আশিস ঘোষ
বিটুইন দ্য লাইনস। ইংরেজিতে একটা চালু কথা। অর্থাৎ যা বলা হল তার অধিক যা বলতে চাওয়া হল, সেই কথাগুলো। দুই লাইনের ফাঁকের সাদা জায়গাটা। এখানে এখন ভোটের পার্বণ। ঘন ঘন দিল্লি থেকে আসছেন হেভিওয়েট নেতারা। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও যত্রতত্র বক্তৃতা করে বেড়াচ্ছেন। তিনি যা বলছেন, আর পাঁচটা গরম ইস্যুতে সেসবই ঢাকা পড়ছে। সেসব কথার ফাঁকে হারিয়ে যাচ্ছে আরও কিছু কথা। ওই যে বলছিলাম বিটুইন দ্য লাইনসের কথা।
অনুপ্রবেশ, ঘুষপেটিয়া এবারের ভোটের থিম। যা কিছু বক্তিমে তার বেশিটাই গোড়া থেকে ছিল এইসব নিয়েই। অনুপ্রবেশের জন্য কীভাবে বাংলার ডেমোগ্রাফি বা জনবিন্যাস পাল্টে গিয়েছে তা নিয়ে বিজেপি নেতাদের উদ্বেগের শেষ নেই। খোদ প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সভায় সভায় এ নিয়ে ভাষণ দিচ্ছেন। অনুপ্রবেশকারীরা যে ওপারের মুসলিম খোলাখুলি তা না বললেও বুঝতে অসুবিধে হয় না মোটেই। এ পর্যন্ত একরকম ছিল। কিন্তু পুরুলিয়া জনসভায় মোদি জানিয়েছেন, অনুপ্রবেশের জন্য বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসছে।
এটাই বিটুইন দ্য লাইনস। এটাই সংঘ পরিবারের পরবর্তী অ্যাজেন্ডা। বাংলা ভাষাকে কীভাবে উর্দু, আরবি শব্দমুক্ত করে সংস্কৃত শব্দে শুদ্ধ করে ফেলতে হবে তা নিয়ে জোরদার প্রচার। ফলে আগে যেমন খোলাখুলি মুসলমানি বাংলাকে গাল পাড়া হত, তা না করে চালু করার চেষ্টা হল বাংলাদেশি ভাষা বলে বাংলা ভাষাকে আলাদা করার।
মনে করে দেখুন মাস কয়েক আগের ঘটনা। দিল্লির বঙ্গভবনে চিঠি পাঠিয়ে সেখানকার পুলিশ বাংলাদেশি ভাষা জানা কারও সন্ধান করেছিল। তখন সেখানে ঢালাও 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী' উচ্ছেদ অভিযান চলছিল। তা নিয়ে তখন বিস্তর হই হট্টগোল হয়েছিল। একে পুলিশি অজ্ঞতা বলে উড়িয়েও দিয়েছিলেন কেউ কেউ। কিন্তু ব্যাপারটা যে মোটেই অত হালকা নয় তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বিজেপির নেতা অমিত মালবিয়া। তিনি রীতিমতো ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, বাংলাদেশে যে বাংলার ব্যবহার তা অন্যরকন। তাই বাংলাদেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দিল্লির অবাঙালি নেতারা বাংলা নিয়ে লেকচার দিলেও বঙ্গ বিজেপির কেউ তখন কিছু বলেননি।
জন্মাবধি যাঁরা বাংলায় কথা বলে আসছেন তাঁদের পক্ষে এমন বিচিত্র যুক্তি হজম করা বেশ কঠিন। কে না জানে প্রমিত বা শান্তিপুরী বাংলা ছাড়াও শুধু ওপার কেন, এপারেও কতরকম বাংলায় কথা বলা হয়। প্রতি ক্রোশে কীভাবে কথ্য বাংলা বদলায় কোনও ধারণা আছে তাঁদের যাঁরা এইসব তত্ত্ব খাড়া করেন?
সত্যি বলতে এতকিছু জানার দরকার হয় না তাঁদের। মোদ্দা কথা হল, ভাষায় হিন্দু মুসলমান ভাগ করে দাও। সংস্কৃত, তৎসম শব্দে বোঝাই সেকেলে সাধু ভাষাকে ফিরিয়ে আনো। ওটা হিন্দুদের। আর ম্লেচ্ছ শব্দে ভরা 'বাংলাদেশি' ভাষা আলাদা করে দাও মুসলমানদের জন্য। অনুপ্রবেশের ফলে বাঙালির ভাষা সংস্কৃতি বদলে যাচ্ছে বলে মোদির হা হুতাশের পিছনে মোদ্দা কথা ওটাই। এতদিনের জমি দখল হচ্ছে বলে হুঙ্কারের পাশাপাশি এবার ভাষাদখল হচ্ছে বলে নতুন ন্যারেটিভ আমদানি হবে। ওপারেও সংস্কৃতবর্জিত বাংলা নিয়ে জামাতের তৎপরতা মাঝেমধ্যে দেখা যায় বই কি। তবে আশার কথা, দুই বাংলাতেই এইসব উদ্যোগ হালে পানি পায়নি।














