আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলার এক সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর এর প্রভাব দ্রুত বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে পড়তে শুরু করেছে। হামলায় ইতিমধ্যেই এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলি খামেনেয়ী-ও নিহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে। এই হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান পারস্য উপসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ স্ট্রেইট অব হরমুজ বন্ধ করে দিয়েছে, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বে প্রায় ৩০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং প্রায় ২০ শতাংশ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) পরিবহণ হয়।

এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে এবং তীব্র ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যেখানে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ৬০ ডলারের কাছাকাছি ছিল, সেখানে কয়েক দিনের মধ্যেই তা বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

এশিয়ার বহু দেশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রপ্তানি কার্যত বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বড় গ্যাস রপ্তানিকারক কাতার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গ্যাস উৎপাদন সাময়িকভাবে স্থগিত করার কথাও ঘোষণা করেছে। এই পরিস্থিতিতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।

ভারতে যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। ৭ মার্চ কেন্দ্রীয় সরকার রান্নার গ্যাসের দাম প্রতি সিলিন্ডারে ৬০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা করেছে। সরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহ সংকটের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর পাশাপাশি ৯ মার্চ পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক এলপিজি সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করার নির্দেশ দেয়। হাসপাতাল, জরুরি পরিষেবা এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস সরবরাহ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন শহরে রান্নার গ্যাসের ঘাটতির খবর সামনে আসতে শুরু করেছে। কিছু জায়গায় গ্যাসের অভাবে রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখতেও বাধ্য হয়েছে বলে জানা গেছে, যদিও শুরুতে সরকার দাবি করেছিল যে দেশে যা গ্যাস মজুত আছে তা  কয়েক সপ্তাহের জন্য যথেষ্ট।

এখনও পর্যন্ত সরকার পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে থাকলে আগামী দিনগুলিতে সেই সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ভারতের বামপন্থী দলগুলি কেন্দ্রের নীতির সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, সরকার যুদ্ধের সম্ভাব্য প্রভাব আগাম মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহ সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে সময়মতো পদক্ষেপ নেয়নি।

পাশাপাশি প্রতিবেশী পাকিস্তানেও পরিস্থিতি গুরুতর আকার নিয়েছে। গত সপ্তাহে সরকার জ্বালানির দাম এক ধাক্কায় প্রায় ২০ শতাংশ বাড়িয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এককালীন মূল্যবৃদ্ধি বলে মনে করা হচ্ছে। জ্বালানি ব্যবহার কমাতে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ  সরকারি দপ্তরে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করার ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে দুই সপ্তাহের জন্য দেশজুড়ে স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে জ্বালানি খরচ কমানো যায়। তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে, তাই দেশের মজুত “সতর্কতার সঙ্গে” ব্যবহার করতে হবে।

একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ফিলিপিন্স। প্রেসিডেন্ট বং বং মার্কোস  নেতৃত্বাধীন সরকার সরকারি কর্মচারীদের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম সরকার নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় গাড়ি ব্যবহার কমাতে এবং বাড়ি থেকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে।

জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাড়ছে। ভারতে গত সপ্তাহ জুড়ে একাধিক শহরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ সংগঠিত হয়েছে। প্রতিবাদকারীরা অভিযোগ করেছেন যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন সরকার এখনও পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের হামলার সরাসরি নিন্দা করেনি। ভারতের ঐতিহাসিকভাবে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও এবং পশ্চিম এশিয়ায় কর্মরত লক্ষ লক্ষ ভারতীয় শ্রমিকের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে—এই যুক্তি তুলে ধরে সরকারকে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার দাবি উঠেছে।

বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের একাংশের অভিযোগ, সরকার দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দেশের স্বার্থকে “সমর্পণ” করেছে। বিশেষ করে ৪ মার্চ ভারত মহাসাগরে একটি ইরানি জাহাজে মার্কিন হামলার ঘটনায় কেন্দ্রের প্রতিক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভারতীয় নৌ-মহড়ায় অংশ নিয়ে দেশে ফেরার পথে IRIS Dena নামের ওই জাহাজে হামলায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে।