অরিত্র মজুমদার: অনেক বছর ধরে পৃথিবী আফ্রিকাকে দেখেছে একটাই চোখে। যুদ্ধের আফ্রিকা। দারিদ্র্যের আফ্রিকা। দুর্ভিক্ষের আফ্রিকা। অভিবাসনের আফ্রিকা। কিন্তু খুব কম মানুষই আফ্রিকাকে দেখেছে তার আরেকটা পরিচয়ে। সংগ্রামের আফ্রিকা। স্বপ্নের আফ্রিকা। আর মাথা নত না করার আফ্রিকা। আফ্রিকা এমন এক মহাদেশ, যেখান থেকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষকে দাস বানিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো তাদের জমি, সোনা, হীরে, রবার, কোবাল্ট, তামা-যা পেয়েছে, সব নিয়ে গিয়েছে। বহু দেশের মানচিত্র পর্যন্ত এঁকে দেওয়া হয়েছে ইউরোপের সভাকক্ষে, স্থানীয় মানুষের মতামত ছাড়াই।

স্বাধীনতা এসেছে। কিন্তু স্বাধীনতার পরও অনেক দেশকে লড়তে হয়েছে গৃহযুদ্ধ, সামরিক অভ্যুত্থান, বিদেশি হস্তক্ষেপ, দারিদ্র্য আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে। তবুও আফ্রিকা হার মানেনি। কারণ এই মহাদেশের মানুষ জানে-পড়ে যাওয়া শেষ নয়, উঠে দাঁড়ানোই ইতিহাস। হয়তো সেই কারণেই আফ্রিকান ফুটবলও আলাদা। ওদের ফুটবলে শুধু পাস, শট বা গোল নেই। আছে বেঁচে থাকার গল্প। আছে আত্মমর্যাদার গল্প। আছে পৃথিবীকে বারবার নিজের পরিচয় নতুন করে জানিয়ে দেওয়ার গল্প।
এই ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগেই সেই পুরোনো মানসিকতার একটা উদাহরণ সামনে এসেছিল। প্রাক্তন জার্মান বিশ্বকাপজয়ী মিডফিল্ডার বাস্তিয়ান সোয়াইনস্টাইগার বলেছিলেন, আফ্রিকান ফুটবল “একটু ওয়াইল্ড, একটু আনঅর্থডক্স, আর খুব একটা ট্যাকটিক্যাল নয়।” মন্তব্যটি দ্রুত বিতর্কের জন্ম দেয়।

আইভরি কোস্টের প্রধান কোচ এমেরসে ফায়ে সেই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের মন্তব্য বহুদিনের সেই পুরোনো স্টেরিওটাইপেরই প্রতিফলন, যেখানে আফ্রিকান দলগুলোকে শুধু শারীরিক শক্তির দল হিসেবে দেখা হয়, তাদের কৌশল, পরিকল্পনা ও ফুটবল বুদ্ধিমত্তাকে অবমূল্যায়ন করা হয়। তিনি এমনও বলেন যে, এই মন্তব্যকে বর্ণবাদী বলেও দেখা যেতে পারে। এই বিতর্কের মাঝেই আরেকটি বাস্তবতাও সামনে আসে। কিছু আফ্রিকান দল ও তাদের প্রতিনিধিরা ভিসা, দীর্ঘ ভ্রমণ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং টুর্নামেন্ট-সংক্রান্ত নানা লজিস্টিক সমস্যার অভিযোগ তোলেন আমেরিকার বিরুদ্ধে। সব অভিযোগের ব্যাখ্যা এক নয়, কিন্তু এটুকু পরিষ্কার যে আমেরিকায় খেলতে আসা সব দলের পথ সমান ও সহজ ছিল না।

কিন্তু আফ্রিকা অভিযোগ নিয়ে বসে থাকেনি। তারা উত্তর দিয়েছে ফুটবল দিয়ে। কিন্তু এই উত্তরটা একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে আছে প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাস। আফ্রিকার ফুটবল একদিনে বিশ্বমঞ্চে আসেনি। এর শুরুটা অনেক আগেই। উত্তর আফ্রিকার মিশর ছিল এই মহাদেশের প্রথম বড় শক্তি। ১৯৩৪ সালে বিশ্বকাপ খেলা প্রথম আফ্রিকান দেশও ছিল মিশর। পরে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের জন্মের পর দীর্ঘদিন মহাদেশের ফুটবলের মান নির্ধারণ করত মিশরই।

তারপর ধীরে ধীরে গল্পটা বদলাতে শুরু করল। পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো উঠে এল নতুন শক্তি হয়ে। নাইজেরিয়ার সুপার ঈগলস শুধু একটা দলের নাম নয়, আফ্রিকান ফুটবলের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠল। ঘানা দেখাল কীভাবে যুব উন্নয়ন, একাডেমি আর পরিকল্পনা দিয়ে বিশ্বমানের ফুটবলার তৈরি করা যায়। আইভরি কোস্টের “গোল্ডেন জেনারেশন” প্রমাণ করল, আফ্রিকার ফুটবলাররা শুধু ইউরোপের ক্লাবে খেলতেই পারে না, বিশ্ব ফুটবলের সেরাদের একজনও হতে পারে। মরক্কো, সেনেগাল, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া - একটার পর একটা দেশ নিজেদের ফুটবল সংস্কৃতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল।
কিন্তু এই পথটা কে দেখিয়েছিল?

১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপ। আফ্রিকার প্রতিনিধি ক্যামেরুন। আর সামনে ছিলেন ৩৮ বছর বয়সী এক মানুষ-রজার মিল্লা। বিশ্বকাপে তাঁর গোল, তাঁর নাচ, তাঁর নির্ভীক ফুটবল শুধু ক্যামেরুনকে কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে যায়নি; পুরো পৃথিবীকে প্রথমবার বুঝিয়েছিল, আফ্রিকান ফুটবলকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। অনেকে বলেন, আফ্রিকান ফুটবলের ইতিহাসে একটা যুগকে যদি দু’ভাগে ভাগ করতে হয়, তাহলে সেটা হবে - রজার মিল্লার আগে এবং রজার মিল্লার পরে।

তারপর যেন একের পর এক নক্ষত্র জন্ম নিতে লাগল। লাইবেরিয়ার জর্জ উইয়া - আজও একমাত্র আফ্রিকান ফুটবলার যিনি ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার জিতেছেন। আফ্রিকান প্লেয়ার অফ দ্য সেঞ্চুরি’র খেতাব পেয়েছেন। ক্যামেরুনের স্যামুয়েল এতো - যিনি ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্যায়ে একের পর এক ট্রফি জিতেছেন। আইভরি কোস্টের দিদিয়ে দ্রোগবা - যিনি শুধু একজন কিংবদন্তি স্ট্রাইকার নন, নিজের দেশে গৃহযুদ্ধ থামানোর আবেদন জানিয়ে ফুটবলের সামাজিক শক্তিকেও নতুন অর্থ দিয়েছিলেন। জে-জে ওকোচা, নওয়াঙ্কো কানু, মাইকেল এসিয়েন, ইয়ায়া তুরে, সাদিও মানে, মোহাম্মদ সালাহ, আশরাফ হাকিমি, ভিক্টর ওসিমেন - এই তালিকা শুধু বড় ফুটবলারের তালিকা নয়। এটা একটা মহাদেশের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার ইতিহাস।

তাই যখন কেউ বলেন, আফ্রিকান ফুটবল “শুধু ওয়াইল্ড”, “শুধু আনঅর্থডক্স”, “খুব একটা ট্যাকটিক্যাল নয়” - তখন প্রশ্নটা শুধু একটা মন্তব্যের নয়। প্রশ্নটা হল, তাহলে কি মিশরের বহু দশকের পরিকল্পিত ফুটবল উন্নয়নকে অস্বীকার করা হচ্ছে? ঘানার বিখ্যাত যুব একাডেমিগুলোর পরিশ্রমকে? আইভরি কোস্টের ফুটবল বিপ্লবকে? মরক্কোর আধুনিক জাতীয় ফুটবল কেন্দ্র, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে? সেনেগালের ধারাবাহিক উন্নয়নকে?

আফ্রিকার ফুটবল আজ আর শুধু প্রতিভার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। আজ তার সঙ্গে যোগ হয়েছে পরিকল্পনা। একাডেমি। বিজ্ঞান। ডেটা অ্যানালিসিস। কোচিং। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। আর সবচেয়ে বড় কথা - নিজেদের ওপর অটল বিশ্বাস। হয়তো সেই কারণেই ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপে আফ্রিকার সাফল্য কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটা বহু দশকের পরিশ্রমের ফসল। এটা ইতিহাসের স্বাভাবিক পরিণতি। আইভরি কোস্ট দেখিয়েছে, আফ্রিকান ফুটবল শুধু শক্তির নয়, শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা আর ট্যাকটিকসেরও ফুটবল। ঘানা দেখিয়েছে, বড় দলের সামনে মাথা নত না করেও লড়াই করা যায়।
আর কঙ্গো…

কঙ্গোর গল্পটা যেন পুরো আফ্রিকার গল্প। পৃথিবীর অন্যতম সম্পদশালী ভূখণ্ড। তবুও শতাব্দীর শোষণ। বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের নির্মম ঔপনিবেশিক শাসন। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা। গৃহযুদ্ধ। কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি। তারপরও মানুষ বেঁচে থেকেছে। গান গেয়েছে। হেসেছে। স্বপ্ন দেখেছে। আর ফুটবল খেলেছে।

সেই দেশই এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে এসে নকআউটে উঠে এসেছিল। এটা শুধু একটা ফল নয়। এটা একটা প্রতীক। একটা বার্তা। আজ কঙ্গোর কোনও শিশুর কাছে ফুটবল শুধু খেলা নয়। এটা ভবিষ্যৎ। এটা আশা। এটা বিশ্বাস যে, পৃথিবী তোমাকে যতবারই অবহেলা করুক, একদিন নিজের পরিচয় নিজেকেই লিখতে হয়।

শুধু আইভরি কোস্ট, ঘানা বা কঙ্গো নয়। এই বিশ্বকাপ যেন আফ্রিকান ফুটবলের নতুন এক জাগরণের গল্প লিখছে। একের পর এক দল প্রমাণ করে দিচ্ছে, আফ্রিকা আর কোনো “ডার্ক হর্স” নয়। তারা এখন বিশ্ব ফুটবলের মূল স্রোতের অংশ। মরক্কো আবারও দেখিয়ে দিল, ২০২২ সালের রূপকথা কোনও দুর্ঘটনা ছিল না। শৃঙ্খলিত রক্ষণ, দুর্দান্ত সংগঠন আর নিখুঁত পরিকল্পনা নিয়ে তারা আবারও নকআউটে। আজকের মরক্কোকে হারাতে শুধু নামের জোরে মাঠে নামলেই হয় না।

ইজিপ্টও মনে করিয়ে দিল, আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসে তাদের নাম কেন এত উজ্জ্বল। মহাদেশের সবচেয়ে সফল দলগুলোর একটি, যাদের ফুটবল সংস্কৃতি কয়েক প্রজন্ম ধরে তৈরি হয়েছে। অভিজ্ঞতা আর ধৈর্যের জোরে তারাও আবার নকআউটে। আলজেরিয়া যেন ফিরে এসেছে নিজের পুরোনো পরিচয়ে। বল পায়ে আত্মবিশ্বাস, দ্রুত আক্রমণ আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতা। এই দলটাকে দেখে মনে হয়েছে, আফ্রিকার ফুটবলের নতুন আত্মবিশ্বাসের আরেকটি মুখ।

সেনেগালও একই গল্প বলেছে। বহু বছর ধরে আফ্রিকার অন্যতম ধারাবাহিক শক্তি হয়ে ওঠা এই দলটা দেখিয়েছে, শারীরিক শক্তির সঙ্গে কৌশল, গতি আর দলগত বোঝাপড়া মিললে কতটা ভয়ংকর হয়ে ওঠা যায়।

দক্ষিণ আফ্রিকাও নীরবে নিজের কাজ করে গেছে। অনেক আলোচনার বাইরে থেকেও তারা প্রমাণ করেছে, বড় মঞ্চে লড়াই করার মানসিকতা এখনও তাদের রক্তে আছে। এই নকআউটে ওঠা হয়তো শুধু একটা ফল নয়, দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবলের নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়ানোরও বার্তা। আর তারপর আসে কাবো ভার্দের গল্প। আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের ছোট্ট এক দ্বীপরাষ্ট্র। জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ছয় লক্ষ। প্রাকৃতিক সম্পদ নেই বললেই চলে। দীর্ঘদিন ধরে খরা, দারিদ্র্য আর সীমিত সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে লড়াই করেই বড় হয়েছে দেশটা। বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে যাদের নামই কয়েক বছর আগেও খুব কম মানুষ জানত। সেই কাবো ভার্দেই আজ বিশ্বকাপের নকআউটে। 

এটা শুধু ফুটবলের সাফল্য নয়। এটা অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। এগুলো একটা ছোট দেশের বহু বছরের বিশ্বাস, ধৈর্য আর সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। ফুটবল যদি সত্যিই “দ্য বিউটিফুল গেম” হয়, তাহলে তার সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো প্রায়ই লেখা হয় এমন দেশগুলোর হাতেই, যাদের নাম একসময় কেউ উচ্চারণও করত না।

আজ তাই আফ্রিকার দিকে তাকালে আর আলাদা আলাদা দেশের গল্প দেখা যায় না। দেখা যায় একটা মহাদেশের গল্প। একটা মহাদেশ, যাকে একসময় শুধু শোষণের ইতিহাস দিয়ে চেনানো হতো। আজ সেই মহাদেশ নিজের নতুন পরিচয় লিখছে। 

এই বিশ্বকাপে আফ্রিকার দলগুলো হয়তো সবাই ট্রফি জিতবে না। হয়তো সবাই সেমিফাইনালেও উঠবে না। কিন্তু তারা ইতিমধ্যেই একটা বড় কাজ করে ফেলেছে। তারা পৃথিবীকে মনে করিয়ে দিয়েছে - আফ্রিকান ফুটবলকে আর পুরোনো চোখে দেখা যাবে না। এই দলগুলো আর শুধু “অ্যাথলেটিক” নয়। তারা ট্যাকটিক্যাল। তারা সংগঠিত। তারা পরিণত। আর সবচেয়ে বড় কথা, তারা নিজেদের ওপর বিশ্বাস করতে শিখেছে।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই। এই খেলাটা মানুষকে তার পাসপোর্ট দিয়ে বিচার করে না। ত্বকের রং দিয়ে বিচার করে না। কোন মহাদেশ থেকে এসেছে, সেটাও দেখে না। মাঠে শুধু একটা প্রশ্নই থাকে - তুমি কেমন ফুটবল খেলছ? এই বিশ্বকাপে আফ্রিকা সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। গোল দিয়ে। জয় দিয়ে। অদম্য লড়াই দিয়ে। আর কোটি কোটি মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। হয়তো এটাই এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কারণ ইতিহাসে এমন অনেক মুহূর্ত আছে, যখন একটা ট্রফির চেয়েও বড় হয়ে ওঠে একটা বার্তা। আর এবার সেই বার্তাটা এসেছে আফ্রিকা থেকে।

ফুটবল পায়ে। ঘাম দিয়ে। লড়াই দিয়ে। মাথা উঁচু করে। আর বুকভরা আত্মসম্মান নিয়ে।এই বিশ্বকাপ শেষ হবে কয়েক সপ্তাহ পরে। কিন্তু আফ্রিকান ফুটবলের এই জাগরণ, এই আত্মবিশ্বাস, এই ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস - এটা বহু বছর ধরে মনে রাখা হবে।