পরমা দাশগুপ্ত


দেখা যায় না, ছোঁয়াও যায় না। ঘিরে থাকে শুধু বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল আর গা-শিরশিরে ভয়। আর তারই টানে মানুষ ছোটে ভুতুড়ে সব ঠিকানায়। একবার না একবার যদি দেখা মিলে যায় অদেখা কারও! 

ভূত আছে না নেই, সে বিতর্ক বরং থাক। তবে গা ছমছম করা সেই অনুভূতি ঘিরে কৌতূহল যে ষোলো আনা আছে সকলেরই, সে নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। ভূতের গল্প, ভুতুড়ে বই, সিনেমা কিংবা অডিও স্টোরিতে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মজে থাকাই তার সিলমোহর। এবারের বইমেলাতেও যে হারে ভুতুড়ে গল্পের বই  বিক্রি হয়েছে হুড়মুড়িয়ে, তাতেও সে কথাটা প্রমাণ হয় বইকি! তা হলে বেড়াতে যাওয়ার ক্ষেত্রেই বা ভুতুড়ে স্বাদ অধরা থাকবে কেন! 

রোমাঞ্চে ঘেরা এমনই বেড়ানোর নাম ঘোস্ট ট্যুরিজম। গোটা বিশ্বের মতো এদেশেও এখন যাকে ঘিরে আগ্রহ বাড়ছে চরচরিয়ে। বাঙালিই বা পিছিয়ে থাকবে নাকি! তাই কলকাতা হোক বা বাংলার নানা প্রান্ত কিংবা দেশের কোণে কোণে ছড়িয়ে থাকা হন্টেড প্লেসে দেদার ছুটছেন ভূত-সন্ধানী পর্যটকের দল। রমরমিয়ে বাড়ছে হন্টেড ট্যুর-এর চাহিদা। 

আপনিও বুঝি সেই রোমাঞ্চের খোঁজে বেরিয়ে পড়তে চান? তা হলে বরং খাস কলকাতাতেই কিছু ‘ভুতুড়ে’ ঠিকানার খোঁজ দেওয়া যাক।

এ শহরের আনাচকানাচেই আছে এমন বেশ কিছু জায়গা, যাকে ঘিরে অশরীরী অভিজ্ঞতার নানা গল্প ওড়ে রাতবিরেতের এলোমেলো বাতাসে। নিজেরাই পৌঁছে যেতে পারেন সাহস করে। কিংবা এ শহরের বেশ কিছু সংস্থা এখন রাতভর ভুতুড়ে ট্রিপের ব্যবস্থা করে। চাইলে যেতে পারেন তাদের সঙ্গেও। তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ কলকাতার বেশ কিছু ঠিকানা।

ন্যাশনাল লাইব্রেরি- ব্রিটিশ আমলের এই বিরাট লাইব্রেরির সিঁড়ি থেকে থামে ঘেরা বারান্দা কিংবা সুনসান হলঘরে রাত নামলেই নাকি ঘুরে বেড়ায় ছায়া ছায়া এক নারীমূর্তি। কেউ তার পায়ের শব্দ শোনেন, কেউ বা অনুভব করেন তার অস্তিত্ব। ভয়ে কাঁটা হয়ে কর্মীরা তাই রাতের শিফটে ভয় পান আজও। 

সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেটারি- আদতেই কবরখানা। তেনারা থাকবেন না, তাও কি হয়? গাছে-আগাছায় ঘেরা ভাঙাচোরা সমাধিগুলো ঘিরে তাদের চারপাশে পাক খাওয়া দমচাপা বাতাসে তাই দেদার ভূতের গল্পের বসত। সত্যি-মিথ্যে জানা নেই। তবে গোরস্থানে সাবধান হওয়াই তো ভাল!

হেস্টিংস হাউস- আলিপুরে একদা ব্রিটিশ বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রাসাদোপম বাড়িতে এখন কলেজ-হস্টেল মিলিয়ে দিনভর অজস্র মানুষের যাতায়াত। তবু রাত নামলেই সুনসান পুরী যেন কেমন গা-ছমছমে হয়ে ওঠে। শোনা যায়, আজও নাকি চাঁদনি রাতে ঘোড়ার পিঠে এক সাহেবের দেখা মেলে! কানে আসে অদ্ভুত সব শব্দ। এমনকী এক অতৃপ্ত নারীও নাকি তার হারানো প্রেমিকের খোঁজে ঘুরে বেড়ায় এ বাড়ির আনাচকানাচে।

রাইটার্স বিল্ডিং- একদা কেরানিদের দফতর থেকে গত দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলার প্রশাসনিক কার্যকলাপের কেন্দ্রবিন্দু এই বিরাট বাড়িটি ঘিরেও গল্প নেহাত কম নয়। ব্রিটিশ আমলে এ বাড়িতেই নাকি অস্বাভাবিক ভাবে মৃত্যু হয়েছিল এক সাহেবের। তাঁর আত্মা নাকি রাত নামলেই আজও ফিরে আসে অফিসে। হেঁটে বেড়ায় করিডর থেকে করিডরে। বন্ধ ঘর থেকে শোনা যায় টাইপরাইটারের খটাখট। আর তাই সন্ধে পেরিয়ে অন্ধকার হলেই আজও সোজা বাড়িমুখো হন এ বাড়িতে অফিস করতে আসা মানুষ। 

কলকাতা ডক- এমনিতেই সন্ধে নামলে ফাঁকা হয়ে আসে গোটা চত্বর। টিমটিমে আলোয় আরও যেন গা ছমছমে হয়ে ওঠে পরিবেশ। তাতে অনেকেই বলেন, অতীতে এই জাহাজঘাটার আশপাশে তলিয়ে যাওয়া নাবিক কিংবা কর্মীদের আত্মা নাকি রাত বাড়লেই ফিরে আসে এ পাড়ায়। কান পাতলেই শোনা যায় তাদের চিৎকার। আর তখন আচমকা যেন তাপমাত্রা নেমে যায় হুশ করে! 

নিমতলা শ্মশান- কে না জানে, শ্মশান মানেই তো ভূতেদের প্রিয় আস্তানা! তাই এ জায়গাটা ঘিরেও ভুতুড়ে গল্পের ছড়াছড়ি। অনেকেই নাকি গভীর রাতে এখানে ছায়া ছায়া চেহারাদের হেঁটে যেতে দেখে নদীর দিকে। কিংবা শুনতে পায় তাদের ফিসফিসানির শব্দ। আর সে সময়টায় কেমন যেন থম মেরে থাকে বাতাসও।   

১ নম্বর গার্স্টিন প্লেস- এক সময়ে এ বাড়িতেই ছিল আকাশবাণী কলকাতার দফতর। আর তখন থেকেই নিত্য ভুতুড়ে অভিজ্ঞতাও নাকি সঙ্গী ছিল কর্মীদের। কখনও নাকি সাহেব ভূত এসে ওলোটপালট করে দিত ফাইল। কখনও বা রেকর্ডিং স্টুডিয়োয় টের পাওয়া যেত অশরীরী উপস্থিতি! সব মিলিয়ে সূর্য ডুবলেই জমাট বাঁধত ভয়ের পরত। কেউ কেউ বলেন, একদা এ জায়গাটা ছিল অসুস্থতার কারণে মৃতদের গোরস্থান। সেই সব আত্মাই ফিরে আসত এ বাড়িতে। এখন অবশ্য আস্ত বাড়িটাই ভেঙে ফেলার পালা। ভূতেরা সব কোথায় যাবে কে জানে!   

রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশন- রাতের শেষ মেট্রো বেরিয়ে গেলে এ স্টেশন নাকি চলে যায় তেনাদের দখলে! রেলের ট্র্যাক থেকে কখনও নাকি শোনা যায় গুমরে ওঠা কান্নার শব্দ, কখনও বা আর্তচিৎকার। কর্মীদের বিশ্বাস, এই স্টেশনে লাইনে ঝাঁপ দিয়ে কাটা পড়া মানুষদের আত্মা নাকি ঘুরে বেড়ায় ফাঁকা ট্র্যাক আর প্ল্যাটফর্মে। 

তবে গল্পেরা থাকে গল্পের মতো। মানা না মানা, সে আপনার ব্যাপার। ভয়ের বসত তো আসলে মনের অলিগলি জুড়ে। আর সেই শিরশিরানিটাকে উপভোগ করতেই চষে ফেলা এ ঠিকানা থেকে ও ঠিকানা!