আজকাল ওয়েবডেস্ক: ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া এবং জিকা ভাইরাসের মতো মশাবাহিত রোগ বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষকে আক্রান্ত করে। এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি জগতের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান গুগল এক অভিনব উদ্যোগের মাধ্যমে রোগবাহক মশার সংখ্যা কমানোর চেষ্টা করছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী দিনে আরও কোটি কোটি বিশেষ ধরনের মশা ছেড়ে দেওয়া হবে, যাতে রোগ ছড়ানো মশার প্রজনন স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হল এডিস ইজিপ্টি প্রজাতির মশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা। এই প্রজাতির মশাই মূলত ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়া এবং ইয়েলো ফিভারের মতো বিপজ্জনক ভাইরাস বহন করে। প্রচলিত কীটনাশক ব্যবহারের বদলে বিজ্ঞানভিত্তিক এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে সমস্যার সমাধান খুঁজছে গবেষকরা।
এই প্রযুক্তিতে ল্যাবরেটরিতে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা পুরুষ মশার শরীরে একটি প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করানো হয়। এরপর সেই পুরুষ মশাগুলিকে নির্দিষ্ট এলাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়। তারা যখন বন্য পরিবেশের স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডিম থেকে বাচ্চা জন্মায় না বা পরবর্তী প্রজন্ম টিকে থাকতে পারে না। ফলে ধীরে ধীরে রোগবাহক মশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই প্রকল্পে যে পুরুষ মশাগুলি ছাড়া হয় তারা মানুষকে কামড়ায় না। কারণ শুধুমাত্র স্ত্রী মশাই রক্ত পান করে, পুরুষ মশা ফুলের মধু বা উদ্ভিদের রস খেয়ে বেঁচে থাকে। তাই মানুষের জন্য এই উদ্যোগকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলেই মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
গুগলের সহায়তায় পরিচালিত এই গবেষণা ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হয়েছে। গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল বলছে, যেখানে নিয়মিত এই বিশেষ মশা ছাড়া হয়েছে সেখানে রোগবাহক মশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু সংক্রমণের ঘটনাও অনেক ক্ষেত্রে হ্রাস পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ন এবং অনিয়ন্ত্রিত জল জমে থাকার কারণে মশার বিস্তার আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ফলে শুধুমাত্র কীটনাশক ব্যবহার করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক এলাকায় মশা কীটনাশকের প্রতিও প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে জৈব প্রযুক্তিনির্ভর এমন উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
তবে গবেষকরা এটাও স্পষ্ট করেছেন যে, শুধু বিশেষ মশা ছেড়ে দিলেই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হবে না। মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি, বাড়ির আশপাশে জল জমতে না দেওয়া, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং স্থানীয় প্রশাসনের মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশা, আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার সাহায্যে ভবিষ্যতে ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের প্রকোপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। যদি এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়, তবে বিশ্বের বহু দেশ মশা নিয়ন্ত্রণে একই ধরনের পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে।
















