আজকাল ওয়েবডেস্ক: বইয়ের লাইব্রেরি তো অনেক দেখেছেন। বইয়ের পাতায় পাতায় লেখা থাকে গল্প, কবিতা, ইতিহাস আরও কত কী। কিন্তু এমন লাইব্রেরির কথা কখনও শুনেছেন কি, মানুষ নিজেই হয়ে ওঠেন বই? শোনান নিজের জীবনের গল্প? অদ্ভুত শোনালেও ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহরে গড়ে উঠেছে এক অভিনব উদ্যোগ। নাম তার হিউম্যান লাইব্রেরি।
২০০০ সালে ডেনমার্কের সমাজকর্মী রননি অ্যাবারজেল এই লাইব্রেরির সূচনা করেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, বৈষম্য, ভুল ধারণা আর সংস্কারকে দূরে রেখে মানুষ হয়ে মানুষের সঙ্গে মেশা, জানা, তাঁদের জীবন, তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা শোনা। অ্যাবারজেলের মতে, “মানুষের ভেতরের গল্পগুলো যদি অন্যের কাছে পৌঁছয়, তাহলে সমাজে বোঝাপড়া আর সহানুভূতি বাড়ে।”

আরও পড়ুন: ২৬৪৫ লিটার স্তন্য উৎপন্ন হয় বধূর শরীরে! 'রোজ রাতে ৩ ঘণ্টা..' বিপুল দুগ্ধ উৎপাদনের রহস্য ফাঁস করলেন নিজেই
আরও পড়ুন: ১২ জন স্ত্রী! বাচ্চা করাই নেশা! ১০২ সন্তানের বাবা হয়ে অবশেষে থামলেন ৬৮-র মুসা, কেন ক্ষান্ত দিলেন? কী বললেন এ যুগের ধৃতরাষ্ট্র?

কী এই হিউম্যান লাইব্রেরি?
এখানে লাইব্রেরির আলমারিতে বই থাকে না। থাকে ‘বই’ সেজে আসা মানুষজন। লাইব্রেরির দরজা সকলের জন্য খোলা। যে কেউ এখানে এসে শুনতে ও শোনাতে পারেন জীবনের কথা। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থী হতে পারেন, তিনি যৌন সংখ্যালঘু হতে পারেন, হতে পারেন এডস আক্রান্ত ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী কিংবা প্রাক্তন আসামী। সমাজ যাঁদের ‘বিচ্ছিন্ন’, ‘ভিন্ন’ কিংবা ‘বিপজ্জনক’ বলে এড়িয়ে চলে, তাঁরাই এখানে হয়ে ওঠেন ‘ওপেন বুক’।
এই মানুষগুলিকে ‘ইস্যু’ করেন পাঠকরা, ৩০ মিনিটের জন্য। কোনও নির্দিষ্ট জায়গায় বসে দু’জন মানুষের মুখোমুখি কথোপকথন, জীবনের উথাল-পাথাল, যন্ত্রণা, সংগ্রাম, পরিচিতির ভাঙন, সব উঠে আসে সেই কথোপকথনে। পাঠকের উদ্দেশ্য শোনা, প্রশ্ন করা, এবং বোঝা।

কেন এই উদ্যোগ জরুরি?
সমাজে এমন বহু মানুষ আছেন যাঁদের নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি হয়, কখনও ধর্মের নামে, কখনও লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে, কখনও বা কোনও মানসিক রোগের ইতিহাসের জন্য। এই লাইব্রেরি সেই সমস্ত পরিচিতি মুছে দিতে চায়। রননির কথায়, “আমরা চাই মানুষ জানতে পারুক, কেউ কেন এমন হয়ে গেল, সে কীভাবে বাঁচে, কী ভাবনা তাকে চালিত করে।” এই লাইব্রেরির স্লোগানই তাই—“ডোন্ট জাজ আ বুক বাই ইটস কভার”, অর্থাৎ, বাইরের চেহারায় নয়, মানুষকে বুঝুন তাঁর আত্মপরিচিতিতে।
সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে এই ধারণা
ডেনমার্কে শুরু হলেও হিউম্যান লাইব্রেরির এই মডেল ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের ৮৫টিরও বেশি দেশে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, হাঙ্গেরি, ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া, এমনকী ভারতেও গড়ে উঠেছে এমন লাইব্রেরি। ভারতে এই ধারণা প্রথম চালু হয়েছিল হায়দরাবাদে ২০১৬ সালে। এরপর দিল্লি, বেঙ্গালুরু, চেন্নাইয়েও একইরকম উদ্যোগ দেখা গিয়েছে।

শেষ কথা
এই ব্যতিক্রমী লাইব্রেরি মনে করিয়ে দেয়, মানুষের অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে বড় শিক্ষক। বইয়ের পাতার বাইরেও যে জীবনকে পড়া যায়, জানা যায়, বোঝা যায়, হিউম্যান লাইব্রেরি যেন তারই পাঠশালা। যখন চারপাশে বিভাজনের দেয়াল ক্রমশ পুরু হয়ে উঠছে, তখন এমন এক প্ল্যাটফর্ম সমাজকে শেখায় প্রতিটি মানুষই এক-একটি ‘বই’। পড়লে তবেই বোঝা যায় ভিতরের সত্যিটা।