মুকুটহীন রাজার মহাপ্রস্থান, জীবনের ময়দানে এক স্বপ্নের নাম নেইমার
নিজস্ব সংবাদদাতা
৬ জুলাই ২০২৬ ১৪ : ২৭
শেয়ার করুন
1
20
ফুটবলের ইতিহাসে যাঁর প্রতিভা প্রশ্নাতীত, কিন্তু রাজমুকুট পরার জন্য যে সৌভাগ্য থাকা দরকার তা বিধাতা দিয়ে পাঠাননি৷ নেইমার দ্য সিলভা স্যান্টোস জুনিয়র সেই তালিকারই প্রথম সারিতে।
2
20
ব্রাজিলের এক প্রান্তিক শহরের অলিগলি থেকে বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার হয়ে ওঠার পিচ ঘামরক্ত অশ্রসিক্ত, কিন্তু নেইমারের 'পাখির চোখ' কেবল একটি গোলক, আত্মবিশাস আর অদম্য জেদেই তাঁর রাজমুকুট৷
3
20
খালি পায়ে ব্রাজিলের অলিগলিতে ফুটবলে এলেপাথারি পা চালাচ্ছে একদল শিশু৷ কিছুটা চুপসে যাওয়া বল নিয়েই ছেলের দলের উন্মাদনা, তারই মাঝে একটি বালক, ভিড়ের মাঝেও অনন্য৷ ব্রাজিলিয়ান হিপ হপের তালেই যেন অলক্ষ্যে লেখা হচ্ছে ভবিষ্যতের রূপকথা।
4
20
নেইমারের বাবা সিনিয়র নেইমার সংবাদমাধ্যমকেও জানিয়েছিলেন, যেখানে তাঁরা থাকতেন সেটা অনুন্নত এলাকা। এমনকি বাসস্থানের পাশেই ছিল পুরো শহরের বর্জ্য ফেলার জায়গা৷ নেইমারের ছোটবেলা কেটেছে সেই আস্তাকুঁড়ের পাশে থেকেই৷
5
20
২০০৮ সাল পর্যন্ত নেইমার থেকেছেন সেই বাড়িতে৷ নিত্যদিনের অভাব অভিযোগ কষ্ট যন্ত্রণার ঘোর বাস্তব দেখতে দেখতেই বড় হয়ে ওঠা নেইমারের৷ 'প্রজেতো ইন্সটিতুতো দে নেইমার জুনিয়র' এর পিছনেই অতি সাধারণ বাড়িটা দেখে বোঝার উপায় নেই এইনবাড়ির বাসিন্দা একজন কিংবদন্তি। বাড়িতে বিশেষ কোনও পতাকা স্মারক বা ফলক কিছুই নেই৷ এক শান্ত গলির বাঁকে আর পাঁচটা সাধারণ বাড়ির মতোই বিকালের সোনালী রোদ ছুঁয়ে যায় সেই বাড়িতে৷
6
20
প্রাইয়া গান্দের অলিগলি থেকে বার্সেলোনার রাজপথ হয়ে বিশ্বদরবারে রাজপাট- কেমন ছিল সেই কিশোরের ছেলেবেলা?
7
20
১৯৯২ সালে সাও পাওলোর উপকণ্ঠে মোগি দাস ক্রুজেস শহরে জন্ম নেইমারের। বাবা নেইমার স্যান্টোস সিনিয়র নিজেও ছিলেন পেশাদার ফুটবলার, কিন্তু চোট আর সীমিত সুযোগ তাঁর স্বপ্নকে মাঝপথেই থামিয়ে দেয়।
8
20
নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন তিনি ঢেলে দেন ছেলের মধ্যে — একাধারে কোচ, পরামর্শদাতা ও অভিভাবক হয়ে। সাধারণ জীবনযাপন, আর পাঁচটা কিশোরের মতোই সুপারম্যান পাওয়ার রেঞ্জার দেখতে দেখতে বড় হওয়া, তবু কোথাও যেন আলাদা অধ্যবসায়।
9
20
মাত্র তিন বছর বয়সেই ফুটবলের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে নেইমারের৷ কথা বলা খাওয়ার মতোই জীবনের স্বাভাবিক অংশ ফুটবল৷ বলের প্রতি সহজাত নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সেই ছোট থেকেই৷
10
20
মাত্র ছ'বছর বয়সে সাও ভিসেন্তের সমুদ্রসৈকতে খেলার সময় স্যান্টোস ক্লাবের স্কাউট বেচিনিয়োর চোখে পড়ে যান ছোট্ট নেইমার। এত কম বয়সে এমন ভারসাম্য আর ক্ষিপ্রতা দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন তিনি।
11
20
এরপর ফুটসালের ছোট মাঠে, নিজের চেয়ে অনেক বড় ছেলেদের বিরুদ্ধে খেলতে খেলতেই তৈরি হয় সেই জাদুকরী ড্রিবলিং, যা একদিন গোটা বিশ্বকে মুগ্ধ করবে।
12
20
বারো বছর বয়সে স্যান্টোসের সঙ্গে প্রথম চুক্তি, সতেরোয় পেশাদার ফুটবলার হিসাবে অভিষেক। সিনিয়র নেইমারের মতে, খেলার জন্য একটা মাঠ হলেই নেইমার খুশি৷ ব্রাজিল না বার্সেলোনা তা নিয়ে ভাবিত নন নেইমার৷
13
20
কিন্তু প্রকৃত প্রেমকে বহু পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে উত্তীর্ণ হতে হয়৷ নেইমারের ফুটবলপ্রেমও তার ব্যতিক্রম নয়৷ এমন যে ক্লাব একদিন ফুটবলবিশ্বকে উপহার দিয়েছিল পেলের মতো রত্ন, সেখানেই শুরু হয় তুল্যমুল্য বিচার। কিন্তু চাপে ভেঙে পড়ার বদলে জ্বলে উঠলেন নেইমার।
14
20
২০১১ সালে স্যান্টোসকে কোপা লিবার্তাদোরেস জেতালেন, পেলেন দক্ষিণ আমেরিকার বর্ষসেরা ফুটবলারের সম্মান এবং বছরের সেরা গোলের জন্য ফিফার পুসকাস পুরস্কার।
15
20
২০১৩ সালে বার্সেলোনায় পাড়ি। লিওনেল মেসি ও লুইস সুয়ারেসের সঙ্গে গড়ে তুললেন 'এমএসএন'। পরপর দু'টি লা লিগা, আর ২০১৫ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়। মনে হচ্ছিল, মেসি-রোনাল্ডোর পাশে বিশ্বসেরার মুকুট বুঝি হাতছোঁয়া দূরত্বে।
16
20
কিন্তু তারপরই এল সেই সিদ্ধান্ত, যা তাঁর কেরিয়ারের গতিপথ বদলে দিল। ২০১৭ সালে প্রায় ২২ কোটি ইউরোর বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফারে প্যারিস সাঁ জাঁ-তে যোগ দিলেন নেইমার — আজও যা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি দলবদল।
17
20
কারও ছায়ায় নয়, নিজেই দলের মধ্যমণি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্যারিসে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে অপেক্ষা করছিল একের পর এক চোট, মাঠের বাইরের বিতর্ক, আর ২০২০ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে হৃদয়ভাঙা হার।
18
20
যে ইউরোপীয় মুকুটের জন্য তাঁকে আনা হয়েছিল, তা অধরাই থেকে গেল। ব্যালন ডি'অরও কোনওদিন ওঠেনি তাঁর হাতে।
19
20
তবু শিকড় ভোলেননি নেইমার। যে পাড়ায় বড় হয়েছেন, সেখানেই গড়ে তুলেছেন 'নেইমার জুনিয়র ইনস্টিটিউট'। একসময়ের আবর্জনার স্তূপ আজ হাজারও শিশুর স্বপ্ন দেখার ঠিকানা। ফেলে আসা শৈশবের অলিগলির প্রতি এ যেন নেইমারের নীরব কৃতজ্ঞতা।
20
20
এক বাবার আত্মত্যাগ, এক ছেলের অবিশ্বাস্য প্রতিভা, ফুটবলপ্রেমী অসংখ্য মানুষের হৃদয়ের বাঁধভাঙা উল্লাসই এই রাজার অদৃশ্য রাজমুকুট। পেশাদার ফুটবল থেকে বিরতি নিলেও ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ের মাঠে নেইমার আজীবন একশো গোল দিয়ে যাবেন৷