আজকাল ওয়েবডেস্ক: যুক্তরাজ্যে এই প্রথম এমন এক বিরল ঘটনার কথা জানা গেল, যা শুনে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই তাজ্জব হয়ে গেছেন। ৪৪ বছর ধরে মিশেল এবং লাভিনিয়া ওসবোর্ন নিজেদের যমজ বোন বলেই জেনে এসেছেন। একই গর্ভে বেড়ে ওঠা, মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে জন্ম—সবই ছিল স্বাভাবিক যমজদের মতো। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষার এক চাঞ্চল্যকর ফলাফলে দেখা গেছে, এই দুই বোনের জন্মদাতা বাবা আসলে দুজন আলাদা ব্যক্তি।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অত্যন্ত দুর্লভ পরিস্থিতিকে বলা হয় 'হেটেরোপ্যাটার্নাল সুপারফেকান্ডেশন' (heteropaternal superfecundation)। এটি তখনই ঘটে যখন একজন নারীর শরীরে একই ঋতুচক্রে একাধিক ডিম্বাণু তৈরি হয় এবং স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আলাদা দুজন পুরুষের শুক্রাণু দ্বারা সেই ডিম্বাণুগুলো নিষিক্ত হয়। বিশ্বজুড়ে এখন পর্যন্ত মাত্র ২০টির মতো এই ধরণের ঘটনার নজির রয়েছে, আর ব্রিটেনের ইতিহাসে ওসবোর্ন বোনদের ঘটনাটিই প্রথম বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিবিসি রেডিও ফোর-এর ‘দ্য গিফট’ পডকাস্টে নিজেদের জীবনের এই অবিশ্বাস্য গল্প শুনিয়েছেন দুই বোন। লাভিনিয়া জানান, এই সত্যটা মেনে নেওয়া তাঁর জন্য খুব কঠিন ছিল। তিনি আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, "মিশেল ছিল আমার জীবনের একমাত্র নিশ্চিত আশ্রয়, যাকে আমি একান্তই নিজের ভাবতাম। কিন্তু পরীক্ষার ফল সব ওলটপালট করে দিল।" অন্যদিকে মিশেল জানান, তিনি খুব একটা অবাক হননি। তাঁর মনে আগে থেকেই বাবার পরিচয় নিয়ে কিছুটা সন্দেহ ছিল। তিনি বলেন, "বিষয়টা অদ্ভুত এবং বিরল হলেও এখন সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেছে।"

এই দুই বোনের শৈশব কেটেছে চরম অনিশ্চয়তা আর কষ্টের মধ্য দিয়ে। ১৯৭৬ সালে নটিংহামে যখন তাঁদের জন্ম হয়, তাঁদের মা তখন মাত্র ১৯ বছরের এক অসহায় তরুণী। পারিবারিক নির্যাতন আর টানাপোড়েনের কারণে দুই বোনকে অনেকটা সময় পালক বাড়িতে বা চিলড্রেন হোমে কাটাতে হয়েছে। তাঁদের মা সবসময় বলতেন, 'জেমস' নামের এক ব্যক্তিই তাঁদের বাবা। কিন্তু বড় হওয়ার পর থেকেই মিশেলের মনে হতো জেমস হয়তো তাঁর প্রকৃত বাবা নন।

২০২১ সালের শেষের দিকে মিশেল কৌতূহলবশত একটি ডিএনএ কিট কিনে পরীক্ষা করান। ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি যখন পরীক্ষার ফলাফল হাতে আসে, ঠিক সেই দিনই তাঁদের মা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পরীক্ষায় দেখা যায়, জেমস মিশেলের বাবা নন। পরে অনেক খোঁজাখুঁজির পর মিশেল জানতে পারেন তাঁর আসল বাবা ‘অ্যালেক্স’ নামের এক ব্যক্তি। বোনকে দেখে পরে লাভিনিয়াও পরীক্ষা করান এবং জানতে পারেন জেমস তাঁরও বাবা নন। লাভিনিয়ার আসল বাবার নাম ‘আর্থার’।

বর্তমানে লাভিনিয়া তাঁর বাবা আর্থারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং তাঁদের মধ্যে একটি সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে মিশেল তাঁর আসল বাবার দেখা পেলেও বাবার মাদকাসক্তির কারণে সেই সম্পর্ক আর এগিয়ে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁরা এখন যমজ বোন হিসেবে নয়, বরং কারিগরিভাবে 'হাফ-সিস্টার' হিসেবে জীবন কাটাচ্ছেন। তবে রক্তের টান যাই হোক, দীর্ঘ ৪৪ বছরের পথচলা তাঁদের একে অপরের প্রতি ভালোবাসাকে এখনো অটুট রেখেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিএনএ পরীক্ষার হার বাড়লে ভবিষ্যতে হয়তো এমন আরও অনেক অজানা গল্প সামনে আসবে যা এখন পর্যন্ত লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে।