আজকাল ওয়েবডেস্ক: ডার্বির আগের দিন থেকেই চিত্র বদলে গিয়েছে। মহারণের ২৪ ঘণ্টা আগে নির্দ্বিধায়, নির্বিঘ্নে পাশাপাশি মাঠে প্র্যাকটিস করে ইস্ট-মোহন। বৃহস্পতিবারের খেতাব নির্ণায়ক ম্যাচের আগেও তেমনই চিত্র দুই প্রধানে। এক নম্বর প্র্যাকটিস গ্রাউন্ডে অনুশীলন করে ইস্টবেঙ্গল। পাশের, অর্থাৎ দ্বিতীয় গ্রাউন্ডে মোহনবাগান। দুই দলের অনুশীলনের সময় বিকেল সাড়ে চারটে থাকলেও, দলবল নিয়ে সার্জিও লোবেরা মাঠে নামার মিনিট দশেক পর নামে ইস্টবেঙ্গল। দুই শিবিরের ছবি অনেকটাই এক। শুরুতে চলে দৌড় এবং শারীরিক কসরত। চনমনে ম্যাকলারেন, দিমিত্রি, অ্যান্টন, মিগুয়েলরা। তবে চোট-আঘাত এবং কার্ডের জন্য মোহনবাগান পাবে না আপুইয়া এবং আলবার্তো রডরিগেজকে। আগের ম্যাচে জেসন কামিন্স চোট পেলেও, শেষ ম্যাচে খেলতে দেখা যাবে অস্ট্রেলিয়ান তারকাকে। আগেরদিন ম্যাচ শেষে ক্রাচ নিয়ে স্টেডিয়াম ছাড়তে দেখা গিয়েছিল কামিন্সকে। মনে হয়েছিল চোট গুরুতর। ম্যাচ শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে তেমনই ইঙ্গিত দেন লোবেরা। কিন্তু প্রাক ম্যাচ সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়ে দিলেন, 'আপুইয়া খেলতে পারবে না। ফিট নয়। কামিন্স ম্যাচ থেকে ছিটকে যায়নি। হয়ত খেলতে পারবে। শেষ ট্রেনিং সেশনে দেখে নিতে হবে।' ইস্টবেঙ্গলে চোটের কোনও সমস্যা নেই। ডার্বিতে কার্ড দেখায় শুধুমাত্র নেই এডমুন্ড লালরিনডিকা। ক্লাবের পক্ষ থেকে কার্ড তুলে নেওয়ার আবেদন জানানো হলেও, এখনও তাতে সাড়া দেয়নি ফেডারেশন।
এবার পরিস্থিতি একটু আলাদা। গত দু'বছরে আধিপত্য রেখে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মোহনবাগান। কিন্তু এবার বদলেছে সমীকরণ। খেতাব দৌড়ে সবুজ মেরুনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছে ইস্টবেঙ্গল। ইন্টার কাশীর বিরুদ্ধে জিতলেই চ্যাম্পিয়ন অস্কারের দল। অন্যদিকে শুধু জিতলেই চলবে না, ছয় বা তারও বেশি গোল করতে হবে মোহনবাগানকে। অর্থাৎ, লিগ শিল্ড জয়ের হ্যাটট্রিক অধরা থাকার সম্ভবনা প্রবল। সার্জিও লোবেরা অবশ্য ইস্টবেঙ্গলকে নিয়ে ভাবছেন না। নিজের দলে ফোকাস। হাল ছাড়ছেন না। শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়াইয়ের আশ্বাস দিলেন সমর্থকদের। লোবেরা বলেন, 'আমরা ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করছি। শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে চাই। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার চেষ্টা করব। তবে সহজ হবে না। আমাদের নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা পড়তে চাইনি। কিন্তু আমাদের আরও কোনও বিকল্প নেই। লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে।'
খেতাব জিততে প্রথম থেকেই গোলের জন্য ঝাঁপাতে হবে মোহনবাগানকে। তবে শেষ কয়েক ম্যাচে গোলের খরা চলছে। এই অবস্থায় কি আধ ডজন বা তারও বেশি গোল করা সম্ভব? কেমন প্রতিপক্ষ দিল্লি? লোবেরা বলেন, 'আমি প্রতিপক্ষকে সম্মান দিই। যেভাবে খেলছে ওরা, আমাদের জন্য সহজ হবে না। ১০০ শতাংশ দিতে হবে। তবে ফুটবলে সবকিছুই সম্ভব। আমাদের হাতে নেই। তবে অসম্ভবও না। সবাই জানে আমাদের কী দরকার। আমরা সেটা করার চেষ্টা করছি। প্লেয়াররা নিজেদের কাজটা জানে। ওরাও ট্রফি জিততে চায়। ওরা আমার ফুটবল দর্শন জানে। আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়েই নামব।' পিকে ব্যানার্জি, চুনী গোস্বামী, পরবর্তীতে সুভাষ ভৌমিকের পেপ টক ছিল অমূল্য। যা ম্যাচের আগে চাগিয়ে দিত ফুটবলারদের। পেশাদার যুগে পেপ টক অনেকটাই পেছনের সারিতে। বর্তমান কোচরা মূলত ফোকাস করে দলের ট্যাকটিক্যাল দিকে। মোটিভেশন জোগানোতে নয়। বিরূপ নয় বাগান কোচও। এই প্রসঙ্গে লোবেরা বলেন, 'প্লেয়াররা পেশাদার। ওদের বিশেষ মোটিভেশন লাগে না। ওদের মোটিভেট করার থেকেও আমার প্রধান কাজ ট্যাকটিক্যাল দিক দেখা।'
আগের দিন দিমিত্রি পেত্রাতোসের একটি পোস্ট ঘিরে শোরগোল পড়ে যায়। সবুজ মেরুন জার্সিতে তাঁর শেষ ম্যাচ খেলার ইঙ্গিত দেন অজি তারকা। এদিন অবশ্য এইসব নিয়ে মুখ খুলতে চাননি। ঘুরেফিরে একটাই কথা, 'আর একটা ম্যাচ।' যে প্রশ্নই হোক না কেন, বুলির মতো একই কথা আওড়ে গেলেন মোহনবাগানের তারকা ফুটবলার। তবে চোখে-মুখে প্রত্যয়। লড়াই করার অঙ্গীকার। দিমিত্রি বলেন, 'আর মাত্র একটা ম্যাচ। আমরা নিজেদের পরিকল্পনা মাফিক খেলব। নিজেদের সেরাটা দেব। যখনই মাঠে নামি, মোহনবাগানের ভাইদের সঙ্গে নিয়ে জেতার চেষ্টা করি। যাই হোক না কেন, আমরা নিজেদের উজাড় করে দেব। ফুটবলে আমাদের পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে হয়। এটা টিমগেম। মাঠে নেমে একসঙ্গে লড়াই করতে হয়। আমাকে যদি ডিফেন্সেও খেলতে হয়, আমি রাজি। নিজের সেরাটা দেব। আমাদের মোটিভেশন তুঙ্গে। লিগ জয়ের সুযোগ আছে আমাদের সামনে। সবকিছুই সম্ভব। আমরা ইতিবাচক মাইন্ডসেট নিয়ে নামব।' সমর্থকদের মাঠে আসার আহ্বান জানান দিমি।
এদিকে অন্য শিবিরে হাজির অ্যান্টন সোবার্গের বাবা টম সোবার্গ। মুম্বই হয়ে বুধবার সকালেই কলকাতায় পৌঁছেছেন। ইচ্ছা, ছেলের খেতাব জয়ী মুহূর্তের সাক্ষী থাকা। বিশ্বাস, চ্যাম্পিয়ন হবে ইস্টবেঙ্গলই। অস্কারের দল শেষ ম্যাচ জিততেই খেতাব জয়ের আভাস পান। আর দেরি করেননি। ভারতে আসার তোড়জোড় শুরু করে দেন।

টম সোবার্গ বলেন, 'আশা করছি ইস্টবেঙ্গল জিতবে। ভাল দল। দলে ৫-৬ জন ভাল প্লেয়ার আছে। ওরা ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে। সবাই জেতার জন্য মোটিভেটেড থাকবে।' জানান, ম্যাচ নিয়ে আলাদা করে ছেলের সঙ্গে কথা হয়নি। ইস্টবেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন হলে ছেলের আনন্দে সামিল হবেন, তবে দলের সঙ্গে সেলিব্রেশনে গা ভাসাতে চান না অ্যান্টনের বাবা। টম বলেন, 'দিনটা ওদের। আমি অবশ্যই খুশি হব। তবে ওদেরই আনন্দ করার দিন।' বাবার স্বপ্ন কি বাস্তবায়িত করতে পারবেন ড্যানিশ তারকা? নাকি একবুক হতাশা নিয়ে ফিরে যাবেন দেশে? উত্তর জানতে আর কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা।















