আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরানে যখন টানা গণবিক্ষোভ, রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন এবং নজিরবিহীন যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মধ্যে দিয়ে দেশ কার্যত স্তব্ধ, ঠিক সেই সময় দেশটির একাংশ ধনী ও প্রভাবশালী নাগরিক নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের খোঁজে সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন তুরস্কে। ইরান-তুরস্ক সীমান্তবর্তী ভ্যান প্রদেশ এখন অনেকের কাছেই যেন সাময়িক মুক্তির জায়গা—যেখানে রাত কাটছে নাইটক্লাব, মদ, হুক্কা আর উচ্চ শব্দের গানে।
ভ্যান শহর বহুদিন ধরেই ইরানিদের কাছে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এখানে যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, তা নিছক ভ্রমণের নয়। দ্য টেলিগ্রাফ–এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইরানে যখন আন্দোলনকারীরা গুলি ও গ্রেপ্তারের মুখে পড়ছেন, তখন ভ্যানের ক্লাবগুলোতে জড়ো হচ্ছেন সেইসব ইরানি নাগরিক, যাঁরা দেশের চলমান সংকট থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।
স্থানীয় এক ইরানি নাগরিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই মানুষগুলোর বড় অংশই শাসকগোষ্ঠীর সুবিধাভোগী। তাঁর ভাষায়, “এরা দেশে থাকতে ভয় পাচ্ছিল। আন্দোলনকারীরা একসময় হয়তো ওদের বিরুদ্ধেই দাঁড়াবে, এই আশঙ্কা থেকেই তারা আপাতত দেশ ছেড়েছে। ইরানে ব্যবসা করে অনেক টাকা কামিয়েছে, আর সেই টাকাই এখন এখানে উড়িয়ে দিচ্ছে।”
নাইটক্লাবের ভেতরের পরিবেশ যেন আরেক ইরান। সেখানে বাস্তবতার গল্প মানে ছুটি, ব্যবসা আর আনন্দ। এক মহিলা জানান, তুরস্কে ছুটি কাটাতে কাটাতেই তিন দিন আগেও তিনি ইরানে থাকা আত্মীয়দের সঙ্গে অনায়াসে কথা বলেছেন ঠিক সেই সময়, যখন দেশের কোটি কোটি মানুষ ইন্টারনেট ও ফোন যোগাযোগ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিলেন। হুক্কা টানতে টানতে, ভদকা চুমুক দিতে দিতে তিনি গল্প করছিলেন তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে পরিচালিত তাঁর আন্তর্জাতিক ব্যবসা নিয়ে।
কিন্তু একই সীমান্ত পেরিয়ে আসা বহু ইরানি সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের বর্ণনায় উঠে এসেছে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, গণগ্রেপ্তার এবং ভয়াবহ আতঙ্কের চিত্র। অনেকের আশঙ্কা, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা সরকারি বা আন্তর্জাতিক হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা HRANA এখন পর্যন্ত অন্তত ৩,০৯০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে, যার মধ্যে ২,৮৮৫ জনই আন্দোলনকারী। গ্রেপ্তার হয়েছেন ২২,০০০-এর বেশি মানুষ। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও ভয়াবহ হতে পারে।
শনিবার এক বিরল বক্তব্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও দায় চাপিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর। এই পরিস্থিতিতে বহু ইরানি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, কারণ তাঁদের স্বজন কারাবন্দি হয়েছেন বা শাসকের চোখে ‘সন্দেহজনক’ কারও সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় তাঁরা নিজেরাই টার্গেট হওয়ার আশঙ্কায় ছিলেন।
এক ইরানি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “এটা ভীষণ অপমানজনক। ভাবুন তো আপনার দেশে হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে, আর কেউ নিশ্চিন্তে বারে গিয়ে নাচছে।” ভ্যানের একটি নাইটক্লাবে এক রাতের খরচ প্রবেশমূল্য, পানীয়, খাবার ও হুক্কা মিলিয়ে সহজেই ইরানের গড় মাসিক আয়ের চেয়ে বেশি, যা প্রায় ৭৫ পাউন্ড। এই বৈপরীত্যই তুলে ধরে ইরানের গভীর শ্রেণি-বৈষম্য, যা বিক্ষোভের অন্যতম মূল কারণ।
মুদ্রাস্ফীতি লাগামছাড়া হয়ে উঠেছে। জল, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিত্যদিনের বাস্তবতা। HRANA–এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরই ইরানের ৩১টি প্রদেশে অন্তত ২,২৯৪টি বিক্ষোভ হয়েছে, যার বেশিরভাগই ছিল বেতন বকেয়া, শ্রমিক অধিকার ও আর্থিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের দমননীতি ও ইন্টারনেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত অর্থনীতিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। NetBlocks–এর হিসাবে, প্রতি ঘণ্টা ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে ইরানের ক্ষতি হয় প্রায় ১৫ লক্ষ ডলার। এমনকি যাঁরা অনলাইনে কাজ করেন না, তাঁরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কারণ অনলাইন লেনদেন বন্ধ থাকায় পরিবহণ ও ডেলিভারি কাজ থমকে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে অনেক ইরানি মনে করছেন, অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান না হলে বিক্ষোভ আবার শুরু হতে পারে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, শাসকগোষ্ঠী তখনও একই মাত্রার হিংসায় নামতে পারে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয় এমনকি শাসক ও নিরাপত্তা প্রধানদের লক্ষ্য করেও তাহলে জনগণের সামনে ফের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কূটনৈতিক উদ্যোগের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই অবস্থান থেকে সরে আসছেন বলে মনে করা হচ্ছে, যা অনেক আন্দোলনকারীকে হতাশ করেছে।
ভ্যান শহরে ইরানিদের উপস্থিতি এতটাই দৃশ্যমান যে বহু ক্যাফে ও রেস্তোরাঁয় ফারসি ভাষায় মেনু রাখা হয়েছে এবং পার্সি খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। শহরের একাধিক এলাকায় ইরানি ব্যবসা ও স্থায়ী বসবাসও বাড়ছে। তবে এই ভিড়ের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে বিভাজন। এক ইরানি চা-ব্যবসায়ীর কথায়, “ওরা খুব ধনী। ওরা কিছুই ভাবে না। ক্ষমতায় থাকতে চায়, টাকা বানাতে চায়। সাধারণ মানুষের জীবন ওদের কাছে গুরুত্বহীন। আর আমরা গরিব মানুষ ডিম, চা বিক্রি করে দু’পয়সা রোজগারের জন্য এখানে আসি। আমাদের সবাই ভয় পায় শাসকের।”
নাইটক্লাবে তখনও বাজছে তীব্র সঙ্গীত। নাচের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে ইরানের রাজপথে ঝরে পড়া রক্তের স্মৃতি। ভ্যান শহরের রাতগুলোতে ক্ষমতা বদলের প্রশ্ন যেন অনুপস্থিত রয়ে গেছে শুধু এক শ্রেণির নিরাপদ পালিয়ে যাওয়া আর আরেক শ্রেণির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
