আজকাল ওয়েবডেস্ক: ডায়মন্ড হারবারে বিজেপির বিজয় উৎসব ঘিরে রক্তাক্ত সংঘর্ষের অভিযোগ উঠল। বাসুলডাঙা অঞ্চল ও মাথুর অঞ্চলে পৃথক দুটি ঘটনায় বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের উপর হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে। ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৩ জন বিজেপি কর্মী-সমর্থক। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় কলকাতায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। বিজেপির অভিযোগ, তৃণমূল থেকে আগত নব্য বিজেপি কর্মীরাই হামলা চালিয়েছে। যদিও তৃণমূলের দাবি, এটি বিজেপির নিজেদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফল, এর সঙ্গে তৃণমূলের কোনও যোগ নেই।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার রাতে ডায়মন্ড হারবারের বাসুলডাঙা অঞ্চল এবং মাথুর অঞ্চলে বিজেপির পক্ষ থেকে বিজয় উৎসবের আয়োজন করা হয়। রাজ্যজুড়ে দলের অভূতপূর্ব সাফল্য উদযাপন করতে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে প্রীতিভোজেরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দুই এলাকাতেই বিজেপির বহু কর্মী-সমর্থক জমায়েত হয়েছিলেন। অভিযোগ, অনুষ্ঠান চলাকালীন আচমকাই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিজেপির একাংশের দাবি, সম্প্রতি তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া কয়েকজন কর্মী আচমকাই আদি বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়ে। সেই বচসা ক্রমেই হাতাহাতি ও মারধরের ঘটনায় পরিণত হয়।

অভিযোগ, হামলাকারীরা লাঠি, বাঁশ ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে বিজেপি কর্মীদের উপর চড়াও হয়। এলোপাথাড়ি মারধরের জেরে একাধিক কর্মী গুরুতর জখম হন। রাস্তায় ফেলে মারধরের অভিযোগও উঠেছে। ঘটনাস্থলে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান। পরে বেশ কয়েকজনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁদের ডায়মন্ড হারবার জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, আহত ১৩ জনের মধ্যে অধিকাংশকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে দু’জন বিজেপি কর্মীর আঘাত গুরুতর হওয়ায় তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য কলকাতার হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। এছাড়া আরও তিনজন এখনও ডায়মন্ড হারবার জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।

সোমবার সকালে আহত বিজেপি কর্মীদের দেখতে হাসপাতালে যান ডায়মন্ড হারবার বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী দীপক কুমার হালদার। আহত কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও দেখা করেন। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে তিনি এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং পুলিশ প্রশাসনের কাছে অবিলম্বে দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

দীপক কুমার হালদার অভিযোগ করে বলেন, “দিকে দিকে তৃণমূল থেকে হঠাৎ বিজেপিতে আসা কিছু লোকজন বিজেপির সংগঠনের ভিতর অশান্তি তৈরি করছে। তারাই বিজেপির প্রকৃত কর্মীদের উপর হামলা চালাচ্ছে। এই ধরনের ঘটনা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিতে পুলিশ প্রশাসনকে জানিয়েছি। অবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।”

তিনি আরও দাবি করেন, এই হামলা পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে এবং এর পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। দলের পুরনো কর্মীদের ভয় দেখিয়ে সংগঠনের ভিত নষ্ট করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি। আহত কর্মীদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন বিজেপি নেতৃত্ব।
অন্যদিকে, আহত বিজেপি কর্মী সুবল মণ্ডল ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “গতকাল আমাদের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন ছিল। সবাই মিলে বিজয় উৎসব করছিলাম। হঠাৎ কয়েকজন এসে আমাদের উপর হামলা চালায়। ওরা আগে তৃণমূল কংগ্রেস করত, এখন বিজেপি করছে বলে দাবি করছে। কিন্তু তারাই আমাদের মারধর করেছে। রাস্তায় ফেলে বাঁশ দিয়ে মারা হয়েছে। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের উপর হামলা শুরু হয়।”

তাঁর অভিযোগ, হামলাকারীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে এসেছিল এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। রাতভর উত্তেজনা বজায় ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে খবর। যদিও বিজেপির সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল বিধায়ক পান্নালাল হালদার বলেন, “এই ঘটনার সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের কোনও সম্পর্ক নেই। বিজেপির নিজেদের গোষ্ঠীকোন্দলের কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে। এখন রাজনৈতিকভাবে তৃণমূলকে দোষারোপ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করুক, যারা দোষী তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”

তিনি আরও বলেন, “তৃণমূল কংগ্রেস কোনও হিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। এলাকায় শান্তি বজায় রাখাই আমাদের লক্ষ্য। পুলিশ ঘটনার তদন্ত করছে, সত্য সামনে আসবে।” পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার পর ইতিমধ্যেই একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি শুরু হয়েছে। এলাকায় যাতে নতুন করে উত্তেজনা না ছড়ায়, তার জন্য পুলিশি নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। আক্রান্তদের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

ডায়মন্ড হারবারের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকায় এই ঘটনা নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়েছে। বিজেপির অভিযোগ ও তৃণমূলের পাল্টা দাবি ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। তবে এই ঘটনার প্রকৃত কারণ কী, তা জানতে এখন পুলিশের তদন্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষ।