আজকাল ওয়েবডেস্ক: কাগজে-কলমে তিনি তুরস্কের এক প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ কৃষক। স্বপ্নও খুব সাধারণ, একটি সংসার, একজন স্ত্রী ও দু’টি সন্তান। কিন্তু বাস্তবে সুলতান কোসেন সেই মানুষ, যাঁকে গোটা বিশ্ব চেনে পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা জীবিত মানুষ হিসেবে। তাঁর উচ্চতা ৮ ফুট ২.৮২ ইঞ্চি। ইতিহাসের সপ্তম সর্বোচ্চ উচ্চতার মানুষ হয়েও আজ তিনি সবচেয়ে বেশি যেটার খোঁজে, তা হলো ভালোবাসা।

১৯৮২ সালের ডিসেম্বর মাসে দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের ঐতিহাসিক শহর মারদিনে সুলতানের জন্ম। জাতিতে কুর্দি হলেও তাঁর পরিবারে কেউই অস্বাভাবিক উচ্চতার ছিলেন না। মা-বাবা ও চার ভাইবোন সকলেই গড়পড়তা উচ্চতার মানুষ। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এর তথ্য অনুযায়ী, ১০ বছর বয়স পর্যন্ত সুলতান ছিলেন একেবারেই স্বাভাবিক। এরপর হঠাৎ করেই শুরু হয় অস্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি, যার পেছনে ছিল পিটুইটারি জায়ান্টিজম নামে এক বিরল হরমোনজনিত রোগ।

এই অস্বাভাবিক উচ্চতাই ধীরে ধীরে তাঁর স্বাভাবিক জীবনকে কঠিন করে তোলে। পড়াশোনা সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েনে তাঁকে কৃষিকাজে নামতে হয়। প্রিয় খেলা বাস্কেটবলও খেলতে পারেননি, স্থানীয় ক্লাব কর্তৃপক্ষ মনে করেছিল, তিনি খেলাটির জন্যই “অতিরিক্ত লম্বা”।

আট ফুটের বেশি উচ্চতার মানুষের কাছে দৈনন্দিন জীবন সহজ নয়। জামাকাপড় বা জুতো পাওয়া প্রায় অসম্ভব। সাধারণ গাড়িতে উঠতে সমস্যা হয়। চেয়ার, সোফা বা বেঞ্চ, সবই তাঁর লম্বা পায়ের জন্য ছোট ও অস্বস্তিকর। নিউইয়র্কের পরিচিত হলুদ ট্যাক্সির পাশেও তাঁকে দাঁড় করালে বোঝা যায়, কতটা ছোট হয়ে যায় পৃথিবী তাঁর সামনে। দিনের শেষে গা এলিয়ে দেওয়ার মতো সাধারণ আরামও তাঁর কাছে বিলাস।

অতিরিক্ত গ্রোথ হরমোনের কারণে তাঁর শরীরে তৈরি হয় পিটুইটারি টিউমার, যা চিকিৎসা না হলে মারাত্মক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারত। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল স্কুলে গামা নাইফ সার্জারির মাধ্যমে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। ২০১২ সালে চিকিৎসকেরা জানান, চিকিৎসা সফল হয়েছে এবং সুলতানের বৃদ্ধি থেমে গেছে।

এর আগেই অবশ্য তিনি একাধিক গিনেস রেকর্ড গড়েছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা জীবিত মানুষ হওয়ার পাশাপাশি তাঁর হাত বিশ্বের সবচেয়ে বড়- ১১.২২ ইঞ্চি, এবং পায়ের মাপ ১৪ ইঞ্চি, যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম। এই অনন্য শারীরিক গঠন তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিয়েছে। তুরস্ক সরকার তাঁকে দেশের সাংস্কৃতিক দূত হিসেবে নিযুক্ত করেছে। পর্যটন প্রচারের কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন এবং ইতিমধ্যেই সফর করেছেন বিশ্বের ১২৭টি দেশে।

“মানুষ আমাকে দেখলেই ছবি তুলতে চায়,” বলেছেন সুলতান। “আমি খুশি যে দেশের জন্য কিছু করতে পারছি।”

তবু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একা। ২০২১ সালে তাঁর প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়। ভাষাগত দূরত্ব ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাবই ছিল সম্পর্ক ভাঙার অন্যতম কারণ। এরপর নতুন জীবনসঙ্গী খুঁজতে ২০২২ সালে তিনি তুরস্ক ছেড়ে রাশিয়ায় যান। সেখানেই তিনি বলেছিলেন, রুশ মহিলারা ভদ্র ও ভালোবাসায় বিশ্বস্ত এই বিশ্বাস থেকেই তাঁর আশা ছিল।

এক বছরের চেষ্টা সত্ত্বেও সেই খোঁজ সফল হয়নি। আর্থিক নিরাপত্তা, বিশ্বজোড়া পরিচিতি সব কিছু থাকা সত্ত্বেও ভালোবাসা ধরা দেয়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি জানান, এবার তাঁর খোঁজের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা এক এমন জায়গা, যা অদ্ভুত ও ব্যতিক্রমী মানুষের জন্য পরিচিত।

বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা মানুষ হয়েও সুলতান কোসেনের চাওয়া খুব সাধারণ। তিনি চান এমন একজন মানুষ, যিনি তাঁকে রেকর্ড বা বিস্ময় হিসেবে নয়, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই ভালোবাসবেন।