আজকাল ওয়েবডেস্ক: সোমবার পাকিস্তানে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনায় বসবেন ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তার আগে উভয় দেশই ঘোষণা করেছে যে, হরমুজ প্রণালী ফের খুলে দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও, দু'পক্ষের গরমাগরম হুঁশিয়ারিতে হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার বেশ কয়েকটি জাহাজ, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করা যাবে কিনা তা যাচাই করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু, সেসব জাহাজ ফিরে আসে।
এর কারণগুলো স্পষ্ট না হলেও, বিষয়টি সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
সমুদ্রে সীমিত চলাচল:
জাহাজ চলাচলের তথ্যে দেখা গিয়েছে যে, শুক্রবার সন্ধ্যায় কন্টেইনারবাহী জাহাজ, বাল্ক ক্যারিয়ার এবং ট্যাঙ্কার-সহ প্রায় ২০টি জাহাজ উপসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে হরমুজ প্রণালীর দিকে এগোচ্ছিল। তবে, সেগুলোর অধিকাংশ জাহাজই তাদের যাত্রা শেষ করেনি, মাঝপথেই গতিপথ পরিবর্তন করে ফিরে আসে।
এই জাহাজগুলোর মধ্যে ফরাসি জাহাজ পরিবহন সংস্থা 'সিএমএ সিজিএম'-এর পরিচালিত তিনটি কন্টেইনারবাহী জাহাজও ছিল। তবে সংস্থাটি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। সংঘাত শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার এটিই ছিল জাহাজগুলোর সবচেয়ে বড় সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
বিবিসি-র একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জাহাজগুলোর জন্য এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করা নিরাপদ কি না, সে বিষয়টি সামুদ্রিক সংস্থাগুলো এখনও যাচাই-বাছাই করছে। ট্র্যাকিং বা অবস্থান নির্ণয়কারী ব্যবস্থাগুলোতেও ওই এলাকায় জাহাজ চলাচলের অত্যন্ত নগণ্য বা সীমিত গতিবিধিই পরিলক্ষিত হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা উদ্বেগ অব্যাহত:
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা জানিয়েছে যে, নিরাপত্তার বিষয়ে তাদের এখনও সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট নিশ্চয়তা প্রয়োজন। সংস্থাটির প্রধান আর্সেনিও ডমিঙ্গুয়েজ বলেন, জাহাজ পরিবহন শিল্পের পক্ষ থেকে এমন নিশ্চয়তা প্রয়োজন যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলে কোনও ঝুঁকি নেই এবং তা আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পরিচালিত হচ্ছে।
ডমিঙ্গুয়েজ আরও বলেন, যদিও কিছু জাহাজ হয়তো চলাচল শুরু করেছে, তবুও বিষয়টি নিশ্চিত করা বেশ কঠিন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে, হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া এড়াতে জাহাজগুলো তাদের শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ করে রাখে, যার ফলে সেগুলোর অবস্থান বা গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
'কন্ট্রোল রিস্কস'-এর সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ করম্যাক ম্যাকগ্যারি জানান যে, তিনি এখনও সতর্ক অবস্থানেই রয়েছেন। তিনি বলেন, সর্বশেষ এই ঘোষণার ফলে পরিস্থিতির কোনও উন্নতি হয়নি; বরং তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, ওই এলাকায় এখনও সামুদ্রিক মাইন বা বিস্ফোরকের হুমকি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও সামরিক উপস্থিতি:
শনিবার দিনের শুরুর দিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, এই প্রণালীটি "সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত এবং পূর্ণাঙ্গ চলাচলের জন্য প্রস্তুত"। তবে তিনি এও স্পষ্ট করে দেন যে, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত বিষয়-সহ একটি চুক্তিতে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকবে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড নিশ্চিত করেছে যে, গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার 'ইউএসএস মাইকেল মারফি' বর্তমানে আরব সাগরে টহল দিচ্ছে। এক বিবৃতি অনুযায়ী, অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২১টি জাহাজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশ মেনে ইরানের দিকে ফিরে গিয়েছে।
ইরানের শর্তারোপ:
প্রণালীটিতে প্রবেশের বিষয়ে ইরানও নিজস্ব কিছু শর্ত আরোপ করেছে। তারা সতর্ক করে দিয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরষ্ট্র যদি ইরানের জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ অব্যাহত রাখে, তবে তারা আবারও এই পথটি বন্ধ করে দিতে পারে।
ইরানি বিদেশ মন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ঘোষণা করেন যে, ইজরায়েল ও লেবাননের মধ্যে চলমান ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির অবশিষ্ট সময়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে। তবে পরবর্তীতে ইরানি কর্মকর্তারা বিষয়টি স্পষ্ট করে জানান যে, জাহাজগুলোকে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট রুট বা পথ অনুসরণ করতে হবে এবং কোনও সামরিক জাহাজকে এই পথ দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না।
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রেজা তালাঈ-নিক শনিবার জানান যে, এই প্রণালীটি কেবল বর্তমান যুদ্ধবিরতি চলাকালীন এবং সীমিত পরিসরেই উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, এই পথে চলাচল শর্তসাপেক্ষ, সামরিক জাহাজ এবং বৈরী শক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর এই পথ দিয়ে যাতায়াত নিষিদ্ধ। তিনি আরও যোগ করেন যে, এই ব্যবস্থাটি সাময়িক এবং লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লা গোষ্ঠীর ওপর চাপ বৃদ্ধি পেলে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হতে পারে।
বিপন্ন বিশ্ববাণিজ্য:
হরমুজ প্রণালী হল বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। সাধারণত বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। সংঘাত শুরুর আগে, বিশ্ববাজারের জন্য অপরিহার্য তেল ও সার বহনকারী প্রায় ১৩৮টি জাহাজ নিয়মিত এই প্রণালীটি অতিক্রম করত।
সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এই পথে জাহাজের চলাচল বা ট্রাফিক ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ইরানের হুমকি ও হামলার কারণে এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল, গত মার্চ মাসে এই পথে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা ১০০-এর নীচে নেমে এসেছিল।
এরপর কী?
অবরোধের শুরুর দিকে, যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক চ্যানেল এবং নেপথ্য আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা করেছিল। যখন সেই প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হল, তখন তারা এই অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করে এবং তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোর জন্য নৌ-পাহারার বিষয়টি বিবেচনা করতে শুরু করে।
বর্তমানে উভয় পক্ষই যেহেতু পরস্পরবিরোধী হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, তাই পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত রয়ে গিয়েছে। যদিও প্রযুক্তিগতভাবে এই প্রণালীটি উন্মুক্ত রয়েছে, তবুও জাহাজ পরিবহন সংস্থাগুলো এবং সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার আগে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট নিশ্চয়তার অপেক্ষায় রয়েছে।















