তাঁর হোয়াটসঅ্যাপের ডিসপ্লে পিকচারে রয়েছে তুড়ি মারার ছবি। তার সঙ্গে লেখা, ''লাইফ ক্যান চেঞ্জ জাস্ট লাইক দ্যাট।'' নিমেষের মধ্যে বদলে যায় জীবন। খেলোয়াড় জীবনে তাঁর ব্যাট নিমেষে খেলার রং বদলে দিত। আজকের টি-টোয়েন্টি জমানায় তিনি যদি ব্যাট হাতে বাইশ গজে দাঁড়াতেন, তাহলে থরহরি কম্পমান অবস্থা হত বোলারদের। ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ধ্বংসাত্মক ওপেনার। হয়ে গেলেন আইনের ডিগ্রিধারী। পাখির চোখ বার্বাডোজ ক্রিকেট সংস্থার সভাপতি হওয়া। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রাক্তন ওপেনার ফিলো ওয়ালেস অকপট তাঁর ক্রিকেট জীবন নিয়ে। স্মৃতির পাতা ওলটালেন ওয়ালেস। শুনলেন কৃশানু মজুমদার।
একটা মজার কথা বলি। অনেকেই কিংবদন্তি বোলার কোর্টনি ওয়ালশের সঙ্গে আপনার নাম গুলিয়ে ফেলতেন। তাঁরা বলতেন, 'কোর্টনি ওয়ালশ, ফিলো ওয়ালশ।'
ফিলো ওয়ালেস: (হাসি) ফিলো আসলে গ্রীক শব্দ। এর অর্থ বন্ধুত্বপূর্ণ। আমার নাম ফিলো ওয়ালেস। ওয়ালশ নয়।
আপনার কথা ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীরা দীর্ঘদিন মনে রাখবেন। ১৯৯৮ আইসিসি নক আউট ট্রফির সেমিফাইনালে ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ মুখোমুখি। ২৪৩ রান তাড়া করছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আপনি জাভাগল শ্রীনাথকে প্রথম বলেই সপাটে ছক্কা মেরে বসলেন। ওই দৃশ্য এখনও সবার মনে আছে।

ফিলো ওয়ালেস: ১৯৯৮ সালের আইসিসি নক আউট টুর্নামেন্টে আমি দারুণ সফল ছিলাম। সেই সময় ফর্ম ছিল দুর্দান্ত। টুর্নামেন্ট জুড়ে বিস্ফোরক ব্যাটিং করেছিলাম। সেবারের টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ রান (২২১) ছিল আমার। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার ফাইনালে হয়েছিল। ফাইনালে আমি ১০৩ রান করেছিলাম। আমার দুর্ভাগ্য গোটা টুর্নামেন্ট জুড়ে ভাল খেলেও ফাইনাল জেতাতে পারিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। দক্ষিণ আফ্রিকা সেবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
ভারতের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে ৩৯ রান করেছিলাম। জাভাগল শ্রীনাথ অফ স্ট্যাম্পের উপর লেন্থ ডেলিভারি করেছিল। আমি লং অফের উপর দিয়ে ছক্কা মেরেছিলাম। একজন ব্যাটসম্যান যখন দারুণ ছন্দে থাকে তখন তাঁকে শান্ত করে রাখা কঠিন।
আপনার সময়ে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট ছিল না। ছিল না আইপিএল। আজকের যুগে আপনি যদি খেলতেন, তাহলে তো সুপারহিট হয়ে যেতেন।
ফিলো ওয়ালেস- শুনে খুব ভাল লাগছে। আমার আক্রমণাত্মক ব্যাটিং স্টাইল আমার বড় সম্পদ ছিল। শুরু থেকে আগ্রাসী ব্যাটিং করতে ভয় পেতাম না। অনেক বিশেষজ্ঞ আমার আগ্রাসী ব্যাটিং নিয়ে প্রশংসাও করেছেন।
১৯৯৮ সালের আইসিসি নক আউট ট্রফিতে এত ভাল আপনি ব্যাটিং করলেন। অথচ দলকে জেতাতে পারলেন না। এই হতাশা চিরকাল বহন করতে হবে আপনাকে।
ফিলো ওয়ালেস-পিছনের দিকে তাকালে মনে হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ যদি আরও ৫০ রান করতো, তাহলে আমরা ১৯৯৮ সালের আইসিসি টুর্নামেন্ট জিততে পারতাম। সেবার আমরা ২৪৫ রানে আউট হয়ে যাই। আমি সেঞ্চুরি করেছিলাম।
এই অতিরিক্ত আগ্রাসী ব্যাটিংই কি আপনার ক্ষতি ডেকে আনল? দলে আর জায়গা হল না। ছিটকে গেলেন দল থেকে।
ফিলো ওয়ালেস- আমার মনে হয় না ব্যাটিং স্টাইলের জন্য আমাকে ছিটকে যেতে হয়েছে। সেই সময়ে নির্বাচকরা এখনকার মতো ছিলেন না। তাঁরা অত্যন্ত কঠিন ছিলেন। এখনকার নির্বাচকরা আগের মতো কঠিন নন।

একসময়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনেকেই মনে করতেন, সুযোগ দেওয়া হলে আপনি এবং ক্লেটন ল্যাম্বার্ট কিংবদন্তি দুই ওপেনার গর্ডন গ্রিনিজ ও ডেসমন্ড হেইন্সের শূন্যস্থান পূরণ করতে পারবেন।
ফিলো ওয়ালেস- ক্লেটন এবং আমি প্রতিভা প্রদর্শনের সেভাবে সুযোগ আর পেলাম কোথায়?
ক্রিকেটার থেকে আপনি হয়ে গেলেন আইন পড়ুয়া। আইনের ডিগ্রিও জুটল। হঠাৎ আইন পড়ার দিকে ঝুঁকলেন কেন?
ফিলো ওয়ালেস- ক্রিকেটের পর জীবন কী হবে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আমি ১১ বছর ধরে কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স এবং ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অফিসে কাজ করেছি। ত্রিনিদাদ-টোবাগোয় আইন নিয়ে পড়াশোনা করার সিদ্ধান্ত নিই। ত্রিনিদাদের কলেজ অফ লিগ্যাল স্টাডিজ থেকে আইন ডিগ্রি অর্জন করি। এলএলবি করার পরে ওয়েস্টমিনস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন অনুশীলন সার্টিফিকেট করার জন্য ইংল্যান্ডে যাই। ১২ আগস্ট বার্বাডোজ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএ)-এর সভাপতি হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব। আমার উদ্দেশ্য একটাই। বার্বাডোজ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হওয়া এবং বার্বাডোজ ক্রিকেটকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করা। সেই সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটের উন্নতিতে অবদান রাখা।

এই টি-টোয়েন্টি, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের জমানায় টেস্ট ক্রিকেট কি গুরুত্ব হারাচ্ছে বলে মনে করেন?
ফিলো ওয়ালেস-টেস্ট ক্রিকেটই শেষ কথা। এখনও পাঁচ দিনের ফরম্যাট বাকি ফরম্যাটের থেকে বহু এগিয়ে থাকবে। তরুণ ক্রিকেটারদের টেস্ট খেলতে উৎসাহিত করা উচিত। তাঁদের স্কিল, দক্ষতা উন্নত করা দরকার। এর পরে সব ফরম্যাটে খেলার জন্য সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা উচিত।
ধরুন বুমরাহর বিরুদ্ধে ওপেন করতে নামতে হবে আপনাকে। কীভাবে সামলাতেন বুমরাহকে? শুরু থেকেই কি আগ্রাসী ব্যাটিং শুরু করে দিতেন?
ফিলো ওয়ালেস-বুমরাহর মতো একজন চ্যাম্পিয়ন বোলারের বিরুদ্ধে ব্যাট করতে হলে ভাল ব্যাটিং দক্ষতা এবং ধৈর্যের প্রয়োজন। খুব বেশি ঝুঁকিপূর্ণ শট খেললে চলবে না। কারণ বুমরাহ বলকে উইকেটের দুই প্রান্তে বেশ ভাল গতিতে সুইং করাতে পারে। বুমরাহর বাউন্সার বিপজ্জনক।
এই প্রজন্মের অন্যতম সেরা ব্যাট বিরাট কোহলিকে নিয়ে কী বলবেন?
ফিলো ওয়ালেস- বিরাট চ্যাম্পিয়ন ব্যাটার। ওঁর বিরুদ্ধে পরিকল্পনা করে নামতে হবে। বিপক্ষ দলের অধিনায়ক হিসেবে বোলারদের পরামর্শ দিতে হবে, লাইন, লেন্থ এবং গতির ক্ষেত্রে ধারাবাহিক হও। উইকেটের একপাশে বল করার জন্য বোলারদের টিপস দেওয়ার দরকার।
