প্রতীক্ষা ঘোষ: ‘মুখের কথা একলা হয়ে/রইল পড়ে গলির কোণে/ক্লান্ত আমার মুখোশ শুধু/ঝুলতে থাকে বিজ্ঞাপনে’- “মুখের কথা” মানে তো শুধুমাত্র কিছু উচ্চারিত শব্দই নয়, মুখের কথা মানুষের ভিতরের অনুভূতিগুলিকে একটা আদল দেয়। সেই কথা যখন ‘গলির কোণে’ পড়ে থাকে, অর্থাৎ সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তখন লোক দেখানো সভ্যতার সামনে মানুষের মুখোশ ক্লান্ত হয়ে ঝুলতে থাকে মাত্র। মানুষ আর মানুষের মতো করে বাঁচতে পারে না ঠিক। সমরেশ বসুর লেখা উপন্যাস থেকে তৈরি বাদল সরকারের নাটক ‘বিবর’-এর নায়কের অবস্থাও ঠিক সেরকমই।
স্পন্দন মুখার্জি পরিচালিত একই নামের এই নাটকের সবচেয়ে সুন্দর দিক হল, এখানে নায়ককে মহান কেউ হিসাবে দেখানো হয়নি। বরং তাঁকে একেবারেই একজন সাধারণ মানুষ হিসাবে দেখানো হয়েছে। তাঁর মধ্যে যৌন লালসা আছে, ভণ্ডামি আছে, পুরুষতান্ত্রিক অধিকারবোধ আছে। তিনি বহু নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে যান, কিন্তু নিজের প্রেমিকা যখন একাধিক পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়ান, তখন তাঁর ভিতরে একটা মালিকানাবোধ জেগে ওঠে। নায়ক তাঁর প্রেমিকাকে মানুষ হিসেবে ভালবাসেন না, তিনি তাঁকে নিজের ‘সম্পত্তি’ হিসেবে চান। চরিত্রটি নিজেকে আধুনিক বলে দাবি করেন, কিন্তু তাঁর ভিতরের কাঠামো আসলে আজও ভীষণ পুরুষতান্ত্রিক। তাঁর ভিতরের এই নোংরা মনটাকে দেখা যায় যখন তিনি নিজের প্রেমিকাকে হত্যা করছেন। সেই মুহূর্তে তিনি অর্ধনগ্ন হয়ে যান। যেন তাঁর ভিতরের আদিম পুরুষতান্ত্রিক হিংস্রতা নগ্ন হয়ে ওঠে। এখানে অবশ্যই প্রধান চরিত্রে অভিনীত গম্ভীরা ভট্টাচার্য এবং তাঁর প্রেমিকার চরিত্রে অভিনীত পৌলমী ভট্টাচার্য বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
অথচ, আত্মহত্যার সময়ে তাঁর শরীরে পোশাক আছে। এখানেই নাটকের ট্র্যাজেডি। অন্যকে হত্যা করার সময়ে তিনি নিজের নগ্ন সত্যকে প্রকাশ করতে পারেন, কিন্তু নিজেকে হত্যা করার সময়ে পারেন না। কারণ মানুষ নিজের সামনে সম্পূর্ণ নগ্ন হতে ভয় পায়। নায়ক সারাজীবন নিজের ভিতরের গহ্বর, সেই বিবরের দিকে তাকিয়ে থেকেছেন, অথচ শেষ মুহূর্তে সেই বিবরের সামনে সম্পূর্ণ উলঙ্গ দাঁড়ানোর সাহস তাঁর হয়নি। তাই আত্মহত্যাও আসলে এখানে কোনও মুক্তির কথা বলে না, বরং নিজের তৈরি কাঠামোর কাছে নিজের আত্মসমর্পণের কথা বলে। এইখানে স্পন্দন মুখার্জির মঞ্জ পরিকল্পনা বিশেষ প্রশংসনীয়।
নাটকের আলোর ব্যবহার বিশেষ উল্লেখযোগ্য। যখন বাবা-মা-বোন-অফিসের বস এবং প্রেমিকার সঙ্গে নায়ক দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন মঞ্চের বিভিন্ন প্রান্তে আলাদা আলাদা আলো জ্বলছিল। প্রতিটি আলো যেন সমাজের একেকটি প্রতিষ্ঠান যেমন- পরিবার, চাকরি ইত্যাদিকে তুলে ধরছে। কিন্তু সব আলো একত্রে এসে পড়ছে নায়কের উপরে। যেন সমাজের সমস্ত নজর, প্রত্যাশা, নিয়ন্ত্রণ এসে একজন মানুষের শরীরে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। অথচ তাঁর নিজের জন্য কোনও আলাদা আলো নেই। পুরুষতান্ত্রিক নায়ক আসলে নিজের আলোর মালিক নন। তিনি সবসময় অন্যের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত। আর যখন তিনি চাকরি ছাড়েন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান, একা থাকতে শুরু করেন, তখন যৌনতার দৃশ্য মঞ্চের এক কোণে সরে যায়। যেন তাঁর কামনা এখন আর সামাজিক নয়, মানসিক অন্ধকারের কোণে জন্ম নেওয়া এক গোপন খিদে মাত্র। গোটা মঞ্চ অন্ধকার, শুধু কোণের শরীরী মুহূর্তর দৃশ্য, আসলে নিজের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা হারানোর প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠে।
মঞ্চসজ্জার চলমান ছোট ছোট দেওয়ালগুলো ছিল অসাধারণ প্রতীক। সেগুলো কখনও রাস্তা, কখনও ঘর, কখনও অফিস হয়ে উঠছিল। কিন্তু আসলে সেগুলো নায়কের মনের দেওয়াল। সেগুলো চলমান, অর্থাৎ বন্দিত্বও স্থির নয়। পরিস্থিতি বদলায়, কারাগারের রূপ বদলায়, কিন্তু অন্তরের বন্দিদশা আসলে কোথাও যেতে পারে না। পরিবার, অফিস, সম্পর্ক, যৌনতার তৈরি এই কারাগার থেকে নায়ক স্বাধীন হতে চান, কিন্তু তাঁর স্বাধীনতার ভাষাটাও আসলে সমাজের তৈরি। মঞ্চে থাকা আয়নাটি ছিল সবচেয়ে নির্মম প্রতীক। আয়নায় আসলে নিজের এক আধুনিক, স্বাধীন, বিদ্রোহী পুরুষের প্রতিচ্ছবি নায়ক দেখতে চান। কিন্তু, তাঁর ভিতরের শূন্যতা কোনও মিথ্যে প্রতিচ্ছবি দিয়ে আর ভরছে না। তাই আয়না এখানে সত্যের শুধু একটা প্রতিচ্ছবিই নয়, সমাজের তৈরি কারাগারের ভাবমূর্তি হয়ে উঠেছে।
মানুষ মুক্তিও চায়, আবার নিরাপদ খাঁচাও খোঁজে। মানুষ প্রায়ই স্বাধীনতার ভয় থেকে নিজেই নতুন দাসত্ব তৈরি করে। এই নাটকে ব্যবহৃত সুরগুলো আসলে সেই দ্বৈততাকেই বহন করে। খুব সাধারণ কিছু সুর ব্যবহার করা হয়েছে। এই সাধারণত্বই নাটকের রাজনৈতিক শক্তি। কারণ নায়কের ট্র্যাজেডি অসাধারণ কারও ট্র্যাজেডি নয়, এটা আসলে মানুষের প্রতিদিনের ক্লান্তি। তাই সুরগুলো একসঙ্গে বিষাদ, প্রেম, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আর নিরাপদ আশ্রয়ের লোভ বহন করে। তাপস কুমার রায়ের সঙ্গীত পরিচালনা এখানে বিশেষ প্রশংসনীয়।
আর সেই সংলাপ, ‘আমুও যা। তুমোও তাই।’ এই সংলাপ নাটকের ভরকেন্দ্র। এখানে নায়ক আর দর্শকের মধ্যের দেওয়াল ভেঙে যায়। নায়ক তখন আর আলাদা কেউ থাকেন না। তাঁর নোংরামি, লালসা, ক্লান্তি, ভণ্ডামি, সবই আসলে দর্শকের ভিতরের এক একটি দিককে তুলে ধরে। এটাই ‘বিবর’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি। নাটকটি কোনও নৈতিক শিক্ষা দেয় না। বরং দর্শককে নিজের ভিতরের গহ্বরের সামনে, নিজের বিবরের মুখোমুখি দাঁড় করায়। তবে, কোথাও কোথাও দীর্ঘ মনোলগ নাটকটির স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙেছে।
সব মিলিয়ে, এই নাট্যরূপ শুধু একটি মানুষের পতনের গল্প বলে না। এটা আসলে শহুরে মধ্যবিত্ত পুরুষ-মানসিকতার সূক্ষ্ম ময়নাতদন্তের কথা বলে। এখানে প্রেম আছে, কিন্তু ভালবাসা নেই। যৌনতা আছে, কিন্তু অন্তরঙ্গতা নেই। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু মুক্তি নেই। শেষ পর্যন্ত ‘বিবর’ আমাদের ভাবতে বাধ্য করে, আসলে আমরা সমাজের কারাগারে বন্দি, নাকি নিজেদের অন্তরের কারাগারে বন্দি?















