যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে রান্নার গ্যাস বা এলপিজি সরবরাহে সমস্যা সবচেয়ে আগে সামনে এসেছে। দেশের বহু জায়গায় গ্যাস এজেন্সির সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে, অনেক পরিবার রিফিল পেতে কয়েকদিন অপেক্ষা করছে। এমনকি অনেক রেস্তোরাঁ ও ধাবাও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
2
10
এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজে জাহাজ চলাচলের বিঘ্ন। সাম্প্রতিক ইরান-ইজরায়েলকে ঘিরে সংঘাত এবং পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের ফলে সমুদ্রপথে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। আর সেই প্রভাব পড়েছে ভারতের জ্বালানি আমদানির ওপরও।
3
10
তবে প্রশ্ন উঠছে—যদি একই অঞ্চলের ওপর নির্ভর করে ভারত, তাহলে কেন এলপিজি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলেও পেট্রোল ও ডিজেলের ক্ষেত্রে তা এখনও তেমনভাবে দেখা যাচ্ছে না?
4
10
সরকারের বক্তব্য, দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক। এলপিজির ক্ষেত্রেও সরকার দাবি করেছে যে গৃহস্থালির ব্যবহারের জন্য সরবরাহে কোনও ঘাটতি নেই। কিন্তু বাস্তবে ৯ মার্চ থেকে গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে আতঙ্ক বাড়তে থাকে এবং ১২ মার্চের পর কিছু জায়গায় পেট্রোল পাম্প ও সিএনজি স্টেশনেও সীমিত সংখ্যক লাইন দেখা যায়।
5
10
কেন্দ্র সরকার এই পরিস্থিতিকে আতঙ্ক বলে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ আতঙ্কে বেশি বুকিংয়ের কারণেই সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। তবে গৃহস্থালির গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দিতে বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। এর ফলে অনেক রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে এবং কালোবাজারে সিলিন্ডারের দামও বেড়ে গেছে।
6
10
ভারতে প্রতি বছর ৩১ মিলিয়ন টনেরও বেশি এলপিজি ব্যবহার হয়। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সেই চাহিদার অর্ধেকেরও কম পূরণ করতে পারে। ফলে বাকি অংশ আমদানি করতে হয় মূলত উপসাগরীয় দেশগুলি—যেমন সৌদি আরব, কাতার, আরব এবং কুয়েত থেকে। এই এলপিজি বহনকারী জাহাজগুলোর অধিকাংশকেই হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে ভারতে পৌঁছাতে হয়। অনুমান করা হয়, ভারতের দিকে আসা প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ এলপিজি কার্গো এই পথ দিয়েই আসে।
7
10
অন্যদিকে পেট্রোল ও ডিজেলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। ভারত ৪০টিরও বেশি দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ভারতের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে, এরপর রয়েছে ইরাক ও সৌদি আরব। রাশিয়া থেকে আসা তেলের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে না।
8
10
কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী জানিয়েছেন, বর্তমানে ভারতের প্রায় ৭০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি এমন উৎস থেকে আসে যা হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল নয়।
9
10
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে মজুত ব্যবস্থায়। ভারত জরুরি পরিস্থিতির জন্য অপরিশোধিত তেলের কৌশলগত মজুত রাখে। এই মজুত রয়েছে বিশাখাপত্তনম, ম্যাঙ্গালোর এবং পোদুরের ভূগর্ভস্থ শিলা গুহায়। এগুলো কয়েক সপ্তাহের চাহিদা পূরণ করতে পারে।
10
10
কিন্তু এলপিজির ক্ষেত্রে এমন বড় কৌশলগত মজুত নেই। আন্তর্জাতিক এনার্জি এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ভারতের এলপিজি সংরক্ষণ ক্ষমতা মাত্র ১.৪ লক্ষ টন, যা দেশের মোট চাহিদার দুই দিনেরও কম। ফলে হরমুজ প্রণালীতে পরিবহন ব্যাহত হওয়ার ধাক্কা সবচেয়ে আগে এসে পড়েছে ভারতের রান্নাঘরে। পেট্রোল পাম্পে তার প্রভাব এখনও তেমনভাবে না পড়লেও এলপিজি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।