অয়ন মুখোপাধ্যায়: আমরা ইতিহাসকে কীভাবে দেখি? মানে, বাঙালি হিসেবে আমাদের ইতিহাসের প্রতি ভালবাসাটা ঠিক কী রকমের? উত্তরটা খুব সহজ। আসলে আমরা ইতিহাসকে আলমারির মাথায় তুলে রাখি, অনেকটা দাদুর আমলের একটা কাঁসার থালাকে যেমন করে তুলে রাখি। লোকজন এলে মাঝেমধ্যে নামিয়ে দেখাই আর বলি—"আহা, কী সুন্দর দিনই না ছিল!" তারপর আবার ফেসবুকে স্ক্রোল করতে করতে সবকিছু ভুলে যাই।
কিন্তু সব সময় কি আর এইরকমভাবে থাকা যায়? একদিন না একদিন দিন বদলায়। সময় বদলায় এবং সেই সঙ্গে বদলায় আমাদের ইতিহাসকে আগলে রাখার ধরণও। ধরুন আমাদের এই হুগলি জেলার বলাগড় ব্লকের জিরাট গ্রামটার কথাটাই। স্বাধীনতার প্রাক্কালে সারা ভারতবর্ষের রাজনীতির এক মস্ত বড় মাথা বা নেতা ছিলেন ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর পৈতৃক ভিটেটা এতদিন ধরে ওখানে স্রেফ একটা ভাঙা কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। পাঁচিল ভেঙে পড়ছে, বটগাছ দেওয়াল ফুঁড়ে বেরোচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন মহাকালের ঘুম ভাঙল। এক অভূতপূর্ব ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়ে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের সরকার সদ্য বাজেটে ঘোষণা করলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পৈতৃক বাড়িটাকে সংস্কার করা হবে। বরাদ্দ— ২০০ কোটি টাকা! সত্যি কথা বলতে কি, এই পরিকল্পনা ও বরাদ্দ একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তবে নতুন পরিকল্পনার ফলে ওই জরাজীর্ণ বাড়ির ভোল পাল্টে যাবে, লাইব্রেরি হবে, আর তার সঙ্গে মাথা তুলবে একটা ১২৫ ফুটের মূর্তি। খবরটা শুনে জিরাটের মানুষ তো বটেই, খোদ ইতিহাসের দেবতাও বোধহয় এবার একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন।
প্রসঙ্গত বলা যায়, এই ২০০ কোটি টাকার বিশাল পরিকল্পনাটি কিন্তু এক বড় আশার আলো নিয়ে এসেছে এলাকাবাসীর কাছে। কারণ প্রথমত, ওই প্রাচীন বাড়িটার ঐতিহাসিক সংস্কার—আজকের ভাষায় যাকে ‘মেকওভার’ বলে—তাই যদি হয়, তাহলে সেটা হবে ইতিহাসের পুনরুদ্ধার। হেরিটেজ বিশেষজ্ঞদের সূক্ষ্ম কারুকার্যে চুন-সুড়কির সেই প্রাচীন গন্ধ আর বনেদিয়ানাকে ফিরিয়ে আনা। ভাঙা দেওয়ালে যখন নতুন করে পলেস্তারা পড়বে, তখন শুধু আমাদের শিকড়টাই মজবুত হবে না, ওখানকার অর্থনীতির চেহারাটাও বদলে দেবে।
দ্বিতীয়ত, ওখানে যে একটা লাইব্রেরি আর সংগ্রহশালা সরকার প্রস্তাব রেখেছে, তা হবে এক যুগান্তকারী ভাবনা। কারণ আজকের যে জেনারেশন রিলস আর শর্টসের বাইরে তিন লাইনের বেশি টেক্সট পড়তে গেলেই হাঁপিয়ে ওঠে, তাদের যদি একটু টেনে এনে ডক্টর মুখোপাধ্যায়ের ডায়রি, চিঠি বা স্বাধীন ভারতের জন্মলগ্নের ইতিহাসগুলোর সামনে মুখোমুখি দাঁড় করানো যায়, তবে তার চাইতে ভাল আর কী হতে পারে! অন্তত আমাদের আগামী প্রজন্ম জানুক যে, রাজনীতি মানে শুধু টিভির পর্দায় চেঁচামেচি আর টুইটার যুদ্ধ নয়; এর পেছনে একটা আস্ত পড়াশোনা লাগে, দরকার মেধা আর প্রজ্ঞার জগৎ , প্রয়োজন জনসংযোগ, আর আত্মত্যাগ।
তবে এখানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়টি হল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সেই ১২৫ ফুটের মূর্তি স্থাপনের যে পরিকল্পনা সরকার করেছে। ১২৫ ফুটের ব্রোঞ্জের অবয়ব যখন জিরাটের আকাশ চিরে দাঁড়াবে, তখন তা শুধু পর্যটকদের সেলফির ব্যাকগ্রাউন্ড হবে না, তা হবে বাংলার এক অনন্য ল্যান্ডমার্ক। এই বিশাল উচ্চতা আসলে প্রতীকীভাবে মনে করিয়ে দেবে—যাঁর স্মৃতিতে এই আয়োজন, তাঁর মেধা আর ব্যক্তিত্বের উচ্চতাটা ঠিক কতটা আকাশ ছোঁয়া ছিল।
ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক ছিল, আছে এবং থাকবে। রাজনীতির আঙিনায় আদর্শের সংঘাত এক চিরন্তন সত্য। কিন্তু সেই সমস্ত বিতর্ককে একপাশে সরিয়ে রেখে যদি বাস্তব মাটির দিকে তাকাই, তবে এই প্রকল্পের সবচেয়ে সুন্দর ও অমোঘ সত্যটি সামনে আসে—তা হলো জিরাট তথা সমগ্র বলাগড় ব্লকের গ্রামীণ অর্থনীতির এক অভূতপূর্ব বিকাশ। এই ২০০ কোটি টাকার বিশাল পরিকল্পনাটি জিরাট তথা সমগ্র বলাগড় অঞ্চলের জন্য এক বিরাট বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক আশীর্বাদ হতে চলেছে।
যখনই এই স্মৃতি-ভিটেকে কেন্দ্র করে একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন হাব গড়ে উঠবে, চারপাশটা ঝাঁ-চকচকে হবে, দেশ-বিদেশের পর্যটকদের গাড়ি লাইন দেবে, তখনই ওখানকার ঝিমিয়ে পড়া স্থানীয় বাণিজ্যের চাকা হুট করে সচল হয়ে উঠবে। প্রতিদিনের এই পর্যটকদের আনাগোনা মানেই ওখানকার গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটা নতুন জোয়ার আসা। চায়ের দোকানদার, ছোট রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে টোটোচালক, হস্তশিল্পের কারিগর থেকে নতুন গড়ে ওঠা হোটেল ও গেস্ট হাউসের মালিক—সবার পকেটেই দুটো পয়সা নিয়মিত ঢুকবে, স্থানীয় যুবকদের সামনে খুলে যাবে আয়ের নতুন দিগন্ত।
সুতরাং বিতর্ক নিজের জায়গায় যেমন চলছে চলুক, কিন্তু এই প্রকল্পের ফলে যে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ লক্ষ্মী লাভের সুযোগ পাবে তা বলাই বাহুল্য। তাই সরকারের এই পরিকল্পনাকে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ না বলে উপায় নেই। ইতিহাসকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি মানুষের পেটের সংস্থান করার এর চেয়ে সুন্দর যুগলবন্দি আর কী হতে পারে?
আজ যদি আপনি জিরাটের সেই পুরোনো ভাঙা বাড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়ান, অবধারিতভাবে আপনার মনে হবে ইতিহাসের বহু মূল্যবান অধ্যায় আর এক প্রাজ্ঞ মানুষের স্মৃতির টুকরোগুলো যেন জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে ছিল এতকাল। বিষণ্ণতার এক একটা সুর বাজত সেখানে। কিন্তু সেই ‘হৃদয়ের অপচয়’ তো চিরস্থায়ী হতে পারে না। এই ২০০ কোটির বিশাল পরিকল্পনা আসলে সেই দুঃসময়কে জয় করার এক রাজকীয় প্রয়াস। হাত গুটিয়ে বসে না থেকে, আজ বুক চিতিয়ে ইতিহাস কে তার যোগ্য সম্মান দেওয়ার এবং তার সাথে একটি অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক ভাগ্য বদল করার স্বপ্ন।
এখানেই জন্ম নেয় এক গভীর দার্শনিক বোধ। মনে রাখবেন, আমরা যখন কোনো বরেণ্য মানুষের স্মৃতিকে বা কোনও ঐতিহ্যকে ইঁট-কাঠ, পাথর-ব্রোঞ্জের আধুনিকতায় সাজিয়ে তুলি, তখন আসলে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ কেও সমৃদ্ধ করি। ১২৫ ফুটের সেই ব্রোঞ্জের অবয়ব যখন জিরাটের আকাশকে স্পর্শ করবে, তখন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো করেই আমরা বলতে পারি—
"সে কি জানিত না যত বড়ো রাজধানী
ততো বিখ্যাত নয় এ-হৃদয়পুর
সে কি জানিত না আমি তারে যতো জানি
আনখ সমুদ্র।"
দিল্লির মতো বড় রাজধানী বা রাজকীয় ক্ষমতার অলিন্দে যে ইতিহাস শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি তৈরি করে গিয়েছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বিখ্যাত এবং গভীর আমাদের এই বাংলার মাটি, এই ‘হৃদয়পুর’। বাহ্যিক এই আড়ম্বর আর আধুনিকতার আলো তখনই আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে, যখন ১২৫ ফুটের সেই মূর্তির ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে কোনও তরুণ ওখানকার লাইব্রেরির একটা বইয়ের পাতা উল্টে নতুন করে ভারতের ইতিহাসকে আবিষ্কার করবে।
কিন্তু দিনশেষে দর্শনের একটা অমোঘ সত্য আমাদের মনে রাখতেই হবে—অতীত কখনও নিজেকে নিজে টিকিয়ে রাখতে পারে না, বর্তমানই তার নিজের প্রয়োজনে অতীতকে টেনে এনে বাঁচিয়ে রাখে। ২০০ কোটির এই রাজকীয় রূপান্তর শেষ পর্যন্ত একটা চোখধাঁধানো উৎসব বা ১২৫ ফুটের এক নিশ্চল ব্রোঞ্জের শরীর তো বটেই, কিন্তু তার আসল সার্থকতা লুকিয়ে আছে ওই মূর্তির পায়ের নিচে তৈরি হওয়া জীবন্ত চঞ্চলতায়।
জিরাটের সাধারণ মানুষের পকেটে যখন দুটো বাড়তি পয়সা ঢুকবে, যখন ওখানকার কোনও রান্নাঘরে জ্বলবে নিশ্চিত ভাতের আলো, তখনই সেই দর্শনের পরম প্রাপ্তি ঘটবে। ইতিহাস তখন আর স্রেফ ধুলো জমা পাতার হেরিটেজ হয়ে থাকবে না; পরম এই জরাজীর্ণ অতীতই তখন জিরাটের মানুষের বর্তমানের রুটি-রুজির মধ্যে দিয়ে প্রতিদিনের নতুন করে বেঁচে ওঠা হয়ে উঠবে। এই প্রত্যাশা আমাদের। খুব সম্প্রতি বলাগড়ের বিধায়িকা সুমনা সরকার জিরাটের শ্যামাপ্রসাদের বাড়ি গিয়ে পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছেন। দরকার ৫০ বিঘা জমি কিন্তু মূল ভিটে সংলগ্ন এলাকায় এত জমি না থাকায় জিরাট থেকে খামারগাছী অঞ্চলের মধ্যবর্তী বারাইল অঞ্চলে আসাম রোডের ওপর জমি দেখার কাজ ও চলছে যদিও কোন স্থান চূড়ান্ত হয়নি, সবটাই প্রস্তাবিত আকারে জোরদার কাজ চলছে। তবে আসার আলো দ্রুত এর সমাধান হবে বলে আশা রাখা যায় সুতরাং অবহেলার পুরোনো কুয়াশা কেটে বাণিজ্যের নতুন আলোয় এবার সার্থক হোক আমাদের এই গ্রাম-মফস্বল, জিরাট হৃদয়পুর।















