আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইন্টারনেটে ইদানীং একটা খবর বেশ ভাইরাল হয়েছে— পৃথিবীর ২৪ ঘণ্টার দিন নাকি আর স্থায়ী থাকবে না, দিন নাকি বড় হয়ে যাচ্ছে! কল্পবিজ্ঞানের গল্পের মতো শোনালেও বিজ্ঞানীরা কিন্তু নিশ্চিত করেছেন যে ঘটনাটা সত্যি। আমাদের এই চেনা পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি আসলেই দিন দিন কমে যাচ্ছে। তবে এই খবরটা দেখে এখনই ঘাবড়ে যাওয়ার বা রাতের ঘুম হারাম করার কোনও দরকার নেই। অনেক সমাজমাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদী এই বৈজ্ঞানিক সত্যটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন কাল-পরশুই দিন ২৫ ঘণ্টার হয়ে যাবে! বাস্তবে কিন্তু ব্যাপারটা তেমন নয়। এটি এতটাই ধীর প্রক্রিয়া যে প্রতিদিনের জীবনে কোনও মানুষের পক্ষেই তা টের পাওয়া সম্ভব না। আমাদের ঘড়ি বা ক্যালেন্ডারে এর কোনও প্রভাবই পড়বে না, কারণ এই পরিবর্তন পূর্ণ হতে সময় লাগবে আরও কোটি কোটি বছর।
সহজ কথায় বললে, পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি ধিমে হয়ে যাওয়ার কারণে ২৪ ঘণ্টার দিন একসময় ২৫ ঘণ্টার দিনে রূপ নেবে ঠিকই, কিন্তু সেটার জন্য আমাদের আরও প্রায় ২০ কোটি (২০০ মিলিয়ন) বছর অপেক্ষা করতে হবে। চাঁদের আকর্ষণে সমুদ্রে যে জোয়ার-ভাটা হয়, তার ঘর্ষণের ফলেই মূলত পৃথিবীর গতি কমছে। প্রতি শতাব্দীতে আমাদের একটা দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ছে মাত্র ১.৭ মিলিসেকেন্ড করে। দীর্ঘ মেয়াদে গতি কমলেও আবহাওয়া বা হিমবাহ গলে যাওয়ার মতো সাময়িক কিছু কারণে মাঝেমধ্যে এই গতিতে সামান্য হেরফেরও ঘটে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রধানত চারটি কারণে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি কমছে। প্রথমত, চাঁদের মহাকর্ষীয় টান। এই টানের ফলে সমুদ্রে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হয় এবং সমুদ্রের জলের এই নড়াচড়া পৃথিবীর বুকে এক ধরণের ঘর্ষণ তৈরি করে, যা পৃথিবীর পাক খাওয়ার গতিকে কমিয়ে দেয়। আর এই প্রক্রিয়ায় চাঁদও আস্তে আস্তে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর ভূগর্ভের বা ম্যান্টেলের ভেতরের গলিত লোহার অবিরত নড়াচড়া, যা পৃথিবীর ভরকে নতুন করে বিন্যস্ত করে এবং গতিতে প্রভাব ফেলে। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গলে যাওয়া হিমবাহের পানি সমুদ্রে মিশে পৃথিবীর ওজনের ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। আর চতুর্থত, বায়ুমণ্ডলের বিশাল বায়ুপ্রবাহ এবং আবহাওয়া চক্র, যা পৃথিবীর উপরিভাগের সাথে শক্তির আদান-প্রদান করে গতিকে প্রভাবিত করে।
এই প্রক্রিয়া কিন্তু নতুন কিছু নয়। কোটি কোটি বছর ধরে এই বদল চলছে। ডাইনোসরদের আমলে পৃথিবীতে একটা দিন হতো মাত্র ২৩ ঘণ্টায়! এখন প্রশ্ন হল, যদি হঠাৎ করে দিন ২৫ ঘণ্টার হয়ে যায়, তবে কী হবে? আমাদের পুরো সময় গণনার পদ্ধতিটাই বদলে ফেলতে হবে। শুধু তাই নয়, এটি আমাদের শরীরের ভেতরের ঘড়ি বা 'সার্কাডিয়ান রিদম'-কে ওলটপালট করে দেবে। মানুষ থেকে শুরু করে পৃথিবীর প্রায় সব জীবন্ত প্রাণীর শরীর ২৪ ঘণ্টার এই চক্রের সাথেই মানিয়ে বিবর্তিত হয়েছে। আমাদের ঘুম, হরমোনের ক্ষরণ—সবই এর ওপর নির্ভর করে।
আমরা জানি যে, রাতের ডিউটি করা বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণের কারণে যখন এই জৈবিক ঘড়ির ছন্দ কাটে, তখন মানুষের বিপাকক্রিয়া, মেজাজ বা হার্টের নানারকম সমস্যা দেখা দেয়। তবে স্বস্তির বিষয় হল, প্রকৃতির এই বদল যেহেতু হঠাৎ করে আসবে না, তাই প্রকৃতির নিয়মেই কোটি কোটি বছর ধরে বিবর্তনের মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত জীবজগৎ একদিন ২৫ ঘণ্টার এই দীর্ঘ দিনের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে। তবে সেই রূপান্তরটা হবে অত্যন্ত ধীর এবং এক দীর্ঘ পথচলা।















