আজকাল ওয়েবডেস্ক: মস্কো ও লন্ডনের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঠান্ডা সম্পর্ক আরও তিক্ত হলো। বৃহস্পতিবার রাশিয়া ঘোষণা করেছে, তারা একজন ব্রিটিশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করছে। রাশিয়ার দাবি, ওই কূটনীতিক আসলে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং কূটনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে গুপ্তচরবৃত্তি চালাচ্ছিলেন।
রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা এফএসবি জানিয়েছে, বহিষ্কৃত ব্যক্তির নাম গ্যারেথ স্যামুয়েল ডেভিস। তিনি মস্কোয় ব্রিটিশ দূতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারি পদে কর্মরত ছিলেন এবং রাশিয়ার সরকারি কূটনৈতিক নথিতেও সেই পরিচয়েই তাঁর নাম নথিভুক্ত ছিল। রাশিয়ার বিদেশ মন্ত্রক এই ঘটনায় ব্রিটেনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানায়।
বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের কাছে এমন তথ্য এসেছে, যা থেকে বোঝা যায় যে ব্রিটিশ দূতাবাসের এক কূটনৈতিক কর্মী যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকের স্বীকৃতি বাতিল করা হয়েছে এবং তাঁকে দুই সপ্তাহের মধ্যে রাশিয়া ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাশিয়া স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছে, যদি লন্ডন পাল্টা কোনও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে মস্কোও “সমান ও কঠোর জবাব” দেবে। অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, এই ধরনের বহিষ্কার প্রায়শই পাল্টা বহিষ্কারে পরিণত হয়। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে এই অভিযোগের বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই রাশিয়া ও ব্রিটেনের কূটনৈতিক সম্পর্ক কার্যত জমাট বেঁধে গিয়েছিল। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর সেই সম্পর্ক আরও অবনতি ঘটে। যুদ্ধের পর থেকে ব্রিটেন ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান সমর্থক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, সামরিক সহায়তা, কূটনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক স্তরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে।
বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার একাধিকবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং যুদ্ধ অবসানের সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি ক্রেমলিনের অন্যতম কট্টর সমালোচক হিসেবেই পরিচিত। সম্প্রতি ব্রিটেন ও ফ্রান্স একটি যৌথ ঘোষণায় যুদ্ধবিরতির পরে ইউক্রেনের ভূখণ্ডে সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছে। রাশিয়া এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়ে দিয়েছে, ইউক্রেনে পশ্চিমী সেনা উপস্থিত হলে তাদের বৈধ সামরিক লক্ষ্য হিসেবে দেখা হবে।
এছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে মস্কো অভিযোগ করেছে যে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে একটি রুশ-পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ দখলের মার্কিন পরিকল্পনায় ব্রিটেন যুক্ত ছিল। এই অভিযোগও দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস আরও গভীর করেছে।
রাশিয়া ও ব্রিটেনের মধ্যে গুপ্তচরবৃত্তি সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব বহু দশকের পুরনো। ২০০৬ সালে লন্ডনে রুশ পলাতক আলেক্সান্ডার লিটভিনেঙ্কো পোলোনিয়াম বিষক্রিয়ায় নিহত হন যাকে ব্রিটিশ তদন্তকারীরা রুশ গোয়েন্দা সংস্থার পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেন। ২০১৮ সালে ব্রিটিশ শহর সলসবেরিতে রুশ গুপ্তচর সের্গেই স্ক্রিপাল ও তাঁর কন্যাকে নোভিচক নার্ভ এজেন্ট দিয়ে বিষপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় একটি ফেলে দেওয়া পারফিউম বোতল থেকে বিষ ছড়িয়ে পড়ে এবং এক সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু হয়, যার জেরে পশ্চিমী দেশগুলো ব্যাপকভাবে রুশ কূটনীতিক বহিষ্কার করে।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে ডাউনিং স্ট্রিট ও ক্রেমলিনের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ কার্যত বন্ধ। জানা যায়, শেষবার কোনও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলেন ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বরিস জনসন, যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে। সে সময় জনসন পুতিনকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইউক্রেনে সেনা পাঠানো হবে একটি “ভয়াবহ ভুল সিদ্ধান্ত”।
সব মিলিয়ে, ব্রিটিশ কূটনীতিক বহিষ্কারের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল—ইউক্রেন যুদ্ধ কেবল সামরিক সংঘর্ষ নয়, বরং তা কূটনীতি, গোয়েন্দা যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গভীর স্তরেও সংঘাতকে আরও ধারালো করে তুলছে। এখন নজর থাকবে, লন্ডন এর জবাবে কী পদক্ষেপ নেয় এবং এই উত্তেজনা আর কতদূর গড়ায়।
