতেছে, স্কোরবোর্ড যাই বলুক না কেন। কিছু পরাজয় আছে, যেগুলো স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে না। সেগুলো লেখা থাকে মানুষের চোখে, লেখা থাকে ইতিহাসের পাতায়। এক্ষেত্রে স্মরণে থাক আফ্রিকার প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক চিনুয়া আচেবে প্রবাদটি, "যতক্ষণ না সিংহের নিজস্ব ইতিহাসবিদ না থাকে, ততক্ষণ শিকারের ইতিহাস সবসময় শিকারীকে মহিমান্বিত করবে।"















