আজকাল ওয়েবডেস্ক: অপারেশন ‘সিঁদুর’ ঘিরে পাকিস্তান যে প্রচার চালিয়ে আসছিল, তা কার্যত ভেঙে পড়ল মার্কিন সরকারের সরকারি নথিতে। আমেরিকার ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট (FARA)-এর আওতায় জমা দেওয়া একাধিক নথি থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, প্রকাশ্যে শক্ত অবস্থানের দাবি করলেও বাস্তবে ভারতের সামরিক অভিযানে গভীর আতঙ্কে ছিল পাকিস্তান। এই নথিগুলি এনডিটিভি-র হাতে আসার পর ইসলামাবাদের দ্বিচারিতা নতুন করে প্রকাশ্যে এসেছে।

৭ মে ভারত শুরু করেছিল অপারেশন ‘সিঁদুর’। জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে পাকিস্তান-সমর্থিত জঙ্গিদের হামলায় ২৬ জন নিরীহ নাগরিক নিহত হওয়ার পরই এই অভিযান চালানো হয়। ভারতীয় বায়ুসেনা ও সেনার যৌথ অভিযানে পাকিস্তানের ভেতরে থাকা একাধিক জঙ্গিঘাঁটি ও সামরিক পরিকাঠামোতে আঘাত হানা হয়। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, কয়েক দিনের মধ্যেই ১০০-র বেশি জঙ্গি নিকেশ হয় এবং পাকিস্তানের একাধিক এয়ারবেস ও সহায়ক পরিকাঠামো গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়ে।

এই সংঘর্ষ ১০ মে একটি যুদ্ধবিরতিতে গিয়ে থামলেও পাকিস্তান নিজেদের বক্তব্যে দাবি করেছিল, ভারতই নাকি সংঘর্ষ থামানোর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু মার্কিন নথি বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। পাকিস্তানের হয়ে ওয়াশিংটনে লবিং করা সংস্থা স্কোয়ার প্যাটন বগস যে নথি জমা দেয়, তাতে স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করা হয়, ভারতের আক্রমণ ‘শেষ’ হয়নি, শুধু ‘সাময়িকভাবে স্থগিত’ করা হয়েছে।

নথিতে লেখা ছিল, “আমরা উদ্বিগ্ন, কারণ প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছেন ভারত কেবলমাত্র সামরিক অভিযান স্থগিত রেখেছে, ভবিষ্যতে আবার পাকিস্তানের উপর হামলা হতে পারে।” এই বক্তব্যই দেখিয়ে দেয়, ভারতের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে কতটা আতঙ্কে ছিল পাকিস্তান।

এই স্বীকারোক্তি পাকিস্তানের সরকারি দাবিকে সরাসরি খণ্ডন করে। বাস্তবে ভারতের সামরিক শক্তির সামনে দাঁড়াতে না পেরে পাকিস্তানের সেনা নেতৃত্বই দ্রুত যুদ্ধবিরতির জন্য তৎপর হয়। ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে থাকায় তারা আমেরিকার দ্বারস্থ হয় এবং তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হস্তক্ষেপ চায়।

জুলাই মাসে সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও বিষয়টি পরিষ্কার করে দেন। তিনি বলেন, “অপারেশন সিঁদুর বন্ধ হয়নি, শুধু স্থগিত রয়েছে।” একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, ভবিষ্যতে কোনও উসকানি এলে ভারত আরও “উপযুক্ত ও শক্তিশালী জবাব” দেবে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, ভারতের নিরাপত্তা প্রশ্নে কোনও আপস নেই।

FARA নথিতে আরও জানা যায়, পাকিস্তানের কূটনীতিক ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনে অন্তত ৫০টির বেশি বৈঠক করেন মার্কিন সাংসদ ও প্রশাসনের আধিকারিকদের সঙ্গে। লক্ষ্য ছিল ভারতের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জোরালো করা। কিন্তু এই লবিং প্রচেষ্টাই উল্টো প্রমাণ করে দেয়, কতটা একতরফাভাবে পাকিস্তান সাহায্য চাইছিল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই নথিগুলি নিশ্চিত করেছে যে ভারত কখনওই আমেরিকার কাছে মধ্যস্থতার আবেদন করেনি বা যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করেনি। ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার করা ‘আমেরিকার মধ্যস্থতায় শান্তি’ সংক্রান্ত দাবি কার্যত ভিত্তিহীন বলেই প্রমাণিত হয়েছে।

পহেলগাঁওয়ে ২৬ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যুই ছিল অপারেশন সিঁদুরের প্রত্যক্ষ কারণ। ভারতের জবাব ছিল হিসেবি কিন্তু কড়া। নির্ভুলভাবে  চালানো অভিযানে জঙ্গি পরিকাঠামো ধ্বংস করা হয়, সাধারণ নাগরিকদের ক্ষতির ঝুঁকি এড়িয়ে। অন্যদিকে পাকিস্তানের বায়ু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল চরমভাবে দুর্বল, যার ফলে দেশটির সামরিক মহলে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।

১০ মে নাগাদ ক্ষয়ক্ষতির বাস্তব চিত্র বুঝে পাকিস্তানের সেনা নেতৃত্ব যুদ্ধবিরতির পথ বেছে নেয়, যদিও পরে সেটিকে ভিন্নভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মার্কিন নথি সেই প্রচারকে সম্পূর্ণভাবে খণ্ডন করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং ভারতের বদলে যাওয়া কৌশলগত অবস্থানের প্রতিফলন। সীমান্তের ওপার থেকে সন্ত্রাসে মদত দিলে তার জবাব যে নিশ্চিত এবং কঠোর হবে এই বার্তাই অপারেশন সিঁদুরের মাধ্যমে স্পষ্ট করেছে ভারত।

২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই নথিগুলি আন্তর্জাতিক মহলেও ভারত–পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে নতুন বার্তা দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে। একদিকে ভারতের আত্মবিশ্বাসী ও স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা নীতি, অন্যদিকে পাকিস্তানের আতঙ্ক ও বিদেশি সহায়তার উপর নির্ভরতা, এই বৈপরীত্যই অপারেশন সিঁদুর-পরবর্তী বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।