আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরানে মহিলাদের ফুটবল দলকে পার্সি ভাষায় বলা হয় ‘শিরজানান’। সে ভাষায় এর অর্থ সিংহী বা লায়নেস। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনাই দলের এই নামকে একপ্রকার অর্থবহ করে তুলেছে। খেলার মাঠে হেরে গেলেও, বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে তারা৷
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি মাসের ২ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টে অনুষ্ঠিত এএফসি এশিয়ান উইমেনস কাপের একটি ম্যাচে ইরান মুখোমুখি হয় দক্ষিণ কোরিয়ার। ম্যাচের আগে জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়। কিন্তু দেখা যায় ইরানের কোনও খেলোয়াড়ই জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে গলা মেলাননি।
ইরানের শাসনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে নারীদের উপর কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধ চাপিয়ে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে খেলোয়াড়দের এহেন আচরণ সরাসরি প্রতিবাদের ইঙ্গিত।
উল্লেখ্য, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের দামামা। আমেরিকা ও ইজরায়েলের ইরানকে লক্ষ করে যৌথ হামলায় টালমাটাল বিশ্ব। যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই-র মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এই অস্থিরতার মাঝেই ফুটবল মাঠে দাঁড়িয়ে ইরানের মহিলা-খেলোয়াড়রা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দেন।
এই 'নীরব' প্রতিবাদের পর ইরানের সরকারি মহল তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের উপস্থাপক মোহাম্মদ রেজা শাহবাজি খেলোয়াড়দের বিশ্বাসঘাতক বলে অভিহিত করেন। বলেন, এই ঘটনা, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার সমান। তাঁর কথায়, “খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।” এই মন্তব্যের পরই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
একাধিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে, অস্ট্রেলিয়ায় থাকা ইরানি প্রবাসীরা ইরানের মহিলা খেলোয়াড়দের আশ্রয়ের সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করছিল। এদিকে খেলোয়াড়দের রাখা হয়েছিল একটি বিলাসবহুল হোটেলে। তাদের উপর নজরদারিও ছিল। সেক্ষেত্রে সরাসরি যোগাযোগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।
অন্যদিকে, শেষ ম্যাচের দিন আরেকটি ঘটনা ঘটে। দল যখন স্টেডিয়াম থেকে বাসে ফিরছিল, তখন বাইরে দাঁড়ানো সমর্থকেরা এসওএস সংকেত দেখান। অর্থাৎ, সেভ আওয়ার সোলস। জানা গিয়েছে, বিপদের মুখে এই সংকেত দেখিয়ে মানুষ সাহায্য চায়। বাসের ভিতর থেকেও খেলোয়াড়রা একই সংকেত দেখান।
শেষ পর্যন্ত জাহরা ঘানবারি (দলের অধিনায়ক), ফাতেমেহ পাসানদিদেহ, জাহরা সারবালি, আতেফেহ রামেজানিজাদেহ, এবং মোনা হামৌদি, এই পাঁচজন খেলোয়াড় অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে দলের আরেক সদস্য মোহাদ্দেশ জোলফি এবং একজন সহকারী কর্মী জাহরা সোলতান মোশকেহকারও তাদের সঙ্গে যোগ দেন।
সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ তাঁদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক খেলোয়াড়দের সঙ্গে দেখা করেন। পরবর্তীতে জোলফি মত পরিবর্তন করে ইরানে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সূত্রের দাবি। অনেকের আশঙ্কা ছিল, তাঁরা যদি দেশে না ফেরেন তবে তাঁদের পরিবারের উপর চাপ আসতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার সরকার জানিয়েছে, খেলোয়াড়দের উপর কোনও চাপ দেওয়া হয়নি। তাদের সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ইরান সরকার এই ঘটনাকে ভিন্নভাবে দেখছে। ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ অভিযোগ করেছেন, খেলোয়াড়দের “ধরে রাখা হয়েছে”। তিনি আরও দাবি করেন, আমেরিকার চাপেই অস্ট্রেলিয়া এই আশ্রয় দিয়েছে। আশ্রয় পাওয়ার পরে কয়েকজন খেলোয়াড় ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন ক্লাব থেকে খেলার প্রস্তাবও পাচ্ছেন।
খেলায় ইরান হেরে গিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে এই ঘটনাকে বড় 'জয়' হিসেবে দেখছেন নেটিজেনরা। কোনও স্লোগান নয়। কোনও বক্তৃতাও নয়। শুধুই 'নীরবতা'। এই 'নীরবতা'ই বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে শক্তিশালী প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
