বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির অভাবনীয় জয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই এক রক্তক্ষয়ী ও হাড়হিম করা হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী থাকল উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রাম। গত রাতে নিজের বাড়ির ঠিক ঢিলছোড়া দূরত্বে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কর্মনির্বাহী সচিব (Executive Assistant) তথা তাঁর একনিষ্ঠ ছায়াসঙ্গী চন্দ্রনাথ রথ। প্রাক্তন এই বায়ুসেনা কর্মীর খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ও চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
2
8
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত রাত ১১টা নাগাদ মধ্যমগ্রামে নিজের বাড়ির থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে একটি স্করপিও গাড়িতে সওয়ার ছিলেন চন্দ্রনাথ। তিনি গাড়ির সামনের সিটে বসেছিলেন। হঠাৎই একটি গাড়ি উল্টোদিক থেকে এসে রাস্তা আটকে গতিরোধ করে তাঁর এসইউভি-র। সেই মুহূর্তেই একটি বাইকে চড়ে দুই আততায়ী এসে চলন্ত গাড়ির জানলার কাঁচের ওপর দিয়েই পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে প্রায় ১০ রাউন্ড গুলি চালায়।
3
8
তিনটি গুলি সরাসরি চন্দ্রনাথের শরীরে লাগে। গাড়ির চালকও এই ঘটনায় গুরুতর জখম হয়েছেন। রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই মৃত্যু হয় চন্দ্রনাথের। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, অন্তত দুই-তিন দিন ধরে ‘রেকি’ করে পেশাদার খুনিদের দিয়েই এই সুপরিকল্পিত ‘কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার’ বা ঠান্ডা মাথার খুন করানো হয়েছে।
4
8
পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুরের বাসিন্দা চন্দ্রনাথ ছিলেন মেধাবী ছাত্র। রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তনী চন্দ্রনাথ শর্ট সার্ভিস কমিশনে ১০ বছর ভারতীয় বায়ুসেনায় অফিসার হিসেবে গৌরবজনকভাবে কাজ করেছিলেন। ২০১৮ সালে সেই কাজ ছেড়ে তিনি শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে কাজ শুরু করেন। তখন শুভেন্দু তৃণমূলে ছিলেন। পরে ২০২০ সালে শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দিলে চন্দ্রনাথ তাঁর ব্যক্তিগত সচিব হন।
5
8
২০২১-এর নির্বাচনের পর শুভেন্দু বিরোধী দলনেতা হলে চন্দ্রনাথ তাঁর এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিযুক্ত হন। বিধায়কদের সমন্বয় থেকে শুরু করে শুভেন্দুর প্রতিটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও রাজনৈতিক ছক— সব কিছুর নেপথ্যে অন্যতম মস্তিষ্ক ছিলেন এই মৃদুভাষী চন্দ্রনাথ। বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পল থেকে শুরু করে গেরুয়া শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব— সকলের কাছেই অত্যন্ত প্রিয় ও নির্ভরযোগ্য ‘চন্দ্র’ হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
6
8
ছেলের মৃত্যুতে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন মা হাসিরানি রথ। তিনি একসময় তৃণমূল করলেও বর্তমানে বিজেপির পঞ্চায়েত সদস্য। সংবাদমাধ্যমের সামনে চোখের জলে তিনি বলেন, “শুভেন্দু বাবু মমতা ব্যানার্জিকে হারানোর পর থেকেই আমাদের পরিবার টার্গেট হয়েছিল। আমার ছেলেকে অত্যাচার করে মারা হয়েছে। আমি খুনিদের ফাঁসি চাই না, ওরা সারাজীবন জেল খাটুক এটাই চাই।”
7
8
ঘটনার খবর পেয়েই সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, “ডিজিপি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে তদন্ত চলছে। তবে আমরা শোকাহত ও ব্যথিত। আমাদের দলের কর্মীদের কাছে আবেদন, কেউ আইন নিজের হাতে নেবেন না। দু’দিনের মধ্যেই রাজ্যে বিজেপি সরকার গড়বে এবং আমরা নিশ্চিত করব যাতে বিচার পাওয়া যায়।”
8
8
অন্যদিকে, এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসও। তবে শাসকদল পাল্টা দাবি করেছে যে, গত তিন দিনে বিজেপির আশ্রিত দুষ্কৃতীদের হাতে তাদেরও তিন কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। পুরো ঘটনার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার জন্য তৃণমূলের পক্ষ থেকে আদালত-পরিচালিত সিবিআই (CBI) তদন্তের দাবি তোলা হয়েছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর এই রক্তপাত ও একের পর এক খুনের ঘটনায় এখন থমথমে গোটা বাংলা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।