আজকাল ওয়েবডেস্ক: বদলানো রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সাংবাদিক সংগঠন এবং আইন বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেছেন যে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত ১৮ মাসের শাসনে  গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর নজিরবিহীন ভীতিপ্রদর্শন, ঢালাও গ্রেপ্তার এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ের সাংবাদিক থেকে শুরু করে সম্পাদক পর্যন্ত এখন এক অস্থির ও অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

ভিন্নমতাবলম্বী ও সমালোচকরা বর্তমান এই অবস্থাকে একটি 'অচলাবস্থা' হিসেবে বর্ণনা করে অবিলম্বে 'মিথ্যা মামলায়' বন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি দাবি করেছেন। বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে 'অ্যান্টি-রিপ্রেশন জার্নালিস্ট ফ্রন্ট'-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সারাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ৫০০-এরও বেশি মামলা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে অন্তত ৫০ জন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া প্রায় ১,২০০ সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন এবং ১৬৮ জনের প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দমনপীড়নের এই চিত্র শুধু আদালতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের প্রায় ৭০০ সদস্যের পদ স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে। এমনকি অর্ধশতাধিক সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাব আটক  করা এবং তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মতো অভিযোগও সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিকে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকে ভারত ১৫৭তম এবং বাংলাদেশ ১৫২তম অবস্থানে রয়েছে। যদিও সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের তুলনায় কিছুটা উপরে, তবুও মাঠপর্যায়ের চিত্র এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।

কারাবন্দি সাংবাদিকদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে ভয়াবহ তথ্য দিয়েছেন অ্যান্টি-রিপ্রেশন জার্নালিস্ট ফ্রন্টের সদস্য সচিব শেখ জামাল। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, কারাগারে সাংবাদিকদের মানসম্মত খাবার বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। জামালের দাবি, কারাগারে সরবরাহ করা খাবারের কারণে অনেক সাংবাদিক কিডনি, লিভার ও রক্তজনিত জটিলতায় ভুগছেন। তিনি শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল হক বাবু এবং ফারজানা রুপার মতো পরিচিত সাংবাদিকদের নাম উল্লেখ করে জানান যে, তাদের উন্নত চিকিৎসার জরুরি প্রয়োজন।

আইনি বিশেষজ্ঞরা এই পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মনে করেন, সাংবাদিকদের মুক্তি না হওয়া পদ্ধতিগত ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। তিনি স্পষ্টভাবেই বলেছেন যে, দেশে এখনো প্রকৃত সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং অনেক ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা খুনের মামলার মতো গুরুতর অভিযোগগুলোও শেষ পর্যন্ত বিচারিক পরীক্ষায় টিকবে কি না, তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন। দেশের মানুষের কাছে এই অভিযোগগুলোর অসারতা এখন অনেকটা স্পষ্ট বলে তিনি মন্তব্য করেন। সামগ্রিকভাবে, সাংবাদিক নিগৃহীত হওয়ার এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।