শুভ্রদীপ্ত ভট্টাচার্য সুমন

কাবাবের দোকানটার পাশ দিয়ে যেই রাস্তাটা সোজা চলে গেছে সাঁইবাবার মন্দিরের দিকে, সেই মন্দিরের গায়ে লাগোয়া, নাইল অ্যাপার্টমেন্টই এখন স্নিগ্ধার ঠিকানা বিয়ের পর থেকে । এটা সেক্টর ৪৯, গুরগাওঁ । আর অফিস সেই সাইবারসিটি । সকালে অফিস যেতে প্রায় সময় লাগে ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা । তবু শীত - গ্রীষ্ম - বর্ষা, বাসে কিংবা অটো করেই যাতায়াত করে স্নিগ্ধা ।
            
বাড়িতে যদিও গাড়ি ২টো , তাছাড়া বিয়ের আগে কেনা নিজের স্কুটিটাও রয়েছে । নেই শুধু চড়ার কিংবা চালানোর পারমিশন । 

টক-ঝাল-মিষ্টি

সেই ২০১৯ এ প্রথম বাড়ির বাইরে যাওয়ার সুযোগটা এসেছিলো, চাকরি সূত্রেই। কলকাতা শহরটা ছাড়ার এক মরিয়া চেষ্টা যেন সফল হয়েছিল । কলেজের পরে যেমনটা আশা করেছিল, ঠিক তেমন চাকরিটা হয়নি কারোরই । আর তাই অনেকেই ছিটকে গেলো এদিক ওদিক, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু ,মুম্বাই, দিল্লি ,চেন্নাই । ভাগ্যদেবতা কেবল স্নিগ্ধার কপালেই বোধহয় কোনও সুযোগ লিখতে ভুলে গেছিলো  । কিন্তু তাই বলে দমে যাওয়ার পাত্রী স্নিগ্ধা নয় ।দাঁতে দাঁত চেপে ২ বছর একের পর এক ইন্টারভিউ দিয়ে গেছে । কখনো প্রথম রাউন্ড ক্লিয়ার করেও বাদ পড়েছে তো কখনো একেবারে লাস্ট রাউন্ডে গিয়ে। যখন নিজেও মনে মনে এক রকম নিশ্চিত হয়ে গেছে হয়তো চাকরিটা এবার পেয়েই গেলো বুঝি,ম। ঠিক তখনি হঠাৎ মোবাইলে টুংটাং শব্দ করে  অ্যাপোলোজি ই মেইল ঢুকেছে । হতাশায় কান্নায় ডুকরে উঠেছে মন।ফ্যাল ফ্যাল চোখে আশা নিয়ে তাকিয়ে থেকেছে বাবা, মা । 
ঠাকুরের ছবিটার সামনে বসে গোমড়া মুখে, দু চোখ বুজে ভিতর থেকে ডেকেছে মা কালীকে, চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে দু গাল ভিজিয়ে দিয়েছে রাতের পর রাত । পাড়ায় বেরোতে লজ্জা করতো একটা সময়ের পর ।কোনো অনুষ্ঠান বাড়ি অ্যাটেন্ড করাও বন্ধ হলো একটা সময় । চূড়ান্ত ইনফেরিওর কমপ্লেক্স আর প্রগাঢ় আন্ডার কনফিডেন্স যেন গিলে খেত স্নিগ্ধাকে সারাটা দিন । 
কিন্তু কথায় আছে, বেটার বি লেট দ্যান নেভার । 
সেই গুরগাওঁ যাওয়া । অ্যাসিস্ট্যান্ট এইচ-আর, মাত্র ৩৫ হাজার মাইনে , কিন্তু তাই বা মন্দ কি ! চাকা তো গড়ানো শুরু হলো । মধ্যমগ্রামের মেয়ে । যার দৌড় বলতে কলকাতা ছাড়া, ২বার দার্জিলিং আর ১বার করে পুরী, দীঘা , মন্দারমণি - ওই  অবধিই । সেই স্নিগ্ধা তো প্রথম বার সাইবারসিটি দেখেই হাঁ । সন্ধ্যের পরে জায়গাটা তো পুরো মুভিতে দেখা বিদেশ মনে হত ওর। 
প্রথম দিনটা অফিসের এখনো মনে আছে স্নিগ্ধার । যেন অনেকটা প্রথম দিন কলেজের মতন, নিয়ম কানুন জানা নেই কিছুই, মনের মধ্যে একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া কাজ করছে , কিছুটা ভয় কিছুটা উত্তেজনা । কিন্তু সেটেল হতেও সময় লাগলো না খুব বেশি। সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই বেশ বাঙালি- অবাঙালি সব তেলে জলে মিশে গেলো ।
অফিসের কাছেই একটা লেডিস পিজি ভাড়া নিয়ে দিব্বি ছিল স্নিগ্ধা । দিনে প্রায় ৪-৫ বার করে মায়ের সাথে কথা হয় , রাতে বেশির ভাগ দিনই ভিডিও কলে বাবার সাথেও গাল গপ্পো সারা হতো দিব্বি । উইকেন্ড গুলোয় প্রথম প্রথম আসে পাশেই টুকটাক বেড়াতে যেত পিজির বন্ধুদের সাথে। কিন্তু বছর ঘুরতেই একটা প্রোমোশনের হাত ধরে বাড়লো মাইনে বেশ কিছুটা ।
 স্নিগ্ধাকে আর ধরে রাখে কে? কখনো মুসৌরি ,কখনো শিমলা ,তো কখনো রাজস্থান তো কখনো কাসল । কখনো বন্ধুদের গ্রুপে, তো কখনো সোলো ট্রিপ । স্বপ্নের মতন  যেন সেই সব দিনগুলো , আনন্দ যেন পুরোনো সব স্ট্রাগেল, সব হতাশা, সব না পাওয়া গুলোকে দুহাত ভোরে পুষিয়ে দিলো ।

আর পাঁচটা বস্তা পচা গল্পের মতোই গুটি গুটি পায়ে ধেয়ে এলো প্রেম স্নিগ্ধার জীবনেও, শিবমের হাত ধরে । ক্রসফাঙ্কশনাল সিনিয়র শিবম , অফিস ফ্লোরে ৪টে বে পরেই ওর সিট । প্রথম সপ্তাহেই আলাপ। এইচ আর হওয়ার সুবাদে প্ৰায়ে অনেকের সাথেই, শিবমকে আলাদা করে খেয়াল করেনি স্নিগ্ধা। শিবম করেছিল ।
ছুতোয় নাতায় কথা বলা , লক্ষ্য রেখে একই সময় ক্যান্টিনে যাওয়া কিংবা বিকেলের চায়ের ব্রেকে ঠিক চায়ের কাপ হাতে গদ গদ মুখ করে এইচ আর দের গ্রুপের সাথে জোর করে আড্ডা মারা - এই দিয়েই শুরু ।
বুঝতে কি পারতো না স্নিগ্ধা ? বুঝতো ঠিকই, কিন্তু সবার মাঝে এই এক্সট্রা অ্যাটেনশনটা দিব্বি এনজয় করতো মনে মনে । বুঝতে শুরু করলো ওর কলিগরাও, টিটকিরি মারা, পেছনে লাগাও শুরু হলো ।  আর শুরু হলো হালকা হালকা আসক্তি স্নিগ্ধার মনেও । হঠাৎই যেন চোখ চলে যেত শিবমের সিটটার দিকে নিজের অজান্তেই । চোখে চোখ কখনো হলে একটা অদ্ভুত ধুকপুকানি  হতো মনে।ঠোঁটের কোনায় ভেসে উঠতো মুচকি হাসি । কোনও গ্রুপ মিটিংয়ে  শিবম যেন অন্য একটা মানুষ, কাজের ব্যাপারে যথেষ্টই সিরিয়াস ম্যাচুওর্ড রেস্পন্সিবল ।
 স্নিগ্ধা মুগ্ধ হয়ে, হাঁ করে শুনতো শিবমের নির্ভুল সাবলীল ইংরেজিতে একটানা প্রেসেন্টেশন কিংবা কোনও ডিবেট । এই শিবমই নাকি ওকে লাইক করে, ভাবলেই যেন সেই মন ভালো করা অনুভূতিটা নেমে আসতো সারা শরীর জুড়ে ।
কি থেকে কি হয়ে গেলো- এখন ঠিক মনেও পড়েনা স্নিগ্ধার । কি করে যে ওদের আলাদা করে লাঞ্চে যাওয়া শুরু হলো। একসাথে বিকেলের চা ।আর তারপর প্রতিদিন পিকআপ অ্যান্ড ড্রপ । বন্ধুত্ব দিয়েই শুরু হয় সবারই, ওদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলোনা । তবে কোথায় যেন একটা মিসিং লিংক কিছুতেই ধরতে পারেনি স্নিগ্ধা , মনটা খুঁত খুঁত করেছে ঠিকই কিন্তু সে সব টাই ইগনোর করেছে নিজের ওভারথিঙ্কিংয়ের দোহাই দিয়ে ।
এ যেন একটা অন্য রকম জীবন। মধ্যমগ্রামের কিংবা কলকাতার দিনগুলোর থেকে এক্কেবারে আলাদা । উড়ন্ত মন যেন সব কিছুই পেতে চায় হাতের মুঠোয়। নাগালের তোয়াক্কা না করেই । চাকরি বজায় রেখেই একটা দারুন জীবন গুছিয়ে নেওয়া যেন নিজের জন্য। নিজের মতন করে । নিজের মতন বই পড়া।ছবি আঁকা। ইচ্ছে হলে কোথাও থেকে বেরিয়ে আসা।আর তার সাথেই বন্ধু বান্ধব আর একটা সদ্য গজিয়ে ওঠা ইনফাচুয়েশন । হয়তো স্বাধীনতার এই স্বপ্নই দুচোখ ভোরে দেখতো ৩ বছর আগের মেয়েটা । হয়তো কেন, নিশ্চই এই স্বপ্নই ।

ধিক্কার

সোমবার সকাল, বিয়ের পর কেটে গেছে তিনটে মাস । তুমুল ঝগড়া ঝামেলা অশান্তি করে অবশেষে স্নিগ্ধার শর্ত পূরণ হয়েছে - নিজেদের আলাদা ঠিকানা হয়েছে । প্রথম থেকেই শ্বশুর বাড়িতে না থাকার একটা অদম্য জেদ ছিল ওর। কাছাকাছি থাকতে বাধা নেই কিন্তু একসাথে নয় । ওর নিজের যুক্তি ব্যাখ্যা আছে বটেই , কিন্তু শিবম ঠিক কোনওদিনই এই একটা ব্যাপারে রাজি ছিল না । শেষে রাজি হতেই হয়েছে।একই কমপ্লেক্সেই অন্য অ্যাপার্টমেন্টে শিফট হতে । এই ৭দিন হয়েছে এই নতুন অ্যাপার্টমেন্টে দুজনের নিজের সংসার । কিন্তু এই ৭দিনে শিবম প্রায় রোজই পরে থেকেছে পুরোনো ফ্ল্যাটেই । মাত্র ৩ রাতে শুতে এসেছে, বাকি দিনগুলো বাপ মায়ের কাছেই ।

সকালে উঠে যখন স্নিগ্ধা রেডি হচ্ছে তখনই কোনও এক ছোট বিষয় নিয়েই বাধলো আবার ঝগড়া । স্নিগ্ধা যেন এই ৩ মাসেই ক্লান্ত হয়ে গেছে ।সারাদিন মুখোমুখী হলেই অশান্তি, ঝগড়া আর পোষায় না, জাস্ট । পেছনে শিবম যখন তারস্বরে চিল্লাচ্ছে , স্নিগ্ধা কোনও কথাই কানে না তুলে দিব্বি রেডি হচ্ছিলো । এমনিতেই হাজারটা কাজ থাকে সোমবার।বেরোতে হয় তাড়াতাড়ি । তাই কোনও  কথা তেমন গুরুত্ব দিয়ে শোনার সময়ও ছিলোনা । আচমকাই ঘরে ঢুকে এলো শিবম , স্নিগ্ধার স্কুটির চাবিটা নিয়ে বেরিয়ে গেলো । স্নিগ্ধা এবার প্রতিবাদে বেরিয়ে আটকাতে গেলো শিবমকে,ম। আর তখনি প্রথম নেমে এলো সেই অকল্পনীয় মুহূর্তটা । শিবম ঘুরে কষিয়ে দিলো ঠাটিয়ে এক চড়, স্নিগ্ধার গাল বরাবর । স্নিগ্ধা এক্কেবারে হতবাক । মুখের উপর দড়াম করে মেইন ডোরটা বন্ধ করে বেরিয়ে গেলো শিবম।
দুঃখ্যে -অপমানে- রাগে যেন একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে বসে পড়লো স্নিগ্ধা । শেষ কবে সেই ছোটবেলায় বাবা মায়ের হাতে মার খেয়েছে, ঠিক মনে পড়লো না । এটাকি জমে থাকা রাগের বহিঃপ্রকাশ? কারণ ভুল বসত তো একেবারেই নয় । মুখে মেকআপটা একটু চড়া করেই পাঁচ আঙুলের ছাপ ঢেকেছিলো সেদিন স্নিগ্ধা । বাড়ি ফিরে শিবমকে পায়নি যে অভিমান দেখাবে ।
পরে বুঝেছিলো সেদিনের সেই চড়টা মোটেও ভুল কিংবা হঠাৎ  কোনও ঘটনা ছিলো না । এরপর থেকে গত একবছরে প্রায়ই মার খায় স্নিগ্ধা , কখনো মাথা বেশি গরম হয়ে গেলে প্রতিবাদ করে কিংবা নিজেও বসিয়ে দিয়ে কিল, চড় ,লাথি একাধটা । অবশ্য শিবমের সাথে ও পারবে কেন গায়ের জোরে ? শিবম চতুর্বেদীর নেহাতই জিম করা মেইন্টাইনেড বডি, তার সামনে তো স্নিগ্ধা রীতিমতো দুর্বল ।
মা একদিন ভিডিও কলে দেখে ফেলেছিলো কালশিটে খানা, মিথ্যে গল্প দিয়েছিলো স্নিগ্ধা । শ্বশুর - শাশুড়িকে বলাতে ওরা তো হেসেই কুটোপাটি, যেন বাচ্চা ছেলে এই বয়েসে এরম দুস্টুমি করেই থাকে । শাশুড়ি আড়ালে বলেছিলো, এক সময়ের সেন্ট্রাল গভমেন্টের চিফ ইঞ্জিনিয়ার  শ্বশুরও নাকি প্রথম ১০-১২ বছর খুব মারতো, তারপর আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে গেছে যেমনি শিবম বড়  হয়েছে । উপদেশ দিয়েছিলো দুজনে মিলে একটা বাচ্ছা করে নেওয়ার, তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে । শাসন তো করেই নি উল্টে জাস্টিফাই করেছিল, ডিফেন্ড করেছিল । গা শিউরে উঠেছিল স্নিগ্ধার রাগে - ঘেন্নায় ।
মায়ের কাছে এই নালিশ করায় বেধড়ক পিটিয়েছিল শিবম, প্রায় দুদিন শরীরে ব্যাথা আর মনে ভয় নিয়ে শিটিয়েছিলো স্নিগ্ধা । এরপর আর কারো সাথে এই ব্যাপারে কথা বলার সাহস জুটিয়ে উঠতে পারেনি । একটাই মূল অপরাধ স্নিগ্ধার, বাপ মায়ের থেকে ছেলেকে আলাদা করা , এই পাপই যেন আমূল বদলে দিলো শিবমকে, বদলে দিলো স্নিগ্ধার জীবন। 
এবং দিন দিন অত্যাচারের মাত্রা বেড়েই চলল; রুখে দাঁড়ালেই নেমে আসত আরও পাশবিক নির্যাতন, কখনো জুতো দিয়ে পিটিয়েছে তো কখনো বেল্ট দিয়ে। তবে সবচেয়ে উল্লাস পেতো শিবম যখন চুলের মুঠি ধরে দেয়ালে ঠুকে দিতো স্নিগ্ধার মাথা কিংবা ইস্তিরি টা গরম করে বসিয়ে দিতো স্নিগ্ধার পায়ের থাইয়ে । আর্তনাদে কেঁদে উঠতো স্নিগ্ধা, শিবম ক্যাসুয়ালি সোফায় বসে টিভি চালিয়ে দিতো জোরে । এতবড়ো সোসাইটিতে ওদের একটা সন্মান আছে বলে কথা।কেউ এরম চিৎকার শুনুক ওদের বাড়ি থেকে সেটা মোটেও ভালো দেখায় না ।

উইকেন্ডগুলো এভাবেই কাটতে লাগল স্নিগ্ধার; তাই শুক্রবার বিকেল থেকেই সে মাসের পর মাস প্রায় এক কোণে সিঁটিয়ে থাকতে লাগল।

খটকা

২০২৪এর পুজোয় শেষ বাড়ি গেছে স্নিগ্ধা। একে তো একবার অশান্তি সহ্য না করতে পেরে বলেছিলো ছেড়ে চলে যাবে কলকাতায়, আর সেই শুনে শিবম সাড়াশি দিয়ে বাঁ হাথের কোরে আঙ্গুলটা এমন ভাবে চিপে দিয়েছিলো যে প্রায় ৭দিন ফুলে ছিল আঙ্গুলটা । অফিস যেতে সে কি অনীহা, প্রতিদিন ঢেকেঢুকে যেতে হয় লজ্জায় । সে নাহয় একরকম, কিন্তু তাইবলে সারা শরীরে কালশিটে নিয়ে বাপ মায়ের সামনে দাঁড়াবে কোন মুখে? কাহাতক ঢেকে রাখা সম্ভব নিজেকে, বাড়ির মধ্যে ২৪ঘন্টা ?
তবে সন্দেহ বেশ অনেকদিন ধরেই দানা বেঁধেছিলো বাপ মায়ের মনে । গোড়ার দিকে মায়ের উদ্বেগকে অমূলক বলে উড়িয়ে দিয়েছে বাবা বেশ কয়েকবার, এমনকি প্রদোষ মিত্তিরের স্টাইলে বলেছেন, গন্ডগোল। বিস্তর গন্ডগোল ।
 কিন্তু মাস খানেক পরে থেকে তার নিজেরও খটকা লাগলো, সেই বিয়ের সময়ের হাসি খুশি প্রাণোজ্জ্বল কুঁড়িটা যেন ফোটার আগেই মিইয়ে যাচ্ছে দিন দিন । কথা কমিয়ে দিয়েছে বাড়িতে, ভিডিও কল প্রায় করে না বললেই চলে, কালেভদ্রে কখনো করলেও ২-৪ মিনিটের মধ্যেই কেটে দেয়। জীবনের ৬০-৬৫টা বছর পোড়খাওয়া মানুষ দুটোর চোখে ধুলো দেওয়া অতটাও সহজ নয় ।
বেশ কিছু মাস ধৈর্য ধরে শেষে একদিন কল করলেন জামাইকে । ছেলেটাকে ভারী মিষ্টি লেগেছিলো সবারই বিয়ের সময়। যেমন সুঠাম শরীর ।তেমনি সুন্দর মুখশ্রী।আর ব্যবহারটাও কি চমৎকার । নম্র ,ভদ্র, শিক্ষিত-  এরম একজন মানুষ - হলোই নাহয় তার ভাষা আলাদা - যে তাদের কপালে ছিল জামাই রূপে, তা যেন তাদের বিশ্বাসই হয়নি । সক্কলে হিংসেও করেছিল নিশ্চই, পাড়া প্রতিবেশী তো গুণগানে পঞ্চমুখ - কি আনন্দটাই না পেয়েছেন বাবা মা তখন, গর্বে যেন বুক ফুলে উঠেছে । বাবা বলেছিলেন মনে হচ্ছে আমি ভাগ্যলক্ষী বাম্পার লটারি জিতে গেছি।
সেই জামাই নাকি আজ ফোন করায় শুধু বিরক্তই হয়নি বরং কড়া গলায় শুনিয়ে দিয়েছে মেয়ের ত্যাঁদরামো বাড়লে লাথি মেরে বের করে দেবে বাড়ি থেকে ।
পরে স্নিগ্ধাও ফোন করে বারণ করে দিলো আর কোনোদিন জামাইকে ফোন না করতে । সেই কি ভয়ানক আর্তি মেয়ের, শুনে যেন দুরমুশ পেটানোর অনুভূতি হয়েছিল বুকের ভিতর । তাহলে কি মেয়ের সংসারে অশান্তি? মেয়ে সুখে নেই ? যেমনটা তারা দূর থেকে ভাবে তেমনটা কি নয় ছবিটা? দুশ্চিন্তায় ঘুম ছুটে গিয়েছিলো বুড়ো বুড়ির । সুদূর ১৫০০ কিমি দূরে বসে তাদের এখন কি করণীয় তাই ঠিক করে উঠতে পারেনি । মিনমিনে গলায় একবার বাড়িতে ফেরার আর্জি করেছিল মেয়ের কাছে, কিন্তু লাভ হয়নি, বড্ডো ছেঁদো অজুহাত দিয়ে এক নিমেষে খারিজ হয়ে গেছে সেই আর্জি । পরিস্থিতি মোটেও সুবিধের ঠেকেনি বুড়ো বুড়ির কাছে ।

বুমেরাং

দিনটা বুধবার, জানুয়ারির শুরু, সবে ৭দিন হয়েছে নতুন বছর পড়েছে। গুরগাওঁ তে তখন টেম্পারেচার রাতে ৫ ডিগ্ৰী অবধিও নামছে।  তবে দিনের বেলায় দিব্বি ঠান্ডা ঠান্ডা মন ভালো করা আবহাওয়া। রাতে, ভীষণ জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছিলো স্নিগ্ধার, এই দিনের বেলাটায় সে কিছুটা ভালো থাকে। গত দুদিন ছুটি নিতে হয়েছিল অফিস, সিক লিভ। আজ অনেকটা ভালো বোধ করায় আজ অফিস যাবে বলেই রেডি হচ্ছিলো। শিবম সেই যে মারধর করে জ্বর বাধিয়ে দিয়ে গেছে, আজ ৪দিন প্রায় এই ফ্ল্যাট মুখো হয়নি। 
কুর্তিটা আর জিন্সটা গায়ে চড়িয়ে, হাতে পায়ে মলম লাগিয়ে প্রায় যখন রেডি ঠিক তখনি কলিং বেলটা বেজে উঠলো । শিউরে উঠলো স্নিগ্ধা। সারা গায়ে কাঁটা দিয়েছে, হাত দুটোও যেন কাঁপছে, পা স্থির এগোতেই চাইছেনা দরজার দিকে। শরীরটা আবার খারাপ লাগছে খুব, প্যানিক এটাক এলো বুঝি। তবে যে আজ ঠিক করেছিল অফিস যাবে, সেটা বোধয় আর হলোনা।

ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে, আস্তে করে দরজা খুলেই চমকে উঠলো স্নিগ্ধা। একটা বিচ্ছিরি দেখতে লোক দাঁড়িয়ে দরজায়, পরনের উর্দিটা দেখে সম্বিৎ ফিরলো স্নিগ্ধার - পুলিশ কনস্টেবল। হকচকিয়ে স্নিগ্ধা কিছু বলার আগেই, পুলিশ বাবাজি জানিয়ে দিলেন তার ডাক পড়েছে চতুর্বেদীদের ফ্ল্যাটে,মানে প্রাক্টিক্যালি ওর শ্বশুর বাড়িতে । প্রথমটায় কিছুই বুঝে উঠতে পারলোনা স্নিগ্ধা।ফোন না করে চাকর কে দিয়ে না ডাকিয়ে, একেবারে পুলিশ পাঠালো বাড়িতে? তাও আবার দুটো বিল্ডিং ছেড়ে তৃতীয় টাওয়ারটায় যাওয়ার জন্য? ভয় বুক ধড়াস ধড়াস করছে স্নিগ্ধার, কি নতুন উপদ্রপ কে জানে। জ্যাকেট একটা গায়ে চাপিয়ে নিলো স্নিগ্ধা।
পুলিশের গাড়িটা নিচেই দাঁড়িয়ে রয়েছে, পাশে একটা অ্যাম্বুলেন্স। চোখে পড়তেও মাথা কিছুই কাজ করছেনা স্নিগ্ধার, ধীর পায়ে আসামির মতন, লিফ্ট ধরে কনস্টেবলের পেছন পেছন চুপচাপ এসে হাজির হলো ৬ তলায় শশুরবাড়িতে। বাইরে দুটো তিনটে মানুষের জটলা। পুলিশ এলে এমন জটলা স্বাভাবিক, গসিপের গন্ধে গন্ধে ঠিক হাজির হয়ে যায় লোকজন।
ঘরের মধ্যে শ্বশুর-শাশুড়ি-মামা শ্বশুর ও আরো কিছু কাছের আত্মীয়, কেউ দাঁড়িয়ে কেউ বসে ঘিরে রয়েছে খাটটা কে।  খাটে ফুল দিয়ে সাজানো চলছে শিবমের নিথর দেহটা। সেই স্নিগ্ধ সৌম্য মুখ, যেন সেই ৫বছর আগের মানুষটা। স্নিগ্ধা কিছুক্ষন গুম মেরে দাঁড়িয়ে থাকলো, কানে এলো অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছে কাল, পোস্ট মর্টেমের পর বডি এসেছে আজ। আড় চোখে কটমট করে স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়েই শাশুড়ি যেন জলে উঠলো তেলে বেগুনে, অনর্গল বলতে লাগলো - য়ে ডায়েন মেরা রাজা বেটা কো খা গায়ি।
আর কেউ কিছু বলার আগেই সেই একই রকম ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো স্নিগ্ধা ফ্ল্যাট থেকে। পুলিশ জটলা সরিয়ে রাস্তা করে দিলো ওর জন্য। বাড়ির দিকে পা বাড়ালো স্নিগ্ধা। 
নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে ঝুপ করে বিছানায় বসে পড়লো স্নিগ্ধা, পুরো ঘটনাটা মাথায় প্রসেস হতে নিলো প্রায় ৫-৭ মিনিট আর তারপরেই চারিদিক থমথমে করে রাখা কালো বিশাল মেঘ যেমন হঠাৎই অঝোরে ঝরে পরে, তেমনি বাঁধ ভাঙা কান্না যেন  গোটা শরীর মন নাড়িয়ে বেরিয়ে এলো স্নিগ্ধার বুকের অতল থেকে।
প্রাণভরে উঠলো সেই বহু বছর আগের প্রথম চাকরি পাওয়ার আনন্দের মতনই । এও তো এক মুক্তি, এও তো আরেকটা নতুন স্বাধীন জীবনের দোরগোড়া। আনন্দে আত্মহারা হয়ে নেচে উঠলো মন, এই বৈধব্য যেন বহু প্রতীক্ষিত, বহু আকাঙ্খিত। এও যেন আরেকবার ভাগ্যলক্ষী বাম্পার লটারি জেতার মতন।
ফোনটা তুলে ডায়াল করলো মা কে, লাউড স্পিকারে বাবাও আজকাল প্রায়ই থাকেন। 
- কি হয়েছে রে ? গলাটা এরম শোনাচ্ছে কেন ?
- কিছুনা মা, আমি বাড়ি ফিরবো দুয়েক দিনের মধ্যেই।
- সেকি রে হঠাৎ? সব ঠিক আছে তো ?
- হ্যাঁ মা এখন সব ঠিক, সব ফাঁড়া কেটে গেছে, আর কোনো চিন্তাই নেই।
তারপর দুই তরফই চুপ, ভেসে যাচ্ছে শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ, মুছে যাচ্ছে ১৫০০ কিমি দূরত্ব।