আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের রাষ্ট্রপতিকে সব সময় পাহারা দেয় এবং এসকর্ট করে যে রেজিমেন্ট, তার নাম প্রেসিডেন্টস বডিগার্ড বা পিবিজি। এটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সবচেয়ে প্রাচীন ও সিনিয়র রেজিমেন্ট। আজকের ভারতীয় সেনাবাহিনী মূলত 'সর্বভারতীয়, সকল শ্রেণীর' নীতিতে চলে। অর্থাৎ দেশের যে কোনও অঞ্চল বা সম্প্রদায় থেকে সেনা নিয়োগ করা যায়। কিন্তু পিবিজি এখনও অনুসরণ করে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি। 

পিবিজি-র সৈন বা ট্রুপার নিয়োগ করা হয় কেবল তিনটি সম্প্রদায় থেকে। হিন্দু জাট, হিন্দু রাজপুত ও জাট শিখ সম্প্রদায় থেকে। 

শুধু তাই নয়, কোন সম্প্রদায় থেকে কতজনকে নেওয়া হবে সেই সংখ্যাও নির্দিষ্ট আছে। হিন্দু জাট থাকবে মূল সংখ্যার ৩৩.৩ শতাংশ, হিন্দু রাজপুতও থাকবে ৩৩.৩ শতাংশ, জাট শিখ সংখ্যাও থাকবে ৩৩.৩ শতাংশ। এই সীমাবদ্ধতা কেবল সৈনিক বা ট্রুপারদের জন্যই। রাষ্ট্রপতির অফিসার, ক্লার্ক বা অন্যান্য স্টাফদের ক্ষেত্রে কোনও বিধি নিষেধ নেই। তাঁরা দেশের যেকোনও প্রান্ত বা সম্প্রদায় থেকে হতে পারেন। 

১৭৭৩ সাল থেকে শুরু এই পিবিজি-র যাত্রা। বেনারসে (বর্তমান বারাণসী) এই গঠন তৈরি করেন ব্রিটিশ শাসক ওয়ারেন হেস্টিংস। প্রথমে এই পিবিজিতে ছিল মাত্র ৫০ জন বাছাই করা অশ্বারোহী। পরে বেনারসের রাজা চেত সিং আরও ৫০ জন ঘোড়সওয়ার যোগ করেন। বছরের শেষে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১০০। পরে সময়, এবং চাহিদা অনুযায়ী এই রেজিমেন্টের সেনা সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৮৪৫ সালের সেনা তালিকা অনুযায়ী, প্রথম শিখ যুদ্ধের আগে রেজিমেন্টটির সর্বোচ্চ সেনা সংখ্যা ছিল ১,৯২৯ জন। তখন এই বাহিনীর কাজ ছিল গভর্নর ও গভর্নর-জেনারেলের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই গভর্নর ও গভর্নর-জেনারেল বহু ক্ষেত্রে নিজেরাই যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতেন। 

১৯৪৭ সালের আগে এই ইউনিটে পাঞ্জাবি মুসলিম, শিখ ও রাজপুত ছিলেন। দেশভাগের পরে মুসলিম ট্রুপাররা পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হন এবং সেখানে গভর্নর জেনারেলের বডিগার্ড গঠন করেন। মুসলিম সৈন্যদের শূন্যস্থান পূরণ করা হয় জাটদের মাধ্যমে। সেই থেকে আজও, এই তিন-সম্প্রদায়ের সৈনিক কাঠামো স্থির থাকে। স্বাধীনতার পরে বহু নতুন রেজিমেন্ট খোলা নিয়োগনীতি গ্রহণ করলেও পিবিজির মতো পুরনো রেজিমেন্টগুলোকে ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থে তাদের পুরনো কাঠামো বজায় রাখতে দেওয়া হয়। 

তবে এই নিয়োগনীতি বহুবার আইনি প্রশ্নের মুখোমুখি পড়েছে। সমালোচকদের দাবি, এই কাঠামো বা নিয়োগ ব্যাবস্থা সংবিধানের ১৪, ১৫ ও ১৬ অনুচ্ছেদের সমতা অধিকারের বিপরীত। কিছু উল্লেখযোগ্য মামলাও আছে এই নিয়োগ নীতির বিরুদ্ধে। যেমন- দিল্লি হাইকোর্টে দায়ের করা গৌরব যাদব বনাম ভারত ইউনিয়ন (২০১৮–২০১৯)-এর মামলা। এছাড়া, সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা ঈশ্বর সিং যাদব বনাম ভারতের ইউনিয়ন (২০১২-১৩)-এর মামলা। অথবা, ভারত ইউনিয়ন বনাম বীরপাল সিং চৌহানের মামলাটি, যেখানে সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ ছিল যে- যদি বৈধ সামরিক উদ্দেশ্যে করা হয়, তাহলে রেজিমেন্টাল সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান বিরোধী হিসেবে গণ্য করা হবে না। 

সেনাবাহিনীর যুক্তি, প্রায় ১৫০ জন ট্রুপার বা সৈন্যকে নিয়ে পিবিজি একটি ছোট ও বিশেষায়িত ইউনিট। এদের কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য এক বিশেষ উচ্চমানের আনুষ্ঠানিক প্যারেড, যেখানে সম্পূর্ণ দৃষ্টিনন্দন সামঞ্জস্য বজায় রাখা জরুরি। পিবিজি-র সেনাদের ন্যূনতম উচ্চতা ৬ ফুট। ভারতের গড় উচ্চতার তুলনায় এই মাপকাঠি অনেক বেশি। সেনাবাহিনীর দাবি, নির্দিষ্ট তিন সম্প্রদায়ের গড় উচ্চতা তুলনামূলক বেশি এবং গঠনগত সাদৃশ্য থাকায় আনুষ্ঠানিক প্যারেডে একদম অভিন্ন চেহারা বজায় রাখা সহজ হয়। এই কাঠামো কার্যকরী প্রয়োজনীয়তাকে মাথায় রেখে এবং ঐতিহ্যের ভিত্তিতে তৈরি।  বৈষম্যের সঙ্গে এর যোগাযোগ নেই। 

বহু, মানুষের ধারণা পিবিজি সেনারা কেবল ঘোড়ায় চড়ে প্যারেড করে। কিন্তু বাস্তব একটু অন্যরকম। প্রত্যেক ট্রুপার দক্ষ প্যারাট্রুপারও বটে। তাছাড়া তাঁরা এয়ারবর্ন অপারেশনে দক্ষ। ট্যাঙ্ক পরিচালনার পাশাপাশি আর্মার্ড ইউনিট হিসেবেও কাজ করতে পারেন তাঁরা। শুধু রাষ্ট্রপতির সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন, এমনটা নয়। দায়িত্ব পালন করেছেন সিয়াচেন হিমবাহেও। শ্রীলঙ্কার আইপিকেএফ মিশনে অংশ নেওয়ার সঙ্গে পালন করেছেন রাষ্ট্রসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের দায়িত্বও। কাজেই এই রেজিমেন্ট ঐতিহ্যের পাশাপাশি বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রেও নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করেছে। 

রাষ্ট্রপতির বডিগার্ড একদিকে ভারতের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের উত্তরাধিকার, অন্যদিকে স্বাধীন ভারতের সামরিক ঐতিহ্যেরও অংশ। এদের নিয়োগনীতি নিয়ে বিতর্ক আছে, আইনি প্রশ্ন আছে - কিন্তু সেনাবাহিনীর মতে এটি সামরিক প্রয়োজন ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন। ঝকঝকে ইউনিফর্ম আর ঘোড়ার টগবগ শব্দের আড়ালে মিশে আছে প্রায় আড়াইশো বছরের ইতিহাস, রাজনীতি, যুদ্ধ আর আদালতের যুক্তিতর্ক। এই সবটুকু মিলিয়েই আজকের প্রেসিডেন্টস বডিগার্ড বা পিবিজি।