আজকাল ওয়েবডেস্ক: বুধবার জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভায় এক ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত সংবেদনশীল পদক্ষেপ নিল বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল কনফারেন্স। উপত্যকার বাইরের বাসিন্দাদের জমি লিজে দেওয়ার ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার লক্ষ্যে বিধানসভায় একটি নতুন বিল আনা হয়েছে। শ্রীনগরের জাদিবাল কেন্দ্রের বিধায়ক তানভীর সাদিক এই বিলটি পেশ করেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ল্যান্ড গ্র্যান্টস অ্যাক্ট সংশোধন বিল’। মূলত ২০১৯ সালে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিলোপের পর ভূমি সংস্কারের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই এই পদক্ষেপ নিয়েছে ওমর আবদুল্লাহর সরকার।
ন্যাশনাল কনফারেন্সের দাবি, ২০২২ সালে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের জন্য যে নতুন জমি নীতি তৈরি করা হয়েছিল, তা ছিল স্থানীয় মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার এক সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। সেই নীতি অনুযায়ী, পুরনো লিজে থাকা জমিগুলো নবীকরণের পরিবর্তে উন্মুক্ত নিলামে তোলার কথা বলা হয়েছিল, যেখানে দেশের যেকোনও প্রান্তের মানুষ অংশ নিতে পারতেন। কিন্তু নতুন এই প্রস্তাবিত বিলে ১৯৬০ সালের পুরনো ‘ল্যান্ড গ্র্যান্টস অ্যাক্ট’-কে ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হল— জম্মু-কাশ্মীরের সরকারি জমি কেবল স্থানীয় স্থায়ী বাসিন্দারাই ব্যবহার করতে পারবেন। তবে বিশেষ প্রয়োজনে শিল্পায়ন বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকার চাইলে এই নিয়ম কিছুটা শিথিল করতে পারবে।
এই বিলটি পেশ করার সাথে সাথেই উত্তাল হয়ে ওঠে বিধানসভা। বিরোধী দল বিজেপি এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে দাবি করেছে যে, এটি উপত্যকায় বিনিয়োগের পথ বন্ধ করে দেবে এবং উন্নয়ন স্তব্ধ করে দেবে। বিজেপি নেতা সুনীল শর্মা সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর দিকে আঙুল তুলে অভিযোগ করেছেন যে, মুখ্যমন্ত্রী নিজের এবং তার আত্মীয়দের সম্পত্তি রক্ষা করতেই এই বিল এনেছেন। গুলমার্গের বিখ্যাত ‘নেডুস’ হোটেলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পরিবারতন্ত্র এবং অভিজাত মহলের স্বার্থ রক্ষা করতেই ন্যাশনাল কনফারেন্স তড়িঘড়ি এই বিল পাস করাতে চাইছে।
অন্যদিকে, মেহবুবা মুফতির দল পিডিপি-ও এই বিলের বিরোধিতা করেছে, তবে ভিন্ন কারণে। পিডিপি বিধায়ক ওয়াহিদ পারা আগেই ভূমিহীনদের মালিকানা দেওয়ার দাবিতে একটি বিল এনেছিলেন যা খারিজ হয়ে যায়। পিডিপি নেতা নইম আখতারের মতে, ন্যাশনাল কনফারেন্সের এই বিলটি কেবল হাতেগোনা কয়েকটি অভিজাত হোটেল মালিক ও প্রভাবশালী পরিবারের স্বার্থ দেখবে, সাধারণ ভূমিহীন মানুষের এতে কোনও লাভ হবে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দিল্লিতে যদি বেআইনি কলোনি বৈধ করা যায়, তবে কাশ্মীরে কেন সাধারণ মানুষের বসতিকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে না?
পিপলস কনফারেন্সের সাজ্জাদ লোনও এই বিলটিকে ‘সুপার এলিট’ বা উচ্চবিত্তদের সাহায্যকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে সমস্ত সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে বিলের উদ্যোক্তা তানভীর সাদিক জানিয়েছেন, এই আইনের ফলে সেই সব সাধারণ মানুষও আইনি সুরক্ষা পাবেন যারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি জমিতে বসবাস করছেন কিন্তু কোনও বৈধ নথিপত্র নেই। তিনি বিজেপি ও পিডিপি-কে আক্রমণ করে বলেন, এই দুই দল আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
উপত্যকার পর্যটন শিল্পের ওপর এই বিলের প্রভাব পড়বে ব্যাপক। বিশেষ করে গুলমার্গের ৫৯টি হোটেলের মধ্যে ৫৫টির লিজ ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে এই হোটেলগুলোর মালিকানা স্থানীয়দের হাতেই থাকবে কি না, নাকি বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে চলে যাবে— সেই বিতর্কের কেন্দ্রে এখন এই নতুন সংশোধনী বিল। আপাতত রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে থাকলেও, স্থানীয় মানুষের মধ্যে জমি হারানোর যে দীর্ঘদিনের আতঙ্ক ছিল, এই বিলের মাধ্যমে তাকেই হাতিয়ার করতে চাইছে শাসক দল।
















