আজকাল ওয়েবডেস্ক: উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে গত সোমবার এক ভয়াবহ এবং নৃশংস হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রকাশ্য রাস্তায় এক ব্যক্তিকে ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যার চেষ্টার পর থেকেই পুরো শহরজুড়ে তুমুল অশান্তি, সহিংসতা এবং বর্ণবাদী দাঙ্গা শুরু হয়েছে। এই ঘটনার পর সংক্ষুব্ধ ও মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে, রাস্তাঘাট অবরোধ করেছে এবং বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত সোমবার উত্তর বেলফাস্টের কিন্নার্ড অ্যাভিনিউ এলাকার একটি ফ্ল্যাটের সামনে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, ৩০ বছর বয়সী এক সুদানিস নাগরিক—যিনি ২০২৩ সালে প্যারিস ও ডাবলিন হয়ে যুক্তরাজ্যে আসেন এবং ২০২৮ সাল পর্যন্ত সেখানে শরণার্থী হিসেবে থাকার অনুমতি পেয়েছিলেন—হঠাৎ করেই স্টিফেন ওগিলভি নামের ৪০ বছর বয়সী এক স্থানীয় বাসিন্দার ওপর ধারালো রান্নাঘরের ছুরি নিয়ে চড়াও হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ঘটনার ভিডিওতে দেখা যায়, হামলাকারী প্রথমে স্টিফেনের পিঠে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করেন এবং তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তাঁর বুকের ওপর চড়ে বসেন। এরপর অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় স্টিফেনের গলা কাটার চেষ্টা শুরু করেন তিনি।

এই নৃশংস দৃশ্য দেখে আশেপাশের মানুষজন আতঙ্কে চিৎকার করতে থাকেন। কয়েকজন বাসিন্দা হামলাকারীকে থামানোর চেষ্টা করলে সে নিজের রক্তমাখা ছুরি উঁচিয়ে তাঁদেরকেও মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, লোকটি অত্যন্ত শান্তভাবে এই নৃশংসতা চালাচ্ছিল, এমনকি নিজের ঠোঁটে লেগে থাকা রক্ত চাটছিল, যা দেখে মনে হচ্ছিল সে পুরো বিষয়টি উপভোগ করছে।

তবে চরম বিপদের মধ্যেও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে আসেন। ম্যাট নামে পরিচিত এক ব্যক্তি এবং তাঁর সঙ্গীরা মিলে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী ‘হার্লিং স্টিক’ (এক ধরণের খেলার লাঠি) নিয়ে হামলাকারীর মুখোমুখি হন। ম্যাট লাঠি দিয়ে হামলাকারীর মাথায় আঘাত করলে অন্যান্য পথচারীরা দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে চেপে ধরেন। সে সময় হামলাকারী উদ্ধারকারীদের কামড়ে দেওয়ার চেষ্টাও করে। অন্যদিকে কারেন মুলহল্যান্ড নামের আরেক বাসিন্দা এক ডেলিভারি কর্মীর ফোন নিয়ে দ্রুত জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করেন এবং পুলিশকে দ্রুত আসার আকুতি জানান।

খবর পাওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড পুলিশ (পিএসএনআই) ঘটনাস্থলে পৌঁছে হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করে এবং রক্তাক্ত স্টিফেনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালে পাঠায়। স্টিফেনের পিঠ, মুখ এবং গলায় মারাত্মক জখম হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন সাধারণ মানুষের এই অবিশ্বাস্য সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেছে এবং জানিয়েছে যে, তাঁদের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের কারণেই স্টিফেনের প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া  সুদানিস নাগরিকের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা এবং প্রাণনাশের হুমকির মামলা দায়ের করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটনে সম্প্রতি হেনরি নোয়াক নামের এক ছাত্রকে এক শিখ হামলাকারী ড্যাগার দিয়ে হত্যার ঘটনার পরপরই বেলফাস্টের এই ঘটনাটি ঘটায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। মঙ্গলবারের পর থেকে বেলফাস্টের পরিস্থিতি ওলটপালট হয়ে যায়। প্রায় শতাধিক মুখোশধারী তরুণ ও কিশোরদের দল ক্রুমলিন রোড সহ বিভিন্ন এলাকায় তাণ্ডব চালায়। তারা ঘরের দরজা-জানালা ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে এবং কৃষ্ণাঙ্গ ও বিদেশি নাগরিকদের এলাকা ছাড়ার হুমকি দেয়। স্থানীয় এক আইনপ্রণেতা এই পরিস্থিতিকে ‘বর্ণভিত্তিক পোগ্রোম’ বা পরিকল্পিত জাতিগত নিধনযজ্ঞ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, গায়ের রঙ দেখে দেখে বেছে বেছে বিদেশিদের বাড়িঘর লক্ষ্য করা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং পরবর্তী সহিংসতা এড়াতে পুরো বেলফাস্ট জুড়ে বর্তমানে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, তবে এই নৃশংস হামলা এবং তার পরবর্তী বর্ণবাদী দাঙ্গার ক্ষত শহরটিকে দীর্ঘদিন তাড়িয়ে বেড়াবে।