সৃজন ভট্টাচার্য্য

তখন ক্লাস সেভেন। বয়ঃসন্ধিকাল। ইতিহাসের শিক্ষিকা ছিলেন ডাকসাইটে সুন্দরী। তাঁর ক্লাস করার জন্য মুখিয়ে থাকত সবাই। ওই একটিই পিরিয়ডে সারপ্রাইজ ক্লাস টেস্টেও আপত্তি ছিল না কারও। তাঁর কাছেই কিনা গিয়ে আমি পৃথিবীর সমস্ত স্পর্ধা জোগাড় করে সটান বলে দিলাম, "কাল আমি পরীক্ষা দিতে আসব না!" 

ভদ্রমহিলা অত্যন্ত রাশভারী ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। ভুরু কুঁচকে অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টারে সই করতে করতেই জিজ্ঞাসা করলেন, কেন? প্রথম বাক্যটা বলার পর আর যেটুকু সাহস বেঁচেবুচে ছিল, সে সবটাকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে মুখটা যথাসম্ভব কাঁচুমাচু করে উত্তর দিলাম, কাল ব্রাজিল খেলবে। রোনাল্ডো যদি কাল গোল করতে পারে, তাহলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যাবে। আমাকে প্লিজ কালকের খেলাটা দেখতে দিন। পরশুই পরীক্ষা দিয়ে দেব। প্লিজ, একটাই তো দিনের ব্যাপার!

এবার তিনি তাঁর পাখির নীড়ের মতো চোখদুটো তুলে তাকালেন। পচা ভিএফএক্স-সম্বলিত সিরিয়ালে যেমন মাঝেমধ্যেই আধো-দৈবিক চরিত্রদের চোখ দিয়ে আগুনের গোলা বেরিয়ে আসতে দেখায়, তেমনই কটাক্ষ হেনে আমাকে আপাদমস্তক যাকে বলে নিরীক্ষণ করলেন সেকেন্ড বিশেক। আমি যখন ব্যাটার ফ্রাই থেকে প্রায় পুরোপুরি ভস্ম হওয়ার দিকে এগোচ্ছি, এমন সময়ে কী মায়া হলো কে জানে, ফিক করে হেসে দিলেন। শান্ত গলায় বললেন, "পরীক্ষা ওভাবে পিছোনো যায় না। কাল এসো। পরে হাইলাইটস দেখে নেবে।"

কী করে তাঁকে বোঝাবো, ঘানার বিরুদ্ধে পরদিন ওয়ান ইজটু ওয়ানে গোলকিপারকে স্টেপওভারে বোকা বানিয়ে যে গোলটা দিয়ে গার্ড মুলারকে টপকে তখনকার মতো বিশ্বরেকর্ডটা করবেন রোনাল্ডো, তেমন একখানা গোল দেখার জন্য হাজারটা ক্লাস টেস্ট কুরবান দেওয়া যায়!

*

রোনাল্ডো নাজারিও দি লিমা। আমার শৈশবের গীতা, কোরান, বাইবেল। ১৯৯৪ সালে যে বছর তাঁর প্রথম বিশ্বজয়ী দলের সদস্য হওয়ার আস্বাদ পাওয়া, তখনও ভাল করে কথা ফোটেনি আমার মুখে। চার বছর পর আবার ফ্রান্সে দেখা। পিএসভি আইন্ডহোভেন হয়ে বার্সেলোনায় স্বপ্নের মতো দুটো সিজন কাটিয়ে ফেলা নাজারিও তখন বিশ্ব ফুটবলের নেক্সট বিগ থিং। সেবারও ব্রাজিলের ফাইনাল অবধি দাপটে পৌঁছে যাওয়া অশ্বমেধের ঘোড়ায় তাঁর অবদান চারটে গোল। বিশেষত সেমিফাইনালে হল্যান্ডের বিরুদ্ধে গোলকিপারের দু'পায়ের ফাঁক দিয়ে গলিয়ে দেওয়া বল, প্রশংসা কুড়ালো সারা দুনিয়ার। সামনে ফাইনাল, প্রতিপক্ষ আয়োজক দেশ ফ্রান্স, মারকাটারি খেলে এতদূর উঠেছে সে ব্যাটারাও, কিন্তু তাতে কী যায় আসে? সারা দুনিয়া রেডি, বিশ্বের সর্বোচ্চ মঞ্চ প্রস্তুত, ক্রাউন প্রিন্সের রাজ্যাভিষেকে যেন আড়ম্বরের অভাব না থাকে। 

অভাব হইল। প্যারিসের সেই অভিশপ্ত রাতের শেষে যাদবপুরে মাসির বাড়িতে বসে পা ছড়িয়ে হাপুস নয়নে ভ্যাঁ করে ফেলল ড্রয়িং খাতায় সবুজ হলুদ প্যাস্টেল দিয়ে ৯ নম্বর জার্সি আঁকা ছোট্ট ভক্ত। আমার জন্মের আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বসে গেছে, বামফ্রন্ট সরকার তারপরেও অন্তত এক যুগ পার করবে। সৌরভ গাঙ্গুলি তখনও ভারতীয় ক্রিকেট দল থেকে বাদ পড়েননি। প্রথম যে মেয়েটির প্রেমে পড়েছিলাম, সে তখনও "আমার এসব ভাল্লাগেনা" বলে চোখ পাকিয়ে ফুটিয়ে দেয়নি। বেলা বোস ফোন ধরে কথা না বললে ঠিক কেমন লাগে, বোঝার বয়স থেকে বহুদূরে তখন। অতএব, জীবনের প্রথম হৃদয়ভঙ্গম, অভিজ্ঞতা হল সেদিনই। কোথাকার কোন অজ্ঞাতকুলশীল আলজেরিয়ান শরণার্থী জিনেদিন জিদান এসে আমার ছোট্টবেলার হিরোর মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে চলে গেছে। হায়।

'৯৮ সালের ফাইনাল রোনাল্ডোর জীবনে এক ব্যাপক বিতর্কের অধ্যায়। মারিও জাগালোর সেই দল মনস্তাত্ত্বিকভাবে খুবই নির্ভরশীল ছিল তাঁর উপর। ২০১৪ সালে যেমন এক নেইমারের চোটের ধাক্কা নিজভূমে সাত গোল খাইয়ে দিল ব্রাজিলকে, সেবারও তেমনই, ফাইনালের ঠিক আগে, রোনাল্ডোর রহস্যজনকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়া, প্রভাব ফেলেছিল সারা ম্যাচ জুড়ে ব্রাজিলের খেলায়। রোনাল্ডো শেষমেশ নেমেছিলেন ঠিকই, কিন্তু বড় ম্লান, ম্রিয়মাণ। জিদানের জোড়া হেডের ছোবল সেবার দুনিয়াভর কোটি কোটি ব্রাজিল সমর্থকের ঘরে অপ্রত্যাশিত লোডশেডিং এনে দিয়েছিল। 

*

এর পরের কাহিনী বড্ড করুণ। 'আজকাল' পত্রিকা থেকে প্রকাশিত 'খেলা' ম্যাগাজিনটির প্রতি ছিল আমার তুমুল আকর্ষণ। স্কুল থেকে ফিরে খেতে বসার আগে দাদুর কাছে ক্রিকেট ফুটবলের গল্প শুনতে শুনতে বিভিন্ন কসরৎ হতো ঘরের মধ্যেই। তার মধ্যেই যেদিন দাদু 'খেলা' কিনে আনতেন, সেদিন আর আমাকে পায় কে! 'খেলা'র পাতাতেই প্রথম পড়লাম, হাঁটুর চোটে ইন্টার মিলানের প্রথম দল থেকে বাদ যাচ্ছেন রিও ডি জেনিরোর আদরের রনি, আদৌ আর কোনোদিন ফুটবলে পা দিতে পারবেন কিনা সন্দেহ!

বাজ পড়ল মাথায়। সে কী! ইন্টার মিলানেও রোনাল্ডো ততদিনে অত্যন্ত সুদক্ষ সফল স্ট্রাইকার। আমি যে খানতিনেক খাতা ইতিমধ্যেই ভরিয়ে ফেলেছি তাঁর ছবির পেপার কাটিং দিয়ে! একবার ভাবলাম, ঠাকুরকে ডাকি। তারপর মনে হলো, মা যে বলল, ঠাকুর সত্যি আছেন কিনা সেটা এখনও কনফার্ম নয়, তাহলে কী হবে? কাকে ডাকা যায়? ভাবতে ভাবতে চলে এলো ২০০২। প্রথমবারের মতো, এশিয়ায় বিশ্বকাপ।

ব্রাজিলের ভাগ্যে সেবার একজন ত্যাঁদোড় কোচ জুটলো। যাকে কিনা হিন্দিতে বলে, "খাড়ুশ"। লুই ফিলিপ স্কোলারি দায়িত্ব নিয়েই শোরগোল ফেলে দিলেন বিশ্বকাপের স্কোয়াড থেকে রোমারিওকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে। একদিকে একই পায়ে উপর্যুপরি দু'বার চোট পেয়ে ফুটবলজীবন সুতোয় ঝুলছে রোনাল্ডোর, অপরদিকে '৯৪ বিশ্বকাপ জয়ের কারিগর কিংবদন্তি রোমারিও, তাঁকেও যদি দলে না নেওয়া হয়, তাহলে বিপক্ষের জাল অবধি বলটা নিয়ে যাবেটা কে, প্রশ্ন তুলে ক্ষোভে ফুঁসছে গোটা ব্রাজিল। 

আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়ে স্কোলারি জানিয়ে দিলেন, ব্রাজিলে সবাই তাঁর থেকে বেশি ফুটবল বোঝে, সে ভাল কথা, কিন্তু তাতে তিনি নিজের ভাবনা থেকে নড়ে যাওয়ার বান্দা নন। দল ঘোষণা হলো বিপুল গণবিক্ষোভের মধ্যেই, রোমারিওকে ছাড়া ; এবং হ্যাঁ, ততদিনে বিশেষজ্ঞদের খরচের খাতায় চলে যাওয়া, বিস্মৃতির ঢালু রাস্তায় হেলে লো প্রোফাইল হয়ে পড়া, সদ্য জীবনঘাতী চোট সারিয়ে টিমটিম করে জ্বলতে জ্বলতে ফিরে আসা, রোনাল্ডো নাজারিও দি লিমাকে রেখে। 

*

তুরস্কের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচ। জুনিনহো হয়ে বাঁদিকের উইংয়ে বল গেল রিভাল্ডোর পাঁয়ে। কম্পাসে আঁকা ছবির মতো নিখুঁত বাঁক খাওয়ানো বল রিভাল্ডো ফেললেন ডি বক্সে। কিন্তু কার উদ্দেশে? কোত্থাও কেউ নেই। বলের ফ্লাইট দেখতে দেখতে গড়পড়তা ব্রাজিল সমর্থক বিরক্তিতে মুখ নামিয়ে ফেলছে, ধ্যুস, এই বলটাও নষ্ট হলো, এমন সময়ে...

আক্ষরিক অর্থে, আউট অফ নো হোয়্যার, দুই ডিফেন্ডারের ফাঁক চিরে উড়ে এসে ঝাঁপিয়ে ডান পা ছুঁইয়ে দিলো একটা হলুদ জার্সি। বল জালে জড়াতে জড়াতে সারা বিশ্ব দেখল, একটা দোহারা চেহারা পরিচিত ঢঙে ডান হাতের তর্জনীটা নাচাতে নাচাতে ছুটে চলেছে কর্নার ফ্ল্যাগে দিকে। একমুহূর্ত হকচকিয়ে, হতভম্ব হয়ে, উল্লাস-বিস্ফোরণে ফেটে পড়ল গোটা স্টেডিয়াম। হলুদ জার্সির পিছনে লেখা নম্বর ৯। স্বপ্নের উড়ান প্রত্যক্ষ করতে করতে ধারাভাষ্যকার আবেগমথিত হয়ে বলে উঠলেন, কী অপরূপ আবার এই উঁচু দাঁতের হাসি। ফোর ইয়ারস সিন্স দ্যাট ড্রেডফুল নাইট অফ অ্যাংগুইশ অ্যাট প্যারিস। ওয়েলকাম ব্যাক, টু দ্য গ্রেটেস্ট স্টেজ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড, এল ফেনোমেনো!

আমার রাতজাগা তারা। স্বপ্নের স্পেসশিপে তখন কি একা রোনাল্ডো ভাসছেন? তাঁর সাথে ভেসে চলেছি তো আমিও, আমরাও! এল ডোরাডোর সন্ধানে ছুটতে শুরু করল ছন্দ পেয়ে যাওয়া দুর্বার ব্রাজিল। চীন, বেলজিয়াম, কোস্টারিকা, কেউই তখন আর প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ার জন্য যথেষ্ট নয়। এরমধ্যেই কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের সাথে খেলায় এই গ্রহ চিনল এক নতুন ক্ষণজন্মা প্রতিভাকে। ব্রাজিল দল সেদিন চিরাচরিত হলুদ-সবুজ ছেড়ে নীল জার্সি পরে নেমেছিল। ডেভিড সিম্যানের মাথার উপর দিয়ে ডিপ খাইয়ে দেওয়া ঐতিহাসিক ফ্রি-কিক'টা তো বটেই, রিভাল্ডোর করা প্রথম গোলটার ক্ষেত্রেও রোনাল্ডিনহোর অবদান ছিল বিপুল। দুনিয়া দেখল এক লাজুক হাসির বিস্ময়কিশোরের আগমন, তবে এর চুলের স্টাইলটা ব্রাজিলীয়দের মতো প্রথাগত ন্যাড়াটে নয়, বেশ লম্বা, অন্যরকম!

সেমিফাইনালে আবার তুরস্ক। হাসান সাসদের টিমও ততদিনে গতি পেয়ে গিয়েছে। রো-রি-রো ত্রিফলার সামনে প্রথমার্ধ যুঝে ৪৯ মিনিটের মাথায় অবশেষে ধাক্কা খেল আন্ডারডগদের যুদ্ধরথ। আমি ওই গোলটা এখনও মাঝেমধ্যেই দেখি। কতটা 'প্রিসিশন' ও আত্মবিশ্বাস থাকলে বল নিয়ে দৌড়তে দৌড়তে শট মারার জন্য পা না তুলেই স্রেফ আঙুলের টোকায় ওরকম একটা হাইভোল্টেজ ম্যাচে গোল দেওয়া যায়, ভাবি। রোনাল্ডো এ জন্যই, তাঁর সময়ের বিশ্বসেরা স্ট্রাইকার। হাফ চান্স কেন, নো চান্স থেকেও গোল করে দিতে পারেন।

*

বাবা চাকরিসূত্রে কলকাতার বাইরে থাকতেন। মায়ের সাথে সম্পর্কটা ছিল কভি অম্ল কভি মধুর। ব্রাজিল ফাইনালে ওঠার পর একদিন মায়ের মধুর মুডের সুযোগ নিয়ে বাড়িতে ঢোকার মুখের দেওয়ালে বড় বড় করে হলুদ সবুজ রঙে লিখে ফেললাম, 'BRASIL'।  পাঠক খেয়াল করবেন, স্পেনীয় বানানটা লিখেছিলাম কিন্তু, 'এস' সহ। ছাদে দু'চারটে সেলেকাও লেখা পতাকা টাঙানোরও ইচ্ছে ছিল, কিন্তু অত ছোট আমি ঠিক অত বড় পতাকা কোথায় পাবো, বুঝে ওঠা গেল না। সিপিএমের সময় তো, পাড়ার আর্জেন্টিনা সমর্থক দাদারা, যতদূর মনে পড়ে, ব্যাজার মুখ নিয়ে হলেও লাতিন আমেরিকান ঐক্যের পক্ষেই ছিল, 'ভাল তৃণমূল' সেজে তলে তলে জার্মানির লগে ভিড়ে যায়নি। 

বালাক ক্লোজে বিয়েরহফ'দের জার্মানি কিন্তু হেঁজিপেজি ছিল না। অলিভার কান ২০০২ বিশ্বকাপে তখনও পর্যন্ত একটা গোলও খান নি। কোচ রুডি ভোহলার নিজে খেলোয়াড় থাকাকালীন বিশ্বকাপ জিতেছেন। সবমিলিয়ে যাকে বলে, সেয়ানে সেয়ানে টক্কর। দুরুদুরু বুকে, বিকেল ৪টের মধ্যে সব কাজ গুটিয়ে বসে পড়লাম টিভির সামনে। কথাটা লিখলাম বটে, এখন ভাবছি, ক্লাস থ্রি'র বিচ্ছুর কী এমন রাজকাজ ছিলই বা গোটানোর মতো! আসলে, টেনশন। দাঁত দিয়ে নখ কেটে জামায় মোছা টেনশন। আগেরবার তীরে এসে তরী ডুবেছে। এবার হবে তো?

এ এক উপন্যাসের মতো দিন। '৯৪ বিশ্বকাপ যেমন রবার্তো বাজ্জিওকে সব দিয়ে আবার সব কেড়ে নিয়েছিল, '৯৮ বিশ্বকাপ যেমন রোনাল্ডোকে 'দ্য ফেনোমেনন'এর শিরোপা পেতে পেতেও পেতে দেয়নি, ২০০২ বিশ্বকাপের স্ক্রিপ্ট থেকে বোধহয় ফুটবল-ঈশ্বর চুপিসারে ট্র্যােজেডির পাতাগুলো সরিয়ে রেখেছিলেন, একেবারে ফাইনালের দিন, অলিভার কানের চোখের সামনে মেলে ধরবেন বলে! না হলে যে লোক সারা বিশ্বকাপে দুর্ভেদ্য দুর্লঙ্ঘনীয় হয়ে রইল, সে নেহাত দৈব দুর্বিপাক না হলে কখনও হাত ফসকে লোপ্পা বল স্লিপ খাইয়ে গোল খায়!

অলিভার কান হয়ে গেলেন ইলিয়ডের হেক্টর। অ্যাকিলিস হওয়া তাঁর হলো না। রবার্তো বাজ্জিওর কথা বলছিলাম। '৯৪ ফাইনালে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করার পরের বাজ্জিও। দ্য ম্যান হু ডায়েড স্ট্যান্ডিং। বা ২০০৬ সালে মাতেরাজ্জিকে ঢুঁসো মেরে লালকার্ড দেখে ধীরে ধীরে বিশ্বকাপ পাশে রেখে ডাগআউটের অস্তাচলে হারিয়ে যেতে থাকা জিনেদিন জিদান। জীবন কষ্টের। চ্যুইংগাম চেবাতে চেবাতে শীতল কঠিন মুখে তিনকাঠির নীচে সেই সময়ের পৃথিবীর বিশ্বস্ততম প্রহরী অলিভার কান, একটু পর, ৭৯ মিনিটে, আরেকবার গোল খাবেন। রিভাল্ডোর অনন্য 'ডামি' থেকে ফার্স্ট টাচ ছুঁয়ে, নিশ্চিন্ত ক্ষিপ্রতায় দ্বিতীয়বারের জন্য জালে বল জড়িয়ে দেবেন রোনাল্ডো নাজারিও দি লিমা। কে বেশি অবুঝ, কবি না কবিতা, ভাবতে ভাবতে প্যারিস থেকে সিওল, সম্পূর্ণ হবে বৃত্ত।

*

দার্জিলিংয়ের ম্যাল রোড থেকে যে কাঞ্চনজঙ্ঘাটা দেখা যায়, তা এত মনোলোভা, কারণ তার শরীরে পিঠোপিঠি রোদছায়ার নির্দিষ্ট বৈপরীত্য খেলা করে। একদিক ছায়া হলে, অপরদিক আলো। ছায়ার নাম অলিভার কান হলে, রোদের নাম সেদিন ছিল রনি। আর৯। নজরকাড়া হেয়ারকাট আর গজদাঁতের হাসিতে ঝিলিক দিচ্ছিল শাপমুক্তির স্বস্তি। দ্য গ্রেটেস্ট কামব্যাক ইন স্পোর্টস হিস্ট্রি। হয়তো বা, দু'ফাঁক হয়ে যাওয়া হাঁটু নিয়ে একা একা হাসপাতালের বেডে কাতরানোর দিনগুলো মনে পড়ছিল। ছুটে বেড়াচ্ছিলেন ব্রাজিলের পতাকা কাঁধে মাঠের এপার ওপার। মাঝে একবার, দাঁড়িয়ে পড়ে জড়িয়ে ধরলেন ছোট্টবেলা থেকে ব্রাজিল দলের রুমমেট, সেই প্যারিসের জ্ঞান হারানো রাতেরও রুমমেট, রবার্তো কার্লোসকে। বন্ধু, এসো আকাশ দেখি পুরোটা চোখ খুলে!

সে এক তারায় ভরা রাত। সে এক মায়ায় ভরা রাত। যাদবপুরের কলোনি বাজি ফাটাতে ফাটাতে ভেঙে পড়ল মাঝসন্ধের রাস্তায়। একচ্ছত্র ব্রাজিলপাড়া টলে গিয়েছিল '৮৬ সালের মারাদোনাকে দেখে। স্কোলারির জাদু-ছেলেরা তাকে ভাসিয়ে নিল ফের জোগা বোনিতোর স্রোতে। কাফুর হাতে বিশ্বকাপ। চুম্বনে চুম্বনে ভরিয়ে দিচ্ছেন রোনাল্ডো। শিশুর মতো লাফিয়ে চলেছেন রোনাল্ডিনহো, ক্লেবারসন, ডেনিলসন। অসম্ভবকে ছুঁয়ে দেখার বিস্ময় ২০ বছরের কাকার চোখেমুখে। বিশালদেহী লুসিওর একপাশে স্মিত হাসিমুখে দাঁড়িয়ে রিভাল্ডো। তিনি এই টিমের রাহুল দ্রাবিড়। পরিমিত, অপরিহার্য। 

ক্লাস থ্রির বিচ্ছু এসব বড় হয়ে ইউটিউবে দেখেছে। সেদিন খেলা শেষের বাঁশি বাজার পর সে আর খুব টিভি দেখার অবস্থায় ছিল না। জিতেছিইইইইই বলে ছিটকে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে দৌড়তে শুরু করেছিল পাড়ার অলিগলি দিয়ে। বাড়ি ফেরার পর মায়ের কাছে কোন ট্রিটমেন্ট মিলবে, অম্ল না মধুর, বিশেষ ভাবা প্রয়োজন মনে করেনি। মহল্লাজোড়া আবিরে ফুলঝুরিতে রঙমশালে ভাসিয়ে দিয়েছে যাবতীয় আবেগের নাও। তার কাছে এই জয়, খুব পার্সোনাল। তার খাতায় জমানো ছবিগুলোকে হেরে যেতে দেখতে তার ভাল লাগত না কক্ষনো। কক্ষনো ভাল লাগত না।

নবারুণ ভট্টাচার্যের বিখ্যাত কবিতা আছে না, এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না? যেখানে নবারুণ লিখছেন, "ভালোবাসা - যার থেকে আলোকবর্ষ দূরে জন্মাবধি অচ্ছুৎ হয়ে আছি --
তাকেও ডেকে নেব কাছে বিপ্লবের উৎসবের দিন..।" যেমনটা ভাবলে পরে এমন লাইন লেখা যায়, এ জয়ের অনুভূতি, পরে ভেবে দেখেছি, ছিল ঠিক তেমনই। জানি না, বোঝাতে পারলাম কিনা।

*

রোনাল্ডো তারপরেও অনেকবছর খেলেছেন। দাপিয়ে খেলেছেন। জিদান ফিগো রাউল বেকহ্যাম কার্লোসের রিয়েল মাদ্রিদে 'গ্যালাকটিকো' হিসেবে তিনটে সিজন কাটিয়ে এসি মিলান হয়ে করিন্থিয়ান্সে শেষ করেছেন কেরিয়ার। চোটে জর্জরিত না হলে তাঁর স্কোরবোর্ড মেসি-ক্রিশ্চিয়ানোকে ছাপিয়ে যেত কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক করেছেন তাবড় ফুটবল পণ্ডিত। তিনি ইতিহাসে একমাত্র ফুটবলার, যিনি ওল্ড ট্র্যা ফোর্ডে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করেছেন। রূপকথার দৌড় বজায় রেখে একাধিকবার ব্যালন ডিওর পেয়েছেন, আবার বেহিসেবী বিশৃঙ্খল জীবনযাপনের জন্য ক্লাবছাড়াও হয়েছেন একাধিকবার। তাঁর কেরিয়ার গ্রাফ যেন ঠিকই করে নিয়েছে, কিছুতেই, কিছুতেই এক লাইনে বেশিক্ষণ হাঁটবে না! 

২০০৬ সালে 'আনফিট' শরীর নিয়েই সর্বাধিক গোলদাতার রেকর্ড গড়ে রোনাল্ডো কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হলেন ফ্রান্সের। আট বছর আগের স্মৃতি হুবহু ফিরিয়ে এনে প্রিয় বন্ধু জিদানের হাতে নাস্তানাবুদ হয়ে সে যাত্রা বিশ্বকাপের দৌড় শেষ করল ব্রাজিল। আমার মনে আছে, খেলার আগেরদিন 'আজকাল' পত্রিকায় অশোক দাশগুপ্ত একটা মনকেমন করা সম্পাদকীয় লিখেছিলেন। এই ম্যাচ দুই মহারথীর শেষ মুলাকাত, জিদান ও রোনাল্ডো, যেই হারবে, সেই চিরতরে বিশ্বকাপ-মানচিত্র থেকে বিদায় নেবে, বিজয়ীর নয়, পরাজিতের হয়ে বিষণ্ণতার সুর বেঁধে দিয়েছিল লেখাটা। ওই ম্যাচে, কেউ না হারলেই বোধহয় সবথেকে খুশি হতাম আমরা।

মানুষ জিততে চায়। প্রিয় খেলোয়াড়ের মাধ্যমে নিজেকে জিততে দেখতে চায়। ২০১৪ সালের আফসোসের পর ২০২২ সালে মেসির বিশ্বজয় তাই এত মহাকাব্যিক লাগে। এই যে ক্রিশ্চিয়ানো দু'দিন আগে ৪২ বছর বয়সে গোল দিয়ে ক্যামেরার সামনে শিশুর মতো চিৎকার করে উঠলেন, "আই অ্যাম ব্যাক!"৷ দেখতে দেখতে সিএলআর জেমসের কথা মনে পড়ছিল, "হোয়াট ডু দে নো অফ ক্রিকেট, হু ওনলি ক্রিকেট নো?" মেসি ক্রিশ্চিয়ানোরাও সময়ের নিয়মে একদিন ফুরিয়ে যাবেন। তাঁদের পায়ে পায়ে জীবনের জয়গান, সে তরঙ্গ রুধিবে কে?

জানিনা এ বিশ্বকাপে ভিনিসিয়াসদের ব্রাজিল কতদূর যেতে পারবে। আমি এখনও ব্রাজিলের খেলা হলে নিয়ম করে রাত জাগি। সারাবছর হোয়াটস্যাপের স্টেটাসে রোনাল্ডোর খেলার পুরনো ছবি ভিডিও শেয়ার করতে থাকি। একবগ্গা জেদে জেনজি বন্ধুদের সাথে তক্ক জুড়ি, এসব এমব্যাপে ফ্যাপে আর কী এমন, পড়তিস মালদিনির পাল্লায়, বুঝতিস! জানিস, আমার নায়ক মালদিনি নেস্তা বুফোঁকে কাটিয়ে বলে বলে গোল দিতো, পারবে তোর এমব্যাপে??

*

তারপর হাসি পায়। আসলে তো আমি এমব্যাপের বিরুদ্ধে লড়ছি না, লড়ছি আমারই বড় হয়ে যাওয়া আমিটার বিরুদ্ধে। আমার শচীন-সৌরভ-বাইচুংদের অটোগ্রাফের খাতাটা স্কুলব্যাগের মধ্যে আজও যত্ন করে রেখে দেওয়ার জন্য লড়ছি। অঞ্জন দত্তর গানের ক্যাসেটটার ধুলো ঝেড়ে রাখার জন্য লড়ছি। ডবলডেকার বাস আর এসটিডি বুথগুলোকে হারিয়ে না যেতে দেওয়ার জন্য লড়ছি। পড়ার বইয়ের ভিতরে রেখে দেওয়া শুকতারাটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য লড়ছি। বাড়ির ছাদে মেঘ করলেও হাসতে হাসতে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাডেনিয়ামের টবটাকে আগলে রাখার জন্য লড়ছি। এই পালটে যাওয়া দিনকাল দেখে একেকসময় মনে হয়, রিপ ভ্যান উইঙ্কলের মতো বোধহয় ঘুমিয়ে পড়লেই ভাল হতো!

সেই 'BRASIL' লেখাটা বাড়ির দেওয়ালে ছিল অনেকদিন। এবছর রাজনীতির কাজ, দৌড়ঝাঁপের মধ্যে আর হলুদ-সবুজ পতাকায় সাজানো হয়নি বারান্দা। মনেপ্রাণে চাইব, ওই জার্সিতে ছ'নম্বর তারাটা উঠে যাক এবারই। যখন যে কাজেই থাকি, কোনো খেলার মাঠের পাশ দিয়ে গেলে ধুলো কাদা মাখা একঝাঁক ফড়িংকে একখানা বল ঘিরে হুজ্জুত করতে দেখলে চোখ আটকে যায়। কতবার হয়েছে, ভোটের প্রচার করতে করতে মাঠে নেমে নির্লজ্জের মতো বলেছি, ভাই একটা শট মারতে দিবি? 

তারা হেসে বল বাড়িয়ে দেয়। গোলে শট মারার আগে ডি বক্সের আশপাশে আকুতি নিয়ে তাকাই। খুব ইচ্ছে করে, একটা ৯ নম্বর জার্সি পরা দোহারা চেহারার ন্যাড়াটে ছেলে হঠাৎ ডি বক্সে ঢুকে পড়ুক, আমিও শেষ মুহূর্তে প্ল্যান চেঞ্জ করে শট না মেরে দক্ষ সেটপিস মেকারের মতো পাস বাড়িয়ে দিই তাকে, তারপর দুজনে মিলে তর্জনী তুলে ডানামেলা হিল্লোলে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে যাই উদ্বেল জনতার দিকে। গোওওওওওওলাসো!

হয় না। রূপকথার বাঁশিওয়ালা মাটিতে আর নেমে আসে না। যাক, যা গেছে তা যাক।