উদ্দালক ভট্টাচার্য: এমন ঘটনা বাংলার রাজনীতিতে আগে দেখা যায়নি। ভোটে জয় পরাজয় থাকেই। কিন্তু দলের প্রতি, নিজের রাজনীতির প্রতি সামান্যতম অনুগ্রহ না দেখিয়ে ভোটের ময়দান থেকে পিঠটান দেওয়া যায়, তা বোধহয় এই প্রথম দেখল বাংলার রাজনীতি। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কথা শোনার তোয়াক্কা করলেন না ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান। কার্যত পালিয়ে বাঁচলেন তিনি। যে মুহূর্তে দল ক্ষমতা থেকে দূরে সরে গেল, সেই মুহূর্তে সরে গেলেন তিনিও। মোটেই দেরি করলেন না। এই ঘটনা আরও স্পষ্ট করে দিল, রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি, দলের প্রতি এমনকী নেতৃত্বের প্রতি কোনও আনুগত্য নয়, কেবলমাত্র ক্ষমতার প্রতি আনুগত্যই ছিল এই রাজনীতিকের একমাত্র মূলধন। 

ফলতা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ ছিল আগে থেকেই। সেখানে বিভিন্ন বুথে কারচুপির অভিযোগ ছিল। সেই কারণেই ভোটের পরেই এই আসনে পুনর্নিবাচন ঘোষণা করেছিল কমিশন। সেই ঘোষণার পরেও কিন্তু লড়াইয়ের ময়দান থেকে সরে যাওয়ার কথা ওঠেনি। ৪ মে সরকার বদলের পর থেকেই ধীরে ধীরে পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। এর মধ্যে কয়েকদিন চুপচাপ থাকার পরই হঠাৎ সাংবাদিক বৈঠক করেন জাহাঙ্গির। সেখানে তিনি বলেন, নির্বাচনের লড়াই থেকে সরে আসছেন। পাশাপাশি, মুখ্যমন্ত্রীকে মাননীয় সন্মোধনে তিনি শুভেচ্ছাও জানান। এই ঘোষণার পরেই আবার তীব্র প্রতিক্রিয়া দেয় তৃণমূল। দলের তরফ থেকে জাহাঙ্গিরের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হয়। বলা হয়, যে কর্মীরা এই পরাজয়ের গ্লানি সঙ্গে নিয়েও লড়াই করতে চাইছে, তাঁদের কাছে এই ঘোষণা মর্মান্তিক। দলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ ফেসবুকে ভিডিও পোস্ট করে কটাক্ষ করেন জাহাঙ্গিরকে। 

তৃণমূলের এবারের পরাজয়ের পর বিভিন্ন অভিজ্ঞ সাংবাদিককে বলতে শুনেছি, অভিষেক ব্যানার্জি ও তাঁর দলবদল বিরোধী রাজনীতি তেমন করে করেননি, ফলে তাঁদের অনেকেই জানেন না আসলে কী করে বিরোধী হিসাবে টিকে থাকতে হয়, লড়াই করতে হয়। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি সেই আন্দোলন করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে দাঁতে-দাঁত চিপে লড়াই করেছেন। তাঁরই দলের একজন প্রার্থী এভাবে পিছপা হবেন, কেবল হারের যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে বলে, তা সত্যিই রাজনৈতিক পরিণতি হিসাবে বিরল। বিশেষত তৃণমূলের মতো দলের ক্ষেত্রে এই ঘটনা রাজনৈতিক ভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণও বটে। তবে এটাও মনে হচ্ছে, শুধু জাহাঙ্গির নন, এর আগে ঋজু দত্ত থেকে শুরু করে বিভিন্ন তৃণমূলের মুখপাত্ররা যেভাবে দলের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন, তাতে মনে হচ্ছে, ভিতরে ভিতরে কোথাও একটা ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। কেবল পেয়ে যাওয়ার রাজনীতি, কেবল ক্ষমতা ও সরকার-প্রশাসনের ভেলায় চেপে রাজনীতি করার বেয়াড়া অভ্যাস দলটাকে পরিণত করেছিল একটা স্থবির ঐরাবতে। আর সেই কারণেই যেই পায়ের তলা মাটি সরে গিয়েছে, সরে গিয়েছে নিশ্চিন্ত আশ্রয়, সেই একে-একে সরে যেতে শুরু করেছে সুবিধাভোগীর দল। 

তবে এর পাশাপাশি, বাংলার রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে এক আশ্চর্য ভ্যাকুয়াম বা শূন্যস্থান। বিরোধী হিসাবে দুর্নীতি, অত্যাচার ও ক্ষমতালোভী তৃণমূলকে মানতে চাইছে না বিজেপি বিরোধী জনতা। সেখান দিয়েই প্রবেশ করতে চাইছে বাম শক্তিগুলি। আবারও একের পর এক পুরনো পার্টি অফিস উদ্ধার থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় নেতৃত্বের মাঠে ময়দানে পৌঁছে যাওয়া বাম নেতৃত্ব রাজনৈতিক সমীকরণে বাম শক্তিকে কিছুটা জোর দিতে বাধ্য। 

কিন্তু তৃণমূলের এই পরিণতি বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। বাংলায় কংগ্রেস গিয়েছে, বামেরা এসেছে, বামেরা গিয়েছে, তৃণমূল এসেছে, এবার তৃণমূল গেল বিজেপি এল। কিন্তু যে দলের ৮০ জন বিধায়ক ও ২০-এর উপর সাংসদ রয়েছে, এখনও পুরসভা, পঞ্চায়েত রয়েছে, সেই দলের এক প্রার্থী ভোটের মুখে কেবল রোষের ভয়ে ভোটের লড়াই থেকে সরে দাঁড়াবেন, এ অভূতপূর্ব। মনে পড়ে সেই দিনটির কথা, যেখানে সমস্ত আসনে হেরে তৃণমূলের কপালে কেবল একটি সংসদীয় আসন জুটেছিল, আর সেই আসনটি জিতেছিলেন মমতা ব্যানার্জি নিজে। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে রাজ্যের সরকার গঠন করার ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন তিনি। আর তিন দফায় ক্ষমতায় থাকার পর তাঁর দলেরই কী পরিণতি হল! ক্ষমতা ও প্রশাসনের নিরাপত্তায় থাকা তৃণমূল বোধহয় ভুলে গিয়েছিল আসলে রাজনীতি করতে হয় মাঠে ময়দানে। জাহাঙ্গিরের মতো ক্ষমতালোভী মানুষকে তাই নেতা তৈরি করলে এমন পরিণতি হওয়া সময়ের অপেক্ষা।