আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তেহরান চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে চায় "মর্যাদার সঙ্গে"। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, কোনও দেশেরই ইরানের সেই অধিকার (বৈধ পারমাণবিক অধিকার) থেকে বঞ্চিত করার এখতিয়ার নেই। পারমাণবিক আলোচনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই তিনি এই মন্তব্য করলেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেছেন যে, ইরানের যুদ্ধ বা সংঘাতের পরিধি বাড়ানোর কোনও ইচ্ছে নেই। তিনি ফের উল্লেখ করেন যে, দেশটির নীতিসমূহ মূলত আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপরই কেন্দ্রীভূত।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, "আমাদের পারমাণবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কারো নেই, আমরা কেবল এটুকুই দাবি করি যে, বিশ্বের সকল মানুষের মতো আমাদের সঙ্গেও যেন সমতার ভিত্তিতে আচরণ করা হয়।" তিনি আরও যোগ করেন, "আমাদের মৌলিক অবস্থানটি এই অঞ্চলে শান্তি, স্থিতাবস্থা এবং নিরাপত্তা বজায় রাখার ওপর প্রতিষ্ঠিত।"
ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, তেহরান নিজে থেকে কোনও সংঘাতের সূচনা করেনি এবং অন্য কোনও দেশের ওপর আক্রমণ চালানোরও তাদের কোনও ইচ্ছা নেই। তিনি বলেন, "আমরা যুদ্ধের পরিধি বাড়াতে চাই না, আমরা নিজেরাও কোনও যুদ্ধ বা সংঘাতের সূচনা করিনি। আমরা কোনও দেশের ওপর আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা করছি না, বরং আমরা আত্মরক্ষার জন্য আমাদের আইনি ও বৈধ অধিকার প্রয়োগ করছি মাত্র।"
পেজেশকিয়ান প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন যে, তারা তাদের লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ হয়েছে এবং অসামরিক পরিকাঠামোতে হামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। তিনি বলেন, "শত্রুপক্ষ তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে এবং বিভিন্ন পরিবকাঠামো, স্কুল ও হাসপাতালে হামলা চালিয়েছে।"
পারমাণবিক অধিকারের বিষয়ে আমেরিকার অবস্থানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পেজেশকিয়ান:
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেজেশকিয়ান ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানেরও সমালোচনা করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, ঠিক কোন যুক্তির ভিত্তিতে ওয়াশিংটন তেহরানের পারমাণবিক কর্মকাণ্ডকে সীমাবদ্ধ করতে চাইছে?
পেজেশকিয়ান বলেছেন, "ট্রাম্প বলেন যে ইরান তার পারমাণবিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না। কিন্তু তিনি এটা বলেন না যে, ঠিক কোন অপরাধের কারণে এমনটা করা হবে। একটি জাতিকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার তিনি কে?"
আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি আলোচনার জন্য প্রস্তুত নয় ইরান: একটি প্রতিবেদনের দাবি
এদিকে, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) তথ্যমতে, ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, আমেরিকার সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনার নতুন কোনও পর্বে প্রবেশ করতে তেহরান এখনও প্রস্তুত নয়। এর কারণ হিসেবে তিনি ওয়াশিংটনের এমন কিছু দাবির ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন, যাকে ইরান "চরমপন্থী" দাবি হিসেবে অভিহিত করেছে।
ইরানের উপ-বিদেশমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ বলেছেন, তাঁর দেশ আমেরিকাকে কোনও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করবে না। অর্থাৎ তিনি ট্রাম্পের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। খাতিবজাদেহ বলেন, "আমি আপনাদের নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, কোনও সমৃদ্ধ উপাদানই আমেরিকায় পাঠানো হবে না। এটি আলোচনার অযোগ্য একটি বিষয়। আমি আপনাদের নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, আমাদের যেসব বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে তা নিরসনে আমরা প্রস্তুত থাকলেও, যেসব বিষয় আলোচনার অযোগ্য, আমরা সেগুলো মেনে নেব না।"
খাতিবজাদেহ জানান, দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, কিছু অমীমাংসিত বিষয় এখনও দুই পক্ষের সরাসরি সাক্ষাতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বলেন, "আমরা এখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারিনি যে সরাসরি কোনও বৈঠকে বসতে পারি। কারণ, এমন কিছু বিষয় রয়েছে যেখানে মার্কিনিরা এখনও তাদের সেই 'চরমপন্থী' অবস্থান থেকে সরে আসেনি।" তিনি আরও যোগ করেন যে, সরাসরি আলোচনার আগে ইরান একটি "কাঠামো চুক্তি" চূড়ান্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে চায়।
উপ-বিদেশমন্ত্রী আমেরিকার প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত উদ্বেগগুলোর সুরাহা করে।
খাতিবজাদেহ বলেন, "অপর পক্ষেরও উচিত আমাদের মূল উদ্বেগগুলো অনুধাবন করা এবং সেগুলোর সমাধান করা। আমাদের মূল উদ্বেগ হল সেই অবৈধ ও একতরফা নিষেধাজ্ঞাগুলো, যা মার্কিনিরা ইরানিদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এটি এক ধরনের 'অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ', যার লক্ষ্য হল ইরানি জনগণকে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মুখে ফেলে দেওয়া এবং তাদের উসকে দিয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘটিয়ে তোলা।"
এই ইরানি কর্মকর্তা তেহরানের সেই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন যে, তাদের গৃহীত পদক্ষেপগুলো ছিল আত্মরক্ষামূলক। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত যেকোনও চুক্তিতে লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। খাতিবজাদেহ বলেন, "ইরান সদিচ্ছা নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছিল এবং যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়েছিল। আমরা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলাম যে, এই যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন-সহ সব দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু এরপর অপর পক্ষ জানিয়ে দেয় যে তারা এই শর্ত মানতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয় এবং এরপরই তারা ফের হামলা শুরু করে।" তিনি আরও জানান যে, হরমুজ প্রণালী সংক্রান্ত একটি "নতুন প্রটোকল" আলোচনার অংশ হবে।















