আজকাল ওয়েবডেস্ক: সকাল ১০টা বাজলেই রাস্তাঘাট ধু ধু প্রান্তর। তীব্র দাবদাহের জনশূন্য এলাকা। স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় কোথাও হঠাৎই যেন ছন্দপতন। এই চিত্রই ধরা পড়েছে উত্তরপ্রদেশের বান্দা জেলায়। গত ২৭ এপ্রিল সেখানে তাপমাত্রা ছুঁয়েছিল ৪৭.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ছিল সমগ্র দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর পর গত মঙ্গলবার সেই রেকর্ড ভেঙে তাপমাত্রা পৌঁছে যায় ৪৮.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ১৯৫১ সালের পর বান্দায় গরমের এমন ভয়াবহ রূপ আর দেখা যায়নি। তীব্রতার দিক থেকে রাজস্থানের চুরু বা জয়সলমেরকেও এ বছর টেক্কা দিচ্ছে এই জেলা।
তীব্র গরমের হাত থেকে বাঁচতে স্থানীয় মানুষ থেকে ব্যবসায়ী, সকলেই তাঁদের জীবনযাত্রার ধরন বদলে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। আত্তারা শহরের এক জুয়েলারি ব্যবসায়ী লখন গুপ্ত সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, সকাল ৬টায় দোকান খুলে ৯টার মধ্যে কাজ গুটিয়ে বাড়ি ফিরে ফিরছেন তিনি। কারণ ১০টার পর রাস্তাঘাট পুরো ফাঁকা হয়ে যায়। বিকেল বা সন্ধ্যার আগে কোনও ক্রেতার দেখাই মেলে না। ফলে এপ্রিল মাস থেকেই তাঁর ব্যবসা প্রায় লাটে উঠেছে।
গরমের প্রভাব পড়েছে শ্রমজীবী মানুষের ওপরেও। বিকল্প খুঁজছেন তাঁরাও। দিনের বেলা মাঠে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ায় কৃষকেরা এখন রাতে এলইডি ফ্লাডলাইটের আলোয় চাষবাস করছেন। এর কোপ পড়ছে তাঁদের মজুরিতেও। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখায় শ্রমিকদের দৈনিক মজুরির প্রায় ৪০ শতাংশই কেটে নেওয়া হচ্ছে। এমনকি, দুপুরের খাবার দোকানগুলো এখন বন্ধ থাকছে, ব্যবসা শুরু হচ্ছে সূর্যাস্তের পর। অসহ্য পরিস্থিতির কারণে বহু মানুষ কাজের জন্য অন্য রাজি পাড়ি দিচ্ছেন।
জানা গিয়েছে, অতিরিক্ত বিদ্যুতের চাহিদা এবং চরম আবহাওয়ার কারণে গত ৪৫ দিনে বান্দার ৪৪টি সাবস্টেশনের বহু ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিদ্যুৎ দপ্তরের কর্মীদের জল দিয়ে ট্রান্সফরমার ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করতে হচ্ছে। বর্তমানে এলাকায় দৈনিক প্রায় ১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে। স্থানীয় গ্রাম প্রধানের স্বামী প্রহ্লাদ বাল্মীকি জানান, সারাদিন ধরে গ্রামবাসীদের কাছ থেকে পানীয় জল, লোডশেডিং এবং ফসল নষ্ট হওয়ার অভিযোগ আসছে। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে বান্দা অচিরেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে।
গবেষক এবং পরিবেশবিদদের মতে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের যেমন অনেকাংশেই দায়ী। পাশাপাশি বছরের পর বছর ধরে চলা স্থানীয় পরিবেশ ধ্বংসের চেষ্টাও রয়েছে এর নেপথ্যে। এ ভাবে চলতে থাকলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, আগামী দুই দশকের মধ্যে জেলার কিছু অংশ সম্পূর্ণ মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে। বান্দা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিভাগের প্রধান অধ্যাপক দীনেশ সাহা এবং স্থানীয় সমাজকর্মী উমা শঙ্কর পাণ্ডে জানান, বিন্ধ্য পর্বতমালা অঞ্চলের প্রায় ২৫ শতাংশ পাহাড় ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। এই অঞ্চলের সচ্ছিদ্র বেলেপাথর বৃষ্টির জল ধরে রেখে ভূগর্ভস্থ জলস্তর বজায় রাখত। পাথর ভাঙা ও খনির কারণে সেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনালের নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কেন, রঞ্জ ও বাগাই নদী থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫৫,০০০ টন লাল বালি তুলে নেওয়া হচ্ছে। বালি কমে যাওয়ায় নদীগর্ভের পাথর বেরিয়ে আসছে, যার ফলে জল ধরে রাখার ক্ষমতা কমে গিয়ে জল শুকিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।
লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ধ্রুব সেন সিং এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, "সবুজায়ন হ্রাস, আর্দ্রতার অভাব, বালির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ার কারণে বান্দা এখন একটি 'হিট আইল্যান্ড' পরিণত হয়েছে। এখানে একটা মারাত্মক চক্র তৈরি হয়েছে। যার ফলে সারাদিন ধরে ভূপৃষ্ঠ উত্তপ্ত হচ্ছে, কিন্তু রাতের বেলা সেই তাপ পুরোপুরি বিকিরিত হওয়ার আগেই আবার তীব্র রোদ নিয়ে দিন শুরু হয়ে যায়। ফলে মানুষ বিন্দুমাত্র স্বস্তি পাচ্ছে না।"
সন্ধ্যা নামলে আত্তারা বাজারে আবার খোলে দোকানপাট। রাস্তায় ধীরে ধীরে বাইকের আওয়াজ শোনা যায়। সূর্যাস্তের পর লখন গুপ্তের দোকানে যখন দু-একজন ক্রেতা আসতে শুরু করেন। ততক্ষণে বান্দা আরও একটি দহনদিনের ক্ষত নিয়ে অপেক্ষায় থাকে পরবর্তী সকালের।















