রিয়া পাত্র
হিসেব। হিসেব। হিসেব। ভোটের মাস খানেক আগে থেকে, এই হিসেব চলছে। দলীয় কার্যালয়ে। চায়ের ঠেকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কথায়। মাঠের আলে। হিসেব মেলাতে কেউ অঙ্ক কষলেন। কেউ অঙ্ক কষে ভোটারের ঘরের দু'পদ রেঁধে দিলেন, দেওয়ালে খানিক রঙ করে দিলেন। তবে বৃহস্পতিবারের ভোট সেই হিসেব কিছুটা বদলে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ৯২ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে ১৬ জেলায়, নির্বাচন কমিশনের হিসেব তেমনটাই। তারপর আর কতটা ভোট পড়ল, তা যদিও এখনও স্পষ্ট নয়। কেন স্পষ্ট নয়, সেই প্রশ্ন এখনও সরিয়ে রেখে, আলোচনা করা যেতে পারে ভোট দানের হার নিয়ে।
বঙ্গে এখনও পর্যন্ত যা হিসেব, তাতে ৯২ শতাংশের বেশি ভোট পড়ে গিয়েছে। এই ভোট দানের হার নজিরবিহীন। কেবল রাজ্যের নিরিখে নয়, দেশের নিরিখেও। প্রশ্ন ঘুরছে, কেন এই বিপুল ভোট দান। এর অর্থ কি এই হার প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার হাওয়া? অনেকেই রাজনীতির সেই হিসেব মেলাতে চাইছেন সহজ হিসেবে।
যদিও ২০২১-এর ভোটের হারের নিরিখেও, তা প্রতিষ্ঠানবিরোধী বলে ধরে নেওয়া যেতেই পারত, যদিও তাতে ক্লিন স্যুইপ হয়েছে তৃণমূলের। ফার্স্ট ফেজ মিটতেই দেখা যাচ্ছে, দফা এক, দাবি অনেক। অমিত শাহ বলছেন ১৫২ আসনের মধ্যে ১১০ প্লাস পাবে বিজেপি। ম্যাজিক ফিগার ছোঁয়া তারপর জাস্ট তুড়ি মারার বিষয়। মোদি বলছেন, তৃণমূল নাকি অনেক জেলায় খাতাই খুলতে পারবে না। অন্যদিকে তৃণমূল বলছে, তারাও ১১০ এর বেশি আসন পাবে। ভোট বড় বালাই। বিজেপি নেতারা একবার বলেন মাছ বন্ধের কথা, একবার কোঁচা করা ধুতি পরে মাছ নিয়ে হেঁটে যান, খেয়েও দেখান। কেউ বলেন কাঁটা ছাড়িয়ে খাইয়েও দিতে পারবেন। ওদিকে এবার পৃথক পৃথক লড়াই করে বাম কংগ্রেস বলছে, শূন্যের গেরো কাটিয়ে, এবার তারাও খাতা খুলে, কয়েক পাতা উল্টেও ফেলবে, অর্থাৎ এক, দুই নয়, এই বিপুল ভোটের মধ্যে তাদের অংশও অনেকটাই।
ভোট দানের নিরিখে, প্রথমেই বলা যাক, এই ভোট দানের হার, এবার এক ধাক্কায় কয়েক শতাংশ বেশি হওয়ার ছিলই। কারণ রাজ্যে ভোটার তালিকা সংকুচিত হয়েছে অনেকটা। অর্থাৎ উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, আগে ১০০ ভোটার ছিলেন, ভোট দিতেন ৭০ জন। এবার এসআইএর-এর পরে সেই মোট ভোটারের সংখ্যাটাই দাঁড়াল ৮০, আর ভোট দিলেন ৬৫। অর্থাৎ ভোটদানের হার বাড়ল একধাক্কায়। কিন্তু যে হারে ভোট বেড়েছে, তার পিছনে বেশকিছু কারণ থেকেই যায়। অনেকেই বলছেন এই ভোট প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়ার ভোট। কিন্তু এই তত্বের বাইরেও থাকছে আরও একাধিক কারণ।
সেই কারণ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে, আগে বলতে হবে, মুর্শিদাবাদের কথা। ২২ বিধানসভার মুর্শিদাবাদের ২১-এর বিধানসভা ভোটে ভোট পড়েছিল ৮৭.৩৮ শতাংশ। ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুর্শিদাবাদে সর্বাধিক ৯৬.৯৫ শতাংশ ভোট পড়ল। রঘুনাথগঞ্জের কথা ধরা যাক। ২০১১ সালে ওই আসনে ভোট পড়েছিল, ৭৬.৩৭ শতাংশ, ২০২৬-এ পড়ল ৯৬.৯০ শতাংশ। হিসেবে ২০ শতাংশের বেশি। ২০১১ থেকে ২৬, সামশেরগঞ্জে ভোট পড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি। এখান থেকেই ঢোকা যাক এসআইআর ইস্যুতে। এই সামশেরগঞ্জ থেকে এবার এসআইআর-এ বাদ গিয়েছে ৭৪,৭৭৭ জনের নাম। তার মধ্যে ৭০ হাজার মুসলিম ভোটার। অন্যদিকে, রঘুনাথগঞ্জ থেকে এবার এসআইআর-এ বাদ গিয়েছে ৪৬,১০০ জনের নাম। এর মধ্যে ৪৩ হাজার মুসলিম ভোটার। জঙ্গিপুর, লালগোলা, এই বিধানসভাগুলিতেও এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়া এবং তালিকায় থাকা মুসলিম ভোটারের অনুপাত সামশেরগঞ্জ, রঘুনাথগঞ্জের মতোই। এই ভোটে, এই অনুপাত এবং তার বহিঃপ্রকাশ যে অন্যতম হাওয়া, তা এতদিনে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে বাংলার রাজনীতিতে। তবে এই মুর্শিদাবাদের ভোটের হারকে ভোটদানের অতি উৎসাহ ভাবলে বিশ্লেষণে ভুল হবে । সেই প্রসঙ্গেও যাওয়া যাক এসআইআর ইস্যুতে ঢোকার আগে। এই সামশেরগঞ্জে ২০২১ সালে ভোট পড়েছিল এবারের চেয়ে ৩০ হাজার বেশি, কিন্তু শতাংশের বিচারে এবারের ভোটদানের হার ১৬ শতাংশ বেশি, কারণ মোট ভোটারের সংখ্যা কমে গিয়েছে এক ধাক্কায়। সামশেরগঞ্জে ২০২১ সালে মোট ভোটার ছিলেন ২৩৫৫৭৬। ভোট দিয়েছিলেন ১৮৮৬২৭জন। ২০২৬ সালে ওই কেন্দ্রে মোট ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬১৪৩৫ -তে। ভোট দিয়েছেন ১৫৫০৪২জন। হিসেব বলছে, ভোট কম পড়ল ৩৩৫৮৫ । রঘুনাথগঞ্জে ২০২১ সালে মোট ভোটার ছিলেন ২৪৯৫৫৯, ভোট দিয়েছিলেন, ১৯০৫৯১। ২০২৬-এ ওই বিধানসভায় নাম বাদ যাওয়ার পর, মোট ভোটার হয়, ২০০৪৫২। ভোট দিলেন ১৯৪০৫৮। অর্থাৎ হিসেবের নিরিখে ভোটদানে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও ভোটার বেড়েছে মাত্র ৩৪৬৭ জন।
ভোটের কয়েকমাস আগে থেকে, রাজ্যে শুরু হল এসআইআর। এই এসআইআর নিয়মে বাদ পড়ল লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম। মুর্শিদাবাদে বাদ পড়ল হাজার হাজার সংখ্যালঘু মানুষের নাম। এমনিতেই রাজ্যের শাসক দলের ভোট ব্যাঙ্কে সংখ্যালঘু ভোট বড় ফ্যাক্টর। ১৫ বছরের সরকার, স্থিতাবস্থার মধ্যে সংখ্যালঘু ভোট জোড়া ফুল শিবির ছেড়ে কিছুটা যেতে পারে বলে মনে হলেও, এই এসআইআর সেই হাওয়া ঘুরিয়ে দিয়েছে। মুর্শিদাবাদে, যে হারে নাম বাদ গিয়েছে, বাদ পড়া সেইসব মানুষদের পরিবারের লোকেরা ক্ষোভে, আক্রোশে, ভয়ে বাড়ি বেরিয়ে লাইন দিয়েছেন ভোট দিতে। তাঁদের মূলত চালিত করেছে 'ভয়'। যাঁদের নাম কাটা গেল, গেল। তাঁদের বাইরে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের নাম যদি কাটা যায় ভোট না দিলে, সেই ভয় তাঁদের টেনে নিয়ে গেল ভোটের লাইনে। এই হাওয়ার মাঝে মুর্শিদাবাদের সংখ্যালঘুরা যে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিজেপিকে ভোট দিয়ে বসলেন না, তা সহজে অনুমেয়। তবে মৌসম-অধীর ধীরে ধীরে মুর্শিদাবাদ-মালদহের 'মৌসম' কিছুটা বদলাতে পারলেন বলেও মনে হচ্ছে। যদিও সংখ্যার হিসেবে তা বড় সামান্য।
মুর্শিদাবাদ, দিনাজপুর, মালদহের মানুষ যদি এসআইআর-এর 'ভয়' নিয়ে লাইনে দাঁড়ালেন, অন্যান্য জেলার মানুষেরাও এসআইআর-এর কারণেই লাইনে দাঁড়ালেন, কিন্তু কারণটা ভয় নয় বরং ভিন্ন। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকার মানুষেরা ভয় যেমন পেলেন, একাধিক জেলার মানুষেরা কাল লাইনে দাঁড়ালেন, এসআইআর ইস্যুতে কেন্দ্র এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকায় বিরক্ত হয়ে। তার মধ্যে যেমন রয়েছেন বয়স্ক ভোটার, যাঁরা বিরক্ত, তেমনই রইলেন ফার্স্ট টাইম ভোটাররাও। অনেকেই লাইনে দাঁড়ালেন ধর্মীয় বিভাজন, জয় শ্রী রাম স্লোগান, গেরুয়া তিলকের স্পষ্ট বিরোধিতা। অন্যদিকে ভোট যে একবারেই স্থিতাবস্থার বিরোধিতায় নয়। তেমনটাও বলা যায় না।
কারণ হিসেবে অবশ্যই থাকবে দুর্নীতির অভিযোগ, নেতা-মন্ত্রীদের হাজতবাস ইত্যাদি, প্রভৃতি। কিন্তু প্রথমদফার মধ্যে যদি একবার জঙ্গলমহলের দিকে তাকানো যায়, তাহলে শুধু একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। বিনপুর, ঝাড়গ্রাম, নয়াগ্রামের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কিছু কথা তাহলে বলতেই হচ্ছে। ঝাড়গ্রামে ২০২১ সালে মোট ভোটার ছিলেন ২৩৬০৩৫, ভোট দিয়েছিলেন ২০২২০৬। ২০২৬ সালে মোট ভোটার ২৩৫১৪৭। কারণ ওই জায়গাগুলিতে এসআইআর প্রভাব ফেলতে পারেনি সেভাবে। ওই ঝাড়গ্রামে এবার ভোট পড়ল ২১৭৫৮২। অর্থাৎ হিসেব বলছে সেখানে ভোট বেশি পড়ল ১৫৩৭৬। ওই প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে, সাত গাঁ ঘুরে, মাঠের আলের মাঝখান দিয়ে কলসি কাঁখে নিয়ে হেঁটে যাওয়া মহিলার পাশে হেঁটে গিয়েছি। হেঁটে গিয়েছি নন্দীগ্রামের মতো শুভেন্দুর দাপটের জেলাতেও। রাজ্যের প্রত্যন্ত ওই জায়গাগুলিতে লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী পাওয়া ভোটাররা কিন্তু আস্থা রাখছেন মমতা ম্যাজিকেই। তাঁদের কাছে ওই মাস গেলে পাওয়া টাকা, শহুরে বহু রাজনীতি সচেতন মানুষ যেটিকে 'ভিক্ষে' বলে দাগিয়ে দিয়ে নিজেরা সংসদীয় রাজনীতিতে ঢুকে পড়ে বুলি আওড়ান, তাঁদের ধারণা কখনওই ভাদুই, বালিজুড়ি কিংবা সোনাচূড়ার বাজার ছাড়িয়ে গলিপথ দিয়ে নেমে যায় না। কিন্তু তাঁরা উঠে আসেন, দাঁড়ান ভোটের লাইনে। তাঁরা ভোট দেন, মাস গেলে যে টাকা পান, সেই টাকায় ছেলের টিউশন মাস্টারের বেতন দেবেন বলেই।












