আজকাল ওয়েবডেস্ক: সাংবাদিকদের জন্য ২০২৫ সাল হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তথ্য সংগ্রহ করা Committee to Protect Journalists (সিপিজে) এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এ বছরে ১২৯ জন সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীর মৃত্যু হয়েছে—যা তাদের রেকর্ড রাখা শুরু করার পর সর্বোচ্চ।

সিপিজে-র তথ্যানুসারে, এই মৃত্যুর তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি ঘটেছে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে। শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই ১০৪ জন সাংবাদিক নিহত হন। ১২৯ জনের মধ্যে ৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে ইসরায়েলি গোলাগুলিতে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এই ৮৬ জনের মধ্যে ৬০ শতাংশেরও বেশি ছিলেন গাজা থেকে রিপোর্ট করা প্যালেস্তিনীয় সাংবাদিক।

সংগঠনটি ৪৭টি ঘটনাকে “টার্গেটেড কিলিং” বা পরিকল্পিত হত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং বলেছে, এর ৮১ শতাংশ ক্ষেত্রেই ইসরায়েল দায়ী। সিপিজে-র সিইও জোডি গিন্সবার্গ বলেন, “তথ্যে প্রবেশাধিকার যখন আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন সাংবাদিকরা রেকর্ড সংখ্যায় নিহত হচ্ছেন। সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণ অন্য স্বাধীনতার ওপর আক্রমণের পূর্বাভাস। অপরাধীদের শাস্তি না হলে আমরা সবাই ঝুঁকিতে থাকি।”

প্রতিবেদনে Al Jazeera-র কর্মীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক টার্গেটেড হামলার অভিযোগও তোলা হয়েছে। রিপোর্টার Anas al-Sharif ১০ আগস্ট ২০২৫-এ একটি তাঁবুতে হামলায় নিহত হন। সেই হামলায় আল জাজিরার আরও তিন কর্মী ও দুই ফ্রিল্যান্সার প্রাণ হারান। সিপিজে দাবি করেছে, তাঁর বিরুদ্ধে ‘অপ্রমাণিত অপপ্রচার’ চালানোর পরই এই হামলা হয়।

&t=21s

আরও গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে ইয়েমেনে। সিপিজে-র ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের নথিভুক্ত দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রাণঘাতী হামলায় ইসরায়েলি বাহিনী ইয়েমেনের দুটি সংবাদপত্র অফিসে একাধিক বিমান হামলা চালায়, যাতে ৩১ জন সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মী নিহত হন। ইসরায়েলের দাবি ছিল, তারা “সামরিক লক্ষ্যবস্তু”, যার মধ্যে “হুথি পাবলিক রিলেশনস ডিপার্টমেন্ট” ছিল, সেটিকেই আঘাত করেছে।

গাজায় নাসের হাসপাতালে এক হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে পাঁচজন সাংবাদিক ছিলেন। ইসরায়েলের দাবি, তারা “হামাসের একটি ক্যামেরা ইউনিট” লক্ষ্য করেছিল। আবার ২৩ বছর বয়সি প্যালেস্তিনীয় সাংবাদিক Hossam Shabat উত্তর গাজার ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতালের কাছে ড্রোন হামলায় নিহত হন। ইসরায়েল তাঁকে হামাসের স্নাইপার বলে অভিযোগ করলেও কোনও প্রমাণ দেয়নি বলে সিপিজে জানিয়েছে।

ড্রোন হামলার ব্যবহারও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২০২৩ সালে যেখানে দুই সাংবাদিক ড্রোন হামলায় নিহত হন, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯-এ। গাজায় এই ৩৯ জনের মধ্যে ২৮ জনের মৃত্যুর জন্য ইসরায়েলি বাহিনীকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া সুদানের Rapid Support Forces পাঁচটি, রাশিয়া চারটি এবং অন্য কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী বাকি মৃত্যুর জন্য দায়ী।

আন্তর্জাতিক সংবাদকর্মীরাও রেহাই পাননি। দোনেৎস্ক অঞ্চলে রুশ ড্রোন হামলায় ফরাসি আলোকচিত্রী Antoni Lallican এবং ইউক্রেনীয় সাংবাদিক Olena Hramova ও Yevhen Karmazin নিহত হন। সুদানে, যেখানে ২০২৫ সালে মোট নয়জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, আরএসএফ-কে সুদান নিউজ এজেন্সির পরিচালক Taj al-Sir Ahmed Suleiman ও তাঁর ভাইকে প্রকাশ্যে হত্যার অভিযোগও করা হয়েছে।

যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ভারতে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক মুকেশ চন্দ্রকর-এর দেহ একটি সেপটিক ট্যাঙ্কে উদ্ধার হয়, যখন তিনি একটি ১২০ কোটি টাকার সড়ক প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। মেক্সিকোতে ছয়জন সাংবাদিক খুন হন, কিন্তু অপরাধীরা চিহ্নিত হয়নি। ফিলিপিন্সে তিনজন সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন, যার মধ্যে মাত্র একটিতে গ্রেপ্তার হয়েছে।

কর্তৃত্ববাদী শাসনেও বিপদের মাত্রা চরমে। বিরল রাষ্ট্রীয় মৃত্যুদণ্ডে সৌদি আরব সাত বছর আটক থাকার পর বিশিষ্ট কলামিস্ট Turki al-Jasser-কে ফাঁসি দেয়। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়েছিল, যা সিপিজে ‘মনগড়া’ বলে দাবি করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ বছরে সামরিক বাহিনীর হাতে ৩৭৩ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যার ৬০ শতাংশেরও বেশি মৃত্যু ঘটেছে গত তিন বছরে। বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক হত্যার ৮০ শতাংশ মামলাই অমীমাংসিত রয়ে গেছে বলে সংগঠনটির দাবি।

সিপিজে আন্তর্জাতিক তদন্তকারী টাস্কফোর্স গঠন ও লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা যায়। সংগঠনটির বক্তব্য, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও ক্রমশ ঝুঁকির মুখে পড়বে।