আজকাল ওয়েবডেস্ক: ধরুন আপনি কলকাতা থেকে লন্ডন যাবেন। তাহলে একটা ন’ঘন্টার বিমান সফর বেছে নেবেন নিশ্চয়ই? ভাগ্য ভাল হলে জানলার ধার পাবেন। সেই জানলার ধারে বসেই প্রায় ১০টা দেশের মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাবেন। কিন্তু জানেন কি, এই কলকাতা থেকে লন্ডনে যাওয়ার জন্য এককালে একটি বাস চলত? ১১টি দেশের উপর দিয়ে যেত সেই বাস! শুধু জানলা দিয়ে নয়, বাস থেকে নেমেই সেই দেশ দেখতে পারতেন সাধারণ যাত্রীরা!

একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সালটা তখন ১৯৫৭। ব্রিটিশ ভারতে কলকাতা থেকে লন্ডন যাতায়াতের জন্য চালু হল একটি বিশেষ বাস। ১৬,০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে বাসটি পৌঁছবে অপর প্রান্তে। দ্বিতল এই বাস প্রাচ্য থেকে পশ্চিমে যেত প্রায় ৫০ দিন ধরে। 

তিনবেলার খাওয়া এবং ঘুমানোর বাঙ্কার সমেত খরচ ছিল হাজার তিনেক ভারতীয় মুদ্রা। মাথায় রাখতে হবে এটা আজকের তিন হাজার নয়, ব্রিটিশ ভারতের তিন হাজার। সাহেবদের পাশাপাশি বাসে যাতায়াত করতেন বিত্তবান ভারতীয়রাও। তখনও ভারতের টুকরো হয়নি। ফলত পাকিস্তানের উপর দিয়ে বাস পাড়ি দিলে তখনও ভারতীয়দের মনে রোমাঞ্চ আসত না, অন্য দেশ পাড়ি দিচ্ছি ভেবে। সেক্ষেত্রে ভিনদেশের কাঁটাতার পার হতে হতো আফগানিস্তান থেকে। যাত্রীরা কাবুলে নেমে সেখানকার পেস্তা বাদাম কিনতেন সস্তা দরে। আবার পার হতেন তুর্কির সেই বিশাল বিশাল পর্বতগুলি। 

বাস চলার সময়ে নির্দিষ্ট সময়ে কয়েকটা নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়ানো হতো। যাত্রীরা সেখানেই নামতেন। শৌচালয় ব্যবহার করতেন। একদিন ইরানের মাটিতে নামলেন তো পরের দিনই কাজাকিস্তানের মাটিতে। দরদাম করে সহজলভ্য দেশীয় জিনিসও ভরতেন ঝুলিতে। কখনও কখনও খুব সুন্দর কোনও লেকের ধারে বাস দাঁড়াত। কখনও বা বাসের জানলায় সুর্য ডুবত ইরাকের কোনও পাহাড়ের মাঝের হাইওয়েতে। 

এই বাসে যাঁরা যাত্রা করেছেন তাঁদের কাছে এই যাত্রার প্রতিটা দিন ভীষণ আকর্ষনীয়। তাঁদের স্মৃতিতে এই যাত্রার প্রতিটা দোকান, প্রতিটা চা-বিরতি কিংবা বাজারের ছোটখাট দরদাম করে কেনা জিনিসগুলিও অবিস্মরণীয় রয়ে গিয়েছে আমৃত্যু। তাঁদের ক্ষেত্রে এই বাসযাত্রা আসলে শুধু একটি যাত্রাই ছিল না, এটি ছিল একটি চলমান পাঠশালা। 

যাত্রীরা প্রতিটা দেশের ভাষা জানতেন না। যে দেশে নামতেন একটু বাজার ঘুরে দেখার জন্য সেই দেশের মানুষেরাও তাঁদের ভাষা জানতেন না। কিন্তু, কারও সঙ্গে কোনও কথা বলতে অসুবিধা হত না কারও। দরদাম করতেও অসুবিধা হত না। কত ধরনের সংস্কৃতি দিনের পর দিন বদলে বদলে যেত এই ৫০টি দিনে তার ঠিক নেই। 

কিন্তু এই দ্বিতল বাস ধীরে ধীরে বন্ধ হতে শুরু করল। বিশ্বে এল যুদ্ধ। কাঁটাতার ধীরে ধীরে জনসাধারণের জন্য দুর্বোধ্য হয়ে উঠতে থাকল। বাসের সংখ্যা কমতে কমতে শেষ বাসটি ১৯৭৬-এ কলকাতা থেকে লন্ডন গেল। ব্যাস, সেই শেষ। তারপর আর সেই বাসকে কখনও দেখা যায়নি।

পরবর্তীতে এই বাসটি যে নির্দিষ্ট পথের উপর দিয়ে যেত সেই পথ দিয়ে কিছু পর্যটক ও পরিব্রাজক কলকাতা থেকে লন্ডন গিয়েছিলেন। এই যাত্রাপথের নাম দেওয়া হয় ‘হিপি ট্রেল’। তবে ছ’য়ের দশকের এই হিপি ট্রেল আসলে বিখ্যাত কলকাতা-লন্ডনের বাসযাত্রার পথ। 

বর্তমানে পাশ্চাত্যের এই জনপ্রিয় শহর আমাদের আদরের তিলত্তমার থেকে মাত্র ন’ঘন্টার দূরত্বে রয়েছে। কিন্তু সেদিনের সেই বাসযাত্রা, প্রায় ১১টা দেশের নানান সংস্কৃতি ছুঁয়ে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা দিয়ে মাপা প্রতিটা কিলোমিটার স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছে তাঁদের যাঁরা সেই যাত্রাপথের সঙ্গী হয়েছিলেন।