অংশুমান কর
সুকুমার সেনের বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস-এর পঞ্চদশ পরিচ্ছেদটির শিরোনাম “চতুর্থ দশকে কবিতা”। গত শতাব্দীর তিনের দশক থেকে কবিতা লিখতে শুরু করা বেশ কয়েকজন কবি, যাঁদের কাব্যপ্রতিভার পূর্ণবিকাশ ঘটছে চারের দশকে, এই পরিচ্ছেদে তাঁদেরই কবিতার আলোচনা করেছেন সুকুমার সেন। এই কবিদের মধ্যে অগ্রগণ্য জীবনানন্দ দাশ। সুকুমার সেন যেভাবে জীবনানন্দ দাশকে পড়েছেন সেই পাঠটি নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ।
জীবনানন্দ সহ তাঁর সময়ের অন্য অনেক কবির ওপরেই যে প্রথম দুই দশকে রচিত ইউরোপ-আমেরিকার কবিতার প্রবল প্রভাব পড়েছিল একথা মেনে নিয়েই জীবনানন্দের কবিতাকে পড়তে শুরু করেছেন শ্রীসুকুমার সেন। এই কারণে এই পরিচ্ছেদের প্রথম অংশে তিনি অনেকখানি জায়গা বরাদ্দ করেছেন ইউরোপ-আমেরিকার নতুন কবিতার (মূলত মর্ডানিস্ট কবিতার) মূল লক্ষণগুলিকে চিহ্নিত করতে। বোঝার চেষ্টা করেছেন কেন সাধারণ পাঠকের এই ধরনের কবিতা পড়ে স্বাদগ্রহণ করতে অসুবিধে হয়। তাঁর চিনতে ভুল হচ্ছে না যে, পাশ্চাত্যের আধুনিক কবিতা কোলাজকে ব্যবহার করেছিল কবিতার শরীর নির্মাণে। সুকুমার সেন লিখেছেন, “নূতন কবিতার এক বিশেষ টেকনিক হইল কবিতায় বিভিন্ন ভাবরূপচিত্রগুলি (images) অখণ্ড একটি চিত্রে মিলাইয়া না দিয়া তাহা অসংলগ্নভাবে জুড়িয়া দেওয়া। এইজন্য এই ধরনের কবিদের বলা হয় 'ইমেজিস্ট'। অসংশ্লিষ্ট ভাবকল্পগুলি পাঠকের মনে পর্যায়বদ্ধ ও শ্লথসংশ্লিষ্ট হইয়া অথবা বিশ্লিষ্ট থাকিয়াই, ইউরোপীয় সঙ্গীতের সিম্ফনির মতো, অনির্বচনীয় অখণ্ড রস সৃষ্টি করিবে। স্থূল উপমা দিয়া বলিতে গেলে ইমেজিস্ট কবি যেন সেই ময়রা যে ছানা চিনি ভিয়ান না করিয়া ছানা ও চিনি একসঙ্গে রাখিয়া অভিনব কাঁচাগোল্লা পরিবেশন করে। ভোক্তার রসনায় এ সন্দেশের স্বাদ নিশ্চয়ই ভিয়ান করা সন্দেশ হইতে একেবারে অন্যরকম।” এরপরে তিনি ইমেজিস্ট কবিদের তিনটি মূল লক্ষণকে চিহ্নিত করছেন, “ইহাদের কাব্যশিল্পের মূলসূত্র হইল তিনটি। প্রথমত, কাব্যের বিষয় ও বস্তু যাহাই হোক তাহাকে কবিমানসের ভাবরসে না জারাইয়া অথবা কবিপ্রসিদ্ধির (কনভেনশনের) পোষাক না পরাইয়া সোজাসুজি ব্যক্ত অথবা প্রতিফলিত করিতে হইবে।… দ্বিতীয়ত, ভাবরূপচিত্রের প্রতিফলন যাহাতে যথাযথ হইতে পারে সেইজন্য শব্দের ব্যবহারে সংযত ও সতর্ক হইতে হইবে। অতএব ইমেজিস্ট কবিকে খুব সন্তর্পণে মুখের ও লেখার ভাষা হইতে শব্দ নির্বাচন করিতে হইবে এবং সে শব্দ এমনভাবে বাছিয়া লইতে হইবে যাহাতে কবি যাহা বলিতে চাহেন তা অতিরিক্ত কিছুমাত্র না বোঝায়।… তৃতীয়ত, সুললিত সুছাঁদ ছন্দ ছাড়িয়া দিয়া অসম ও তালকাটা অছন্দ অবলম্বন করিতে হইবে। ইমেজিস্ট কবির ছন্দের মান মাত্রা অথবা অক্ষর ধরিয়া নয়, বাক্যাংশ ধরিয়া। অর্থাৎ তাহা গদ্যের ছন্দের সঙ্গে তুলনীয়।” এবং এরপরে তিনি বেশ জোরের সঙ্গে ঘোষণা করছেন, “অতএব নূতন কবিতা সকলের জন্য নয়, অধিকাংশের জন্যও নয়, অতি অল্পসংখ্যকের জন্য । নূতন কবিরাও বোধ করি তাহাই চান।” বলা বাহুল্য বারে বারে ইমেজিস্ট শব্দটি ব্যবহার করলেও তিনি আসলে যা বলেছেন তা প্রযোজ্য আধুনিক কবিতার সম্বন্ধে। আধুনিক কবিরা যে সকলেই ইমেজিস্ট ছিলেন, এমনটা নয়। তাঁদের সকলের কাছেই যে ছন্দ এবং অন্ত্যমিল পরিত্যজ ছিল, তাও নয়। কেবল এলিয়টের কবিতা থেকেই নিখুঁত ছন্দ এবং দুরন্ত অন্ত্যমিলের একাধিক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। তবে এটুকু গোলমাল ছাড়া বাকি কথাটুকু সুকুমার সেন ঠিকই বলেছিলেন। স্পষ্ট করেছিলেন যে, এই ধরনের আধুনিক কবিতার উপভোক্তা হবেন হাতে গোনা কয়েকজন দীক্ষিত পাঠকই।
প্রশ্ন হলো, আধুনিক বাংলা কবিতার ওপর একটি পরিচ্ছেদে তিনি এতখানি জমি কেন ছাড়লেন ইউরোপ-আমেরিকার কবিতাকে? কারণ তিনি চারের দশকের কবিদের বিশেষ করে জীবনানন্দ দাশের কবিতার ওপরে পাশ্চাত্য কবিদের প্রভাবকে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করতে চাইছিলেন। জীবনানন্দ দাশের ওপর পাশ্চাত্য কবিদের প্রভাব নিয়ে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু গবেষনা হয়েছে। জীবনানন্দ দাশের এবং পাশ্চাত্যের বেশ কয়েকজন কবির কবিতার পঙ্ক্তি পাশাপাশি তুলে ধরে অনেকেই দেখাতে চেয়েছেন কীভাবে পাশ্চাত্যের কবিরা জীবনানন্দকে প্রভাবিত করেছেন। সুকুমার সেন কিন্তু এই পথে হাঁটেননি। তিনি মুখ্যত দেখাতে চেয়েছেন জীবনানন্দের কবিমানস কীভাবে নির্মিত হয়েছে পাশ্চাত্য কবিদের প্রভাবে; তাঁর কবিতার গঠনই বা কতখানি পাশ্চাত্য কাব্যদর্শনের দ্বারা প্রভাবিত। মনে রাখা প্রয়োজন যে, ১৯৫৮ সালে সুকুমার সেনের বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস-এর পঞ্চম খণ্ডটি যখন প্রকাশ পেয়েছিল, তখনও জীবনানন্দ দাশের ডায়ারিগুলি আমাদের সামনে আসেনি। তখনও আমরা জানিনি যে, এমনকি সমসাময়িক কবি-উপন্যাসিকদের বইপত্রও কী জাদুবলে সংগ্রহ করে নিয়ে পড়ে ফেলেছিলেন জীবনানন্দ। জীবনানন্দের কবিতায় পাশ্চাত্যের আধুনিক কবিতার প্রভাব নিয়ে ঠিক কী লিখেছিলেন সুকুমার সেন? লিখেছিলেন, “‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র কবিতায় জীবনানন্দ স্পষ্টভাবে ইমেজিস্ট কাব্যশিল্পের উপর নির্ভর করিয়াছেন, এবং কবিমানসের ব্যর্থতাবোধে (frustration) যেন বেদনাকাতরতায় (morbidity) পরিণত হইতে চলিয়াছে। নিজের মুডকে কবি প্রকাশ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন খণ্ড খণ্ড চিত্ররূপ ও ভাবরূপ দিয়া, এবং এ চিত্র ও ভাবরূপ কবিমানসে যেমন অসংলগ্ন অথচ সমাবস্থায়ী (coexistent) কবিতায়ও তেমনি অসংপৃক্ত রূপে প্রকটিত। এক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ব্যঞ্জনার শব্দকে অপর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ব্যঞ্জনায় ব্যবহার করিয়া কবি আপনার নিগূঢ় অনুভূতিকে ব্যক্ত করিতে প্রয়াস পাইয়াছেন”। জীবনানন্দের কবিতায় পাশ্চাত্যের আধুনিক কবিতার বেদনাকাতরতার প্রকাশ দেখেছেন সুকুমার সেন। এই পর্যবেক্ষণটি একেবারেই ফেলে দেওয়ার নয়। যেমন অনেক কবিতাতেই যে জীবনানন্দ কবিতার শরীর নির্মাণ করতে গিয়ে কোলাজ পদ্ধতির ব্যবহার করেছেন–এই যে দাবিটি সুকুমার সেন করছেন, সেটিও একটি সঙ্গত দাবি।
জীবনানন্দের বাকপ্রতিমা নির্মাণে যে পাশ্চাত্যের প্রভাবকে অস্বীকার করতে পারেনি, সেটিও বেশ স্পষ্ট করেই বলেছেন সুকুমার সেন। লিখেছেন, “ইহার মধ্যে অবশ্যই ইংরেজীর অনুকরণ আছে, এবং তাহা সর্বদা বিসদৃশ না হইলেও প্রায়ই মুদ্রাদোষে পরিণত হইয়াছে। ‘নরম জলের গন্ধ’; ‘বাতাসে ঝিঁঝিঁর গন্ধ’; ‘হাঁসের গায়ের ঘ্রাণ’; ‘ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল’; ‘চারিদিকে পিরামিড কাফনের ঘ্রাণ’; ‘শরীরে মমির ঘ্রাণ আমাদের’; ‘পেয়েছে ঘুমের ঘ্রাণ’; ‘স্নান বাঁকা নিস্তব্ধতা’; ‘সোনালী চিল’’ (golden eagle) ইত্যাদি”। আরও লিখেছেন, “একই শব্দের পৌনঃপুনিক ব্যবহারেও নূতনরীতির ইংরেজী কবিতা হইতে গৃহীত কৌশল অনুকৃত । যেমন
পৃথিবীর সেই মানুষীর রূপ?
স্থূল হাতে ব্যবহৃত
ব্যবহৃত—ব্যবহৃত-
ব্যবহৃত ব্যবহৃত হয়ে
আগুন বাতাস জল; আদিম দেবতারা হো হো করে হেসে উঠল: ব্যবহৃত—ব্যবহৃত হয়ে শুয়ারের মাংস হয়ে যায়?”
এও মনে রাখা প্রয়োজন যে, যখন জীবনানন্দকে প্রকৃতির কবি ও নির্জনতার কবি হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন বেশ জোরের সঙ্গেই সুকুমার সেন বলতে পেরেছিলেন যে, জীবনানন্দ একজন নাগরিক কবিও বটেন: “পল্লী-পরিবেশ হইতে বিচ্যুত হইয়াই নহে, পূর্ব হইতেই জীবনানন্দের কবিতা শহরের মানুষ-প্রকৃতির দিকে আকৃষ্ট হইতেছিল। ইহার তিনটি হেতু। প্রথমত কলিকাতা বাস, দ্বিতীয়ত নূতন-রীতির ইংরেজী কবিতার দিকে ঝোঁক, তৃতীয়ত রবীন্দ্র-রীতি হইতে সজ্ঞান ও সচেষ্ট অপসরণ।” এই প্রসঙ্গে সুকুমার সেনের আরও একটি আশ্চর্য পর্যবেক্ষণ আমরা পাই। জীবনানন্দের প্রকৃতি প্রেমের কথা সকলেই বলেছেন। সুকুমার সেন বললেন যে, জীবনানন্দের প্রকৃতি প্রেমের মধ্যে মিশে আছে অল্প একটুখানি ভয়, “কবি প্রকৃতিকে ভালোবাসেন, এবং সে ভালোবাসায় ভয়ের ছোঁয়া আছে। সে ভয় যেন শিশুচিত্তের অপ্রসন্নতা”। এই বিষয়টি নিয়ে এখনও সেরকম গবেষণা হয়েছে বলে মনে হয় না। এই দাবিটি করে সুকুমার সেন জীবনানন্দ-পাঠে একটি সম্পূর্ণ নতুন দিগন্ত আমাদের সামনে উন্মুক্ত করেছিলেন।
তবে শুধু কি জীবনানন্দ দাশের কবিতার প্রশংসাই করেছেন সুকুমার সেন? একেবারই তা নয়। তাঁর মনে হয়েছিল জীবনানন্দের কবিতায় প্রকৃতি ‘জ্যান্ত’ নয়, বাঁধা পড়েছে কতগুলি প্রতীকে: “গোবিন্দচন্দ্র দাসের পর জীবনানন্দই একমাত্র কবি যাঁহার রচনায় পূর্ববঙ্গের নিজস্ব প্রাকৃতিক আবেষ্টনের রূপ ও রস ধরিয়াছে। তবে জীবনানন্দের অবলম্বিত বিশিষ্ট শিল্পকৌশলে সে প্রাকৃতিক আবেষ্টন শেষ অবধি কতকগুলি যেন সিম্বলে বিধৃত হইয়া হারাইয়া গিয়াছে। ‘হিজল’, ‘বেতের ফল’, ‘নোনা’’, ‘ঝিরিঝিরি গান করা নদী’’ শেষে হইল ‘ধানসিড়ি’। ঝরা পালক ও মরা হাঁসের উল্লেখ আগেই করিয়াছি”। বোঝাই যাচ্ছে ঠিক যে কারণে জীবনানন্দের কবিতা বিশিষ্ট এবং বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য তাকেই তিনি জীবনানন্দের দোষ বলে চিহ্নিত করেছিলেন।
আরও একটি ভুল তিনি করেছিলেন। জীবনানন্দর তুলনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। বলেছিলেন যে, জীবনানন্দ প্রাণপণে রবীন্দ্রপ্রভাব মুক্ত হতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের সম্প্রসারণ হয়েই থেকে গিয়েছিলেন, “জীবনানন্দ প্রাণপণে রবীন্দ্রনাথকে পাশ কাটাইতে চেষ্টা করিয়াছেন। কিন্তু আসলে তিনি যেন আদান্ত ‘সন্ধ্যা সঙ্গীত’ এর ভাবানুপ্রাণিত। সত্য কথা বলিতে কি ‘ধুসর-পাণ্ডুলিপি’র অনেক কবিতাই যেন সন্ধ্যাসঙ্গীতের অস্ফুট অনভিব্যক্ত অন্তর্যাপ্ত আবেগ বহন করিতেছে। মনে হয় বাল্যে এবং কৈশোরে ‘সন্ধ্যাসঙ্গীত’ জীবনানন্দকে অত্যন্ত আবিষ্ট করিয়াছিল। সে আবেশ কাটিয়া না গিয়া পরে তাঁহার কবিতাকে নিজের হৃদয়গহনে পথে পরিচালিত করিয়াছে। হয়তো এই পরিচালনা সম্ভাবিত হইয়াছিল কোন নিদারুণ দুর্ঘটনায় অথবা নিষ্ঠুর হতাশায় (ফ্রাস্ট্রেশনে)। তাই রবীন্দ্রনাথের কবিতার আনন্দের সৌরকরোজ্জ্বলতা জীবনানন্দের কবিতায় সম্পূর্ণ প্রতিহত। অধিকন্তু তাহা তাহার কবিচিত্তকে বেদনাভারাতুর করিয়াছিল এবং সেই বেদনাভারাতুরতা তাঁহার কবিতায় প্রচুর প্রতিফলিত”। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তুলনা করে তিনি আরও বলেছিলেন, “লক্ষ করিতে হইবে যে, জীবনানন্দের কবিতার ফুল নাই, এবং কবিপ্রসিদ্ধ বসন্তের স্থানে তিনি গ্রহণ করিয়াছেন শরৎশেষ। অবশ্য শেষের ব্যাপার বিলাতি কবিপ্রসিদ্ধির অনুসরণ ছাড়া আর কিছু নয় কেননা আমাদের দেশে অগ্রহায়ণ মাসে সাধারণত গাছের পাতা হলদে হইয়া ঝরিয়া পড়ে না”।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক সুকুমার সেনের এই পর্যবেক্ষণ যে, রবীন্দ্রনাথের বিপরীত পথে হাঁটতে গিয়ে জীবনানন্দ অন্ধকার এবং অসুন্দরের উপাসক হয়ে উঠেছেন। তিনি লিখেছেন, “খুব সচেতন ভাবেই জীবনানন্দ তাঁহার কবিতাকর্মে রবীন্দ্রনাথের ঠিক বিপরীত পথে চলিতে চাহিয়াছেন। ইহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ সিম্বলের ব্যবহারে। জীবনানন্দের কবিতার হেমন্তের শস্যরিক্ত শূন্য মাঠে স্নান বাঁকা চাঁদ যেন মরণাভিসারের প্রেত দূতী। জীবনের তীব্র, গোপন ক্ষুধার প্রতীক ইঁদুর।… সৌন্দর্যের অন্তরালে সাদা হাড়ের কঙ্কাল।… প্রেমের স্বাদে শুধুই তিক্ততা। রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি যেখানে পড়ে সেখানে আলো, সৌন্দর্য, জীবনানন্দের দৃষ্টিরতি অন্ধকারে কুৎসিতে (–কুঁজ, গলগণ্ড, পচা চালকুমড়া, মরা ঘাস)। রবীন্দ্রনাথের বলাকা অনন্তের যাত্রী, জীবনানন্দের বুনো হাঁস শিকারীর লক্ষ্য। রবীন্দ্রনাথের মনের হরিণ নির্বন্ধন আনন্দের উদ্দামতা, জীবনানন্দের বনের হরিণ ঘাই-হরিণীর মোহবদ্ধ বলি। রবীন্দ্রনাথের কাছে ঘাস নবনবায়মান চিরন্তন প্রাণপ্রবাহের প্রতীক, জীবনানন্দের কাছে ঘাস পশুদের মতো জীবনের উপভোগের (munching and wallowing) প্রতীক। রবীন্দ্রনাথে চক্ষুরিন্দ্রিয় প্রধান জীবনানন্দে রসনা!!” বলাই বাহুল্য সুকুমার সেন বড়ো ভুল করে ফেলেছেন এখানে। জীবনানন্দ যে কেবলই তিমিরবিলাসী ছিলেন না, ছিলেন তিমিরবিনাশী–সুকুমার সেনের ওপরেই রবীন্দ্র দর্শনের প্রবল প্রভাব কার্যকরী থাকায়–এই সত্যটুকু তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। এটুকুও তিনি বুঝতে পারেননি যে, রবীন্দ্রোত্তর যুগে জীবনানন্দই ছিলেন সেই কবি যিনি ছিলেন সম্পূর্ণভাবে রবীন্দ্রনাথের প্রভাবমুক্ত, অনন্য। তবে রবীন্দ্রনাথের তুলনায় জীবনানন্দকে কম নম্বর দিলেও সুকুমার সেন জীবনানন্দের গুরুত্বকে অস্বীকার করেননি। বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাসের পঞ্চম খণ্ডটিতে তিনি জীবনানন্দ দাশের জন্য বরাদ্দ করেছেন দশটি পাতা। বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সমর সেন বা অমিয় চক্রবর্তীরা এর অর্ধেক গুরুত্বও সুকুমার সেনের কাছে পাননি।
সুকুমার সেনের জীবনানন্দ পাঠটি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কেন? আজকের বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের দিকে তাকিয়ে দেখি এমন কেউই সাধারণত বাংলা কবিতার সমালোচনা করেন না যিনি নিজে কবি নন, কিন্তু কবিতার সংবেদী পাঠক। সুকুমার সেন যুগপৎ পণ্ডিত এবং কবিতার সংবেদী পাঠক হওয়ার কারণে অনেক বৃহৎ প্রেক্ষিতে জীবনানন্দের কবিতাকে স্থাপন করে তার কাব্যগুণ বিচার করতে পেরেছিলেন। এ-কাজও বাংলা সমালোচনা সাহিত্য থেকে আজ অন্তর্হিত। আরও মনে হয় সমালোচক হিসেবে তিনি ছিলেন অকুতোভয়। অনেকটা যেন প্রাচীন গ্রিসের সিনিকদের মতো। যা সত্য মনে করছেন, তা স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছেন। তাতে একজন কবি আক্রান্ত হলেও তিনি নির্বিকার থাকছেন। আজ মনে হয় সুকুমার সেন এর মতো যুগপৎ পণ্ডিত এবং কবিতার সংবেদী পাঠকদেরই কাব্য-সমালোচনার জগতে সমালোচকের ভূমিকায় আরও বেশি বেশি করে নিয়ে আসা প্রয়োজন। প্রশ্ন হলো, লাও তো বটে, কিন্তু আনে কে?
















