একটা সময় ছিল, যখন স্কুলের টিফিনের ঘণ্টা বাজার অপেক্ষায় থাকত হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। ক্লাসরুমে অঙ্ক বা ব্যাকরণের পাঠের মাঝেই চোখ চলে যেত ঘড়ির কাঁটার দিকে। ঘণ্টা বাজতেই খুলে যেত টিফিন বক্স, আর তার ভিতরে প্রায়ই দেখা মিলত এক পরিচিত মুখের—রঙিন কাগজে মোড়া, লাল ‘R’ চিহ্ন আঁকা বাপুজি কেক।
2
10
আজও সেই সামান্য তেলতেলে মোড়ক খুললেই যেন ফিরে আসে শৈশবের দিনগুলি। এটি শুধু একটি কেক নয়, বরং বহু বাঙালির স্মৃতির অংশ।
3
10
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নানা বিদেশি পেস্ট্রি, কোরিয়ান বান বা ডিজাইনার ডেজার্টের ভিড়ে বাপুজি কেকের কোনও চাকচিক্য ছিল না। নরম অথচ ঘন গঠনের এই কেকের মধ্যে থাকত ভ্যানিলা এবং শুকনো ফলের মিশ্র স্বাদ। পাড়ার মুদির দোকান থেকে শুরু করে বেকারির বড় কাচের বয়ামে সর্বত্রই তার উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক।
4
10
১৯৭৩ সালে হাওড়ায় প্রয়াত শিল্পপতি অলোকেশ জানার উদ্যোগে এই কেকের যাত্রা শুরু হয়। নিউ হাওড়া বেকারির অধীনে মাত্র ৬০ পয়সা দামে বিক্রি হওয়া এই কেক কখন যে সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল, তা কেউ বুঝতেই পারেনি।
5
10
বাপুজি কেকের জনপ্রিয়তার রহস্য ছিল এর সহজলভ্যতা এবং সাশ্রয়ী মূল্য। এটি কোনও বিলাসবহুল খাদ্য ছিল না, বরং মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিদিনের সঙ্গী। স্কুলের টিফিন, ট্রেনযাত্রা, বিকেলের চা কিংবা কলেজের আড্ডা—সব ক্ষেত্রেই বাপুজি কেক ছিল সমান জনপ্রিয়।
6
10
আজ একটি স্লাইসের দাম প্রায় ৭ টাকা। কিন্তু এর প্রকৃত মূল্য টাকায় মাপা যায় না। কারণ এটি বহু মানুষের শৈশব, কৈশোর এবং বড় হয়ে ওঠার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
7
10
কোভিড মহামারির সময় এই কেকের সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয় নস্টালজিয়ার বন্যা। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, "বাপুজি কেক কোথায় গেল?" সংবাদমাধ্যমেও বিষয়টি শিরোনামে উঠে আসে। তখনই যেন বোঝা যায়, বাপুজি কেক আর শুধুমাত্র একটি কেক নয়—এটি একটি আবেগ।
8
10
বর্তমানে অলোকেশ জানার দুই ছেলে, অমিতাভ জানা এবং অনিমেষ জানা এই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। কেকের পাশাপাশি রুটি, বিস্কুটসহ বিভিন্ন বেকারি পণ্য উৎপাদন করলেও মূল দর্শন অপরিবর্তিত রয়েছে—একই স্বাদ, একই গুণমান এবং গ্রাহকের প্রতি আস্থা।
9
10
কলকাতার অনেকের কাছেই বাপুজি কেকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কলেজ জীবনের স্মৃতিও। বিশেষ করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কাছে এক কাপ ভাঁড়ের চা আর এক টুকরো বাপুজি কেক ছিল ক্লাস, আড্ডা আর অ্যাসাইনমেন্টের চাপের মাঝে ছোট্ট স্বস্তি।
10
10
বদলে যাওয়া সময়ের সঙ্গে বহু খাবার হারিয়ে গেলেও বাপুজি কেক টিকে রয়েছে। কারণ এর স্বাদে শুধু ভ্যানিলা আর শুকনো ফলের গন্ধ নেই, আছে এক টুকরো বাঙালিয়ানা, এক চিমটি শৈশব আর অগণিত স্মৃতির মিষ্টি ছোঁয়া।