আজকাল ওয়েবডেস্ক: দক্ষিণ স্পেনের কর্দোবা প্রদেশে রবিবার সন্ধ্যায় এক ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনায় অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ১০০ জন আহত হয়েছেন। পুলিশ ও স্পেনের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম আরটিভিই (RTVE) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। আহতদের মধ্যে অন্তত ২৫ জনের অবস্থা গুরুতর বলে জানানো হয়েছে।
দুর্ঘটনাটি ঘটে কর্দোবা প্রদেশের ছোট শহর আদামুস (Adamuz)-এর কাছে। ম্যালাগা থেকে মাদ্রিদগামী একটি দ্রুতগতির ইরিয়ো (Iryo) ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা রেনফে (Renfe) পরিচালিত আরেকটি ট্রেনের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়। রেনফে ট্রেনটি মাদ্রিদ থেকে হুয়েলভাগামী ছিল। রয়টার্স জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে রেনফে ট্রেনের চালকও রয়েছেন।
স্পেনের রেল পরিকাঠামো সংস্থা আদিফ (Adif) জানায়, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিট নাগাদ দুর্ঘটনাটি ঘটে কর্দোবা স্টেশন থেকে মাদ্রিদের উদ্দেশ্যে ইরিয়ো ট্রেনটি ছাড়ার প্রায় ১০ মিনিট পরেই। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে আদিফ জানায়, “ইরিয়ো ৬১৮৯ ম্যালাগা–মাদ্রিদ ট্রেনটি আদামুস এলাকায় লাইনচ্যুত হয়ে পাশের লাইনে ঢুকে পড়ে। ওই লাইনে চলাচলরত মাদ্রিদ–হুয়েলভা হাই স্পিড ট্রেনটিও এর ফলে লাইনচ্যুত হয়।”
দুর্ঘটনার সময় ইরিয়ো ট্রেনটিতে ৩০০-র বেশি যাত্রী ছিলেন, অন্যদিকে রেনফে ট্রেনটিতে ছিলেন প্রায় ১০০ জন। সংঘর্ষের তীব্রতায় রেনফে ট্রেনের প্রথম দুটি বগি সম্পূর্ণভাবে লাইন থেকে ছিটকে যায়। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরই দমকল, পুলিশ, প্যারামেডিক, রেড ক্রস-সহ বিপুল সংখ্যক উদ্ধারকারী দল দুর্গম ওই এলাকায় পৌঁছয়। রাত গভীর পর্যন্ত উদ্ধারকাজ চলে। বহু যাত্রী দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষতিগ্রস্ত বগির ভিতরে আটকে ছিলেন।
কর্দোবার দমকল প্রধান পাকো কারমোনা টিভিই-কে জানান, ইরিয়ো ট্রেনের যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও রেনফে ট্রেনের পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি ভয়াবহ। তাঁর কথায়, “এখনও অনেকে ভিতরে আটকে আছেন। ঠিক কতজন মারা গেছেন, তা এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। জীবিত কাউকে খুঁজে পেতে আমাদের আগে মৃতদেহ সরাতে হচ্ছে। কাজটা ভীষণ জটিল।”
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় মাদ্রিদ ও আন্দালুসিয়ার বিভিন্ন হাসপাতালকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। আদামুস শহরে, যার জনসংখ্যা মাত্র ৫ হাজার, একটি অস্থায়ী রিসেপশন সেন্টার খোলা হয়েছে। রাতের তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা সেখানে খাবার, কম্বল ও গরম পানীয় পৌঁছে দিতে দেখা যায়।
ইরিয়ো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত ট্রেনটি ছিল ফ্রেচিয়ারোসা ১০০০ (Frecciarossa 1000) মডেলের, যা ইতালির রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত রেল সংস্থা ফেরোভিয়ে দেলো স্টাতো (Ferrovie dello Stato)-র মালিকানাধীন একটি বেসরকারি অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এক বিবৃতিতে ইরিয়ো জানায়, তারা ঘটনায় “গভীরভাবে দুঃখিত” এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সমস্ত জরুরি প্রোটোকল চালু করা হয়েছে।
স্পেনের পরিবহণমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানান, তিনি মাদ্রিদে আদিফের সদর দপ্তর থেকে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন। এক্স-এ তিনি লেখেন, “সর্বশেষ তথ্য অত্যন্ত গুরুতর। সংঘর্ষের অভিঘাত ভয়াবহ ছিল। এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করা।” দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এক যাত্রী কারমেন সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, কর্দোবা ছাড়ার কয়েক মিনিট পরই ইরিয়ো ট্রেনটি প্রচণ্ডভাবে কাঁপতে শুরু করে। “হঠাৎ আলো নিভে যায়, তারপর পেছনের দিক থেকে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়,” তিনি লেখেন।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, অন্ধকার বগির ভিতরে ট্রেনকর্মীরা যাত্রীদের বসে থাকতে অনুরোধ করছেন এবং যাঁদের চিকিৎসা সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা আছে, তাঁদের অন্যদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে বলছেন। এই দুর্ঘটনার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে মাদ্রিদ ও আন্দালুসিয়ার মধ্যে সমস্ত উচ্চগতির রেল পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বহু ট্রেন বাতিল করা হয়েছে বা অন্য পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্পেনের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি অন্যতম ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে, যা দেশজুড়ে গভীর শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
