অনিকেত মহাপাত্র: কোনও ব্যক্তিকে মূল্যায়ন করতে গেলে সময়ের একটি দূরত্ব দরকার হয়। কোনও ঘটনার ক্ষেত্রেও একইভাবে তা সত্য। সময় তাৎক্ষণিকতাকে সরিয়ে যথার্থতার ঠিকানা দেয়। ১৯৫৩ সাধারণব্দে তাঁর রহস্যজনকভাবে মৃত্যুর তিরাশি বছর পরে আজকের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার’ প্রেক্ষিতে মনে হচ্ছে কোনও শুভমানস কিংবা কোনও সৎ প্রচেষ্টা কখনও চির – অন্ধকারে আবৃত থাকে না।
‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’! শ্যামাপ্রসাদ – পক্ষ পালিত হচ্ছে রাজ্যের সর্বত্র। বিদ্যালয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, মাঠে- ময়দানে! আজীবন শ্যামাপ্রসাদ বিরোধীরাও আমন্ত্রণ পাচ্ছেন, আমন্ত্রণ স্বীকার করেছেন এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রাপ্তির সংবাদ সাড়ম্বরে প্রচার করছেন। ‘আশুর ব্যাটা শ্যামা’ থেকে জ্বিহাগ্রে ‘ভারত-কেশরী ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি’ আসতে বিগত মাসদুয়েক কত প্রচেষ্টা তাঁদের করতে হয়েছে তা কহতব্য নয়।
ভারত-কেশরী ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি যে ঠিক ছিলেন তা প্রমাণ করে দিয়েছে আমাদের রাজ্যের সদ্য অতীত ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি। আর প্রমাণ করে দিয়েছেন আমাদের বুদ্ধিজীবীরা। তাঁর নির্ভুল হবার সাক্ষ্য দেয় পাক অধিকৃত কাশ্মীরের জনগণ কিংবা তারও পূর্বে ৩৭০ ধারার শৃঙ্খল থেকে অবশিষ্ট কাশ্মীরের মুক্তি। সেই সঙ্গে খুবই দায়িত্ব নিয়ে ড.শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মনন, প্রয়াস ও সাফল্যকে প্রত্যয়িত করে দিয়েছেন পাকিস্তান ও বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও জনগণ। ‘যুক্তবঙ্গ’ তৈরির বায়না ধরা নেতাদের নিয়ে ‘সদ্য শ্যামাপ্রসাদ – গবেষক’রা কাঁদুনি গাইতেন কিছুদিন আগেও। কিন্তু সেই ‘যুক্তবঙ্গ’ আসলে যে ‘তাকিয়া’ তা ওই নেতারা বোঝেননি কিংবা নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তির উচ্চাকাঙ্খা তা তাঁদের বুঝতে দেয়নি। যেমন করে বরিশালের যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ইগো এবং ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তির আশায় নিজের সমাজকে ঠকিয়েছিলেন, হয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী। কিন্তু হায়! মন্ত্রীত্ব ফলানো আর হল কই! পরবর্তী কালে পালিয়ে এসেছিলেন করাচি থেকে কলকাতায়। পদত্যাগ পত্রও লিখেছিলেন এই পোড়া দেশে বসে, যে দেশে তাঁর থাকার কোনও ইচ্ছেই ছিল না ১৯৪৭ এর আগে।
এই ভুল করেননি শ্যামাপ্রসাদ। ‘এসো আমরা বন্ধু হই, একসঙ্গে থাকি’। (স্বগত – একটু সুবিধে পাই কল্লাটা গোল্লায় পাঠাচ্ছি)। এই দুরভিসন্ধি তিনি ধরতে পেরেছিলেন। তাই সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যান ‘বাঙালির নিজস্ব ভূমি’ পাওয়ার। এবং সমকালীন বহু সচেতন বাঙালি ব্যক্তিত্বের অংশগ্রহণে এক বৃহত্তর আন্দোলন (সচেতনভাবে ব্যবহৃত) গড়ে তুলতে সমর্থ হন। তা সফল হলে সম্ভবপর হয় ‘পশ্চিমবঙ্গ’ সৃষ্টি। পাকিস্তান রাষ্ট্র ও সেখানকার নেতৃত্ব, ‘শুভবুদ্ধিসম্পন্ন’ জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে খুব সুচারুভাবে হিন্দু, শিখ ও খ্রিস্টানদের গণহত্যা ও গণ–ধর্মান্তকরণ করে সমস্ত দেশটিকে ইসলামের পবিত্রভূমিতে পরিণত করেছে! বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা ৩৪% থেকে ৮% তে নেমে এসেছে ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ –এর ‘গৌরবময়’ সাফল্যের দ্বারা। খুব তাড়াতাড়ি তা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। স্বস্তি পাবে জামাত, স্বস্তি পাবে মেনস্ট্রিম দলের নেতারা, স্বর্গীয় অনুভূতি আসবে তৌহিদি জনতার মনে!
এই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যেও গত মে মাসের ৪ তারিখের আগে কী পরিস্থিতি ছিল চিন্তা করুন। পিঠে খেতে খেতে কখন যে বাঙালির এই নিজস্ব ভূমি জেহাদি শক্তি খেয়ে ফেলত তা টের পেতেন না। কমরেডরা আপনাকে বোঝাতো কিচ্ছু হয়নি, আপনি ভাবুন আপনার ডাল ভাতের কথা সঙ্গে গাঁজার গজা চিবোন। ট্যানব্যানরা আপনাকে বোঝাতো ‘টাকার কথা ভাবুন মশাই, বাঙালি ফ্যাঙালি পরে হবে। টাকা লোটো, চলো দুবাই’। আর ইতিহাসবিদ ‘ডেদ্যশ’রা বোঝাতো সবই লুকিয়ে আছে ওই দাস বংশে, ওটাই বর্তমান সমস্যার থেকে মুক্তির পথ! কুতুবউদ্দিন আইবক, ইলতুতমিস, গিয়াসউদ্দিন বলবন পড়ুন। ঋত পথ। তবে রিজিয়াকে এড়িয়ে যান, ভাবাবেগ আহত হতে পারে!
স্বামী বিবেকানন্দের কথা বাঙালি বলে কিন্তু তাঁর কর্ম ও বাণী তাদের বোধগম্যতার বাইরে থাকে কিংবা তাঁকে নিয়ে দ্বিচারিতা করে। মনে মনে হয়তো ভাবে যে তিনি একটু বেশি মাত্রায় হিন্দু ছিলেন। স্থির করে যে এ জিনিস পেটে, পিঠে ও ধান্দায় সইবে না। নাহলে ভাবুন স্বামী বিবেকানন্দ রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রাপ্তির থেকেও তা রক্ষার ব্যাপারে অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। ড. শ্যামাপ্রসাদ ঠিক এই জায়গায় অনন্য।
ব্রিটিশ সরকার স্থানীয় স্তরে ভারতীয়দের হাতে সীমিত শাসন ক্ষমতা বা প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রদান শুরু করে ১৮৭০ সালের লর্ড মেয়োর প্রস্তাব (Lord Mayo’s Resolution)-এর মাধ্যমে। এরপর, ১৮৮২ সালে লর্ড রিপনের রেজোলিউশন স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল, যার ফলে ভারতীয়রা স্থানীয় পুরসভা ও জেলা বোর্ডের মাধ্যমে নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রশাসন চালানোর অধিকার পায়।
ধাপে ধাপে ভারতীয়দের হাতে রাজনৈতিক আসছিল। প্রাদেশিক স্তরেও ক্ষমতা চলে এসেছিল গত শতাব্দীর গোড়ায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ণমাত্রায় রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রাপ্তির সুযোগ করে দেবে। এমন সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়।
মুসলিম নেতৃবৃন্দের বড়ো অংশ মক্ষমতা প্রাপ্তির সূত্রটা ধরতে পেরেছিলেন। নিজের প্রতিষ্ঠা এবং সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা। এই ধ্বংসাত্মক প্রবণতাকে আটকানোর দিকে জাতীয় কংগ্রেস মনোযোগী হয়নি। তাদের নেতৃবৃন্দ এক অবাস্তব, পরিকল্পনাহীন ভবিষ্যৎ এবং বিপর্যয়ের দিকে দেশকে ও হিন্দু সমাজকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সমকালীন সময়ে যে যুগদ্রষ্টারা এই পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম দুজন ছিলেন ড.শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ও বিনায়ক দামোদর সাভারকার। তাঁরা এই সময়ের বাস্তবতা বুঝেছিলেন এবং হিন্দু সমাজের অস্তিত্ব ও অধিকারের জন্য সোচ্চার হয়েছিলেন।
১৯৪৬-৪৭ সালের সময়ে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল। মুসলিম লিগের পাকিস্তান দাবির প্রেক্ষাপটে বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। একদিকে মুসলিম লিগ সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল, অন্যদিকে অবিভক্ত স্বাধীন বাংলার ধারণাও সামনে আসে। কিন্তু এই দুই প্রস্তাবই বাংলার হিন্দু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক অধিকারকে বিপন্ন করত। এই অবস্থায় ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় দৃঢ়ভাবে বাংলাভাগের দাবি উত্থাপন করেন এবং যুক্তি দেন যে, হিন্দু-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে একটি পৃথক প্রদেশ গঠন করা উচিত। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় উপলব্ধি করেছিলেন যে, দেশভাগ যদি অনিবার্য হয়, তবে বাংলাভাগও অনিবার্য। তাঁর মতে, সমগ্র বাংলা পাকিস্তানে গেলে লক্ষ লক্ষ হিন্দুর জীবন, সম্পদ, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মারাত্মক সংকটের মুখে পড়বে। তাই তিনি বাংলার হিন্দু সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাভাগের দাবি জাতীয় স্তরে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর এই অবস্থানকে কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং ছিল সভ্যতা ও সংস্কৃতি রক্ষার সংগ্রাম। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভা, বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন এবং বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা বাংলাভাগের পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, নদিয়া, বর্ধমান, মেদিনীপুর, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিংসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ভারতের অন্তর্ভুক্ত থাকার দাবি জানান। এই আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশ সরকার এবং ভারতীয় জাতীয় নেতৃত্ব বাংলাভাগের প্রশ্নকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে বাধ্য হয়। ড. শ্যামাপ্রসাদের অন্যতম কৃতিত্ব হল কলকাতাকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত রাখা। কলকাতা ছিল বাংলার অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত কেন্দ্র। যদি কলকাতা পাকিস্তানে চলে যেত, তবে পূর্ব ভারতের অর্থনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামো গভীর সংকটে পড়ত। তাঁর রাজনৈতিক উদ্যোগ ও সাংগঠনিক দক্ষতার ফলেই কলকাতাসহ বাংলার পশ্চিমাংশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজধানী কলকাতা আজ ভারতের অন্যতম প্রধান মহানগর হিসেবে বিকশিত হতে পেরেছে।
পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা কেবল একটি ভূখণ্ডের সৃষ্টি নয়; এটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা এবং সনাতন ঐতিহ্যের সংরক্ষণেরও প্রতীক। বাংলার বহু প্রাচীন তীর্থক্ষেত্র, শিক্ষাকেন্দ্র, সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারক অঞ্চল এবং ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ভারতীয় সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংরক্ষিত হয়েছে বলে এই মতবাদে বিশ্বাস করা হয়।
এক অদ্ভুত সমাপতন লক্ষ করুন সুশীল পাঠক! শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি কে? একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার করা সমীক্ষায় সেরা হন শেখ মুজিবুর রহমান। স্বামী বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও হারিয়ে। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি তো সেইভাবে লড়াইয়ে এঁটে উঠতে পারেননি। কারণ কী? এটাও ছিল একটা জেহাদ। এটাও ছিল দেশ ছিনিয়ে নেওয়ার মতো একটা লড়াই। শক্তি কী? বিপুল জনসংখ্যা। এক একটা ভোট। বখতিয়ার এখন ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়েছে। লুকিয়ে ফেলেছে তরবারি। হাতে নিয়েছে স্মার্ট ফোন। জিতিয়ে দিয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানকে। কারণ উল্টো দিকে যে সব মনীষী রয়েছেন সবাই হিন্দু। পঁচিশ বছরের মধ্যে সেই ডিজিটাল যোদ্ধারা আবার তুলে নিয়েছে হাতে পাথর ভেঙে দিয়েছে, গুঁড়িয়ে দিয়েছে মুজিবরের সব চিহ্ন। কিন্তু ভুলিয়ে দেওয়ার সব চেষ্টা করার পরও ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে ভোলানো গেল কই? ’তারে ভোলানো গেল না কিছুতেই’। তাই একটি চিত্র কল্পনা করুন; যদিও তা অর্বাচীন তবুও। ইরানের ভূতপূর্ব আয়াতল্লা আলি খামেনির স্মরণসভায় গিয়ে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও ডোনাল্ড ট্রাম্প কাঁদতে কাঁদতে বর্ণনা করছেন তিনি কত ভাল বন্ধু ছিলেন তাঁদের! এই বিভ্রাটের সৌন্দর্য প্রাণ এনে দিয়েছে শ্যামাপ্রসাদ চর্চায়। আর জীবন্ত করে তুলেছে তাঁর চিন্তন ও স্পন্দনকে পশ্চিমবঙ্গের বিবিধ বিকাশের সম্ভাবনায়। তাই তো সাবোধ ও আবোধেরাও তাঁর নামাঙ্কিত তরীতে পাড়ি জমিয়েছেন।
জয় (শ্যা)মা বলে ভাসা তরী!















