উদ্দালক

 

‘আশা নিয়ে ঘর করি
আশায় পকেট ভ’রি
প’ড়ে গেছে কোন্ ফাঁকে চেনা আধুলি
হিসেব মেলানো ভার
আয়-ব্যয় একাকার
চ’লে গেল সারাদিন এল গোধূলি’

-- কবীর সুমন

বড় কঠিন সময়ে আমাদের বসবাস। আমাদের চারিদিকে হাঁ-মুখ দৌড়। সেখানে কোথাও-কোথাও উপচে পড়া চাহিদা আর চাহিদা। কেন, কেন করে ঘুরে ফিরে বৃত্তের এক বিন্দুতে এসে দাঁড়ানো রোজ। গুমরে মরা। এক টুকরো মুক্তির জন্য হাঁসফাঁস করা আর চেয়ে থাকা অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের দিকে, যেখানে বুঝি আছে কোনও এক দিন, যেদিন চোখ খুললেই মনে হবে ‘বাঁচতে চাই’। মনে হবে, মায়ের কথা, বাবার কথা, ফুলপিসির কথা বা সেই প্রেমিকার কথা যার সঙ্গে কোনওদিন কথাই হয়নি। শরতের ভোরে শিশিরভেজা মাটিতে এলিয়ে থাকা শিউলির মতো ফুরফুরে থাকবে মাথা থেকে মন। কিন্তু সেদিন কবে আসবে? সেই আশার মৃত্যু দেখতে দেখতেও আমরা ভাবব, সেই দিন আসবে, এই তো কয়েক পা, তারপর একটা দিন আসবে। বাঁচতে হবে তো আমাদের। 

বাকসাড়া মাটি নিবেদিত ও আইডেন্টিটি ক্রাইসিস প্রযোজিত নাটক ‘গিরিচিত্ত’ দেখতে দেখতে মনে হল এমনই সব এলোমেলো কথা। মনে হল সন্দীপনের গদ্য বা উৎপলকুমারের কাব্যের ভাবনা কেমন করে যেন গেঁথে বসে গিয়েছে বাঙালি চিত্তে। সে তো এমনই। তার মন খারাপ আর ‘থ্রিল’ বারবার মিশে যায় প্রকৃতির সঙ্গে, বারবার মিশে যায় উল্টো দিকের পাহাড়ের মিটমিটে আলো, মেঘ আর কুয়াশার সঙ্গে, চা-বাগানের একাকীত্বের সঙ্গে, মিশকালো অন্ধকারের সঙ্গে, একলা বিকেলে হ্যারিকেন আলোয় মেশা যুবকের একাকীত্বের সঙ্গে। বেশ কয়েকদিন আগে, দমদমের থিয়েপেক্সে এই নাটকটি মঞ্চস্থ হল। মন খারাপের হালকা আলো পড়ে রইল মঞ্চ জুড়ে। আর মঞ্চ জুড়ে রইলেন অভিনেতা রাজরাখাল। গরমের সন্ধ্যায় দর্শক পৌঁছে গেলেন পাহাড়ি মনখারাপের সন্ধ্যালোকে। 

রাজরাখাল বড় আরামদায়ক অভিনেতা। তিনি অভিনয় করেন যখন, তখন প্রাণে শান্তি আসে। যাই-যাই গরমের পর যখন প্রথম উত্তুরে হাওয়া দোল দিয়ে যায় গাছের পাতায়, জানলার পর্দা ঠেলে সে হাওয়া যখন এসে গায়ে লাগে, তখন যেমন আরাম লাগে, তেমনই আরাম লাগে রাজরাখালের অভিনয় দেখলে। এই নাটকেও রাজরাখাল তেমনই নরম অভিনেতা। কিন্তু সেই অভিনয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নানারকম স্তর। আসলে গল্পের চলন চরিত্রকে এক সামান্য, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে নিয়ে এসে ফেলে কঠিন, জ্বলন্ত আগুনের কুণ্ডের সামনে। অভিনয়ও তাই চলতে থাকে তেমনই ধারায়। এই যাত্রাকে শরীরে অনায়াসে ধরে রাখেন রাজরাখাল। আগাগোড়া ধীর, স্থির ও গভীর অভিনয়ে তাঁকে মনে হয় জীবন্ত। আসলে নন-প্রসেনিয়াম, ছোট স্পেসের থিয়েটারের যেমন সুবিধা আছে, তেমনই অসুবিধাও আছে। আর সেই অসুবিধার সামনে দাঁড়াতে হয় একজন অভিনেতাকে। কারণ, তাঁর হাড়-মজ্জা, চোখের পাতা সামনে থেকে, খুব কাছ থেকে দেখতে পান দর্শকরা। তাই ফাঁকির জায়গা নেই। অভিনেতাকে সেই লড়াইয়ে লড়তে হয়। রাজরাখাল সেই যুদ্ধে জয়ী।
    
নাটক ও সৃজনের কাজ করেছেন অভ্র দাশগুপ্ত। অভ্রর লেখায় যে মায়া ‘রহিয়া’ যায়, রাজরাখাল অভিনয়ে সেই মায়াকে বয়ে নিয়ে চলেন। অভ্র আসলে সম্পর্ক ও থ্রিলারের আড়ালে গড়তে চেয়েছেন এক এককী মায়ার গল্প, নির্জন মানুষের গল্প। সেই একাকী মানুষের সঙ্গে অজান্তেই যেন ঢুকে পড়েছে একা দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের একাকীত্বের তুলনা। যেন সমস্ত দেখেও চুপ করে থাকা পাহাড়ের মতো চরিত্রকে তিনি ধরেছেন লেখায়। নাটকের সংলাপে-সংলাপে ধরা আছে সেই মায়া, সম্পর্কের নির্ভেজাল আদত মানুষগুলো। নাটকের নির্মাণে তিনি ব্যবহার করেছেন খুব স্বল্প আলো। আবছা-অন্ধকারও এখানে এসেছে আলোর অংশ হয়ে। আলোকশিল্পের ছাত্রদের পড়তে হয়, কীভাবে ব্যবহার করা যায় অন্ধকারকে। অন্ধকারকে ব্যবহার করাও একরকমের আলোকে ব্যবহার করা। পাহাড়ের সেই আবছা-আলো অন্ধকারকে তিনি তুলে এনেছেন অভিনয়ে। খোলা জানালা দিয়ে পাহাড়ি হাওয়ার অনুষঙ্গ আর অল্প-অল্প জ্বলে ওঠা আলোয় আধো-অন্ধকারে দেখতে পাওয়া এক যুবকের আবছা জীবনের আঁতের কথা, অভ্র নিপুন, তাই তা এঁকেছেন শিল্পীর দক্ষতায়। 

এই নাটকের আবহ প্রক্ষেপণ করেছেন মৌমিতা দত্ত। আলোক প্রক্ষেপণের কাজ করেছেন অলোক দে। নির্মাতার নির্দেশ তাঁরা আশা করি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন, কারণ, কোথাও তাঁদের প্রক্ষেপে মনে হয়নি মূল কথাটা সরে যাচ্ছে গৎ থেকে। নাটক যখন ধীরে ধীরে আলাপ ছেড়ে বিস্তারে পৌঁছয় সঙ্গে-সঙ্গে আলো আর সঙ্গীতও সেদিকেই চলতে থাকে নির্বাক সঙ্গী হয়ে, কোথাও তাঁদের বাড়বাড়ন্ত নেই, আছে নিবিড়, শান্ত হয়ে থাকা, অনেকটা লোডশেডিংয়ের রাতে চাঁদের আলোর মতো। 

আসলে কোথাও কোথাও আমাদের দাঁড়াতে হয় একলা। নিজেদের সমস্ত পাশবিকতাকে শান্ত করে, দাঁড়াতে হয় খোলা জানলার সামনে। যেখানে দূর থেকে উড়ে আসে হাওয়া, উড়ে আসে অনিশ্চিন্ত কোনও উত্তুরে বাতাস, অস্থির লাগে, কিন্তু কেন অস্থির লাগে, তা বোঝার উপায় থাকে না। গিরিচিত্ত সেই অস্থিরতার মূলে ঘড়ির কাঁটার মতো টিক-টিক শব্দে চলতে থাকে অজান্তে। সে আপনাকে অস্বস্তি দেয় এত মৃদু যে, তার অনুনাদ ছড়িয়ে পড়ে পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত।

 

&list=PLPUDe3o_aeFe18_P3rREaq8Tt-MempCAX&index=1